ডারউইন টেস্ট শুরু বৃহস্পতিবার ভোরে

গল্পটা নতুন করে লিখুক বাংলাদেশ

গল্পটা নতুন করে লিখুক বাংলাদেশ

আবহাওয়া জানাচ্ছে ডারউইনের আকাশে ঝলমলে রোদ থাকবে। আর উইকেটের চরিত্র জানাচ্ছে এখানে থাকবে ঘাস। এই সমীকরণ জানাচ্ছে বল উঠবে বুকের কাছে। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নামা বাংলাদেশের জন্য তাই সামনে শুধু ২২ গজ নয়, সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে এক পুরোনো দুঃস্বপ্নও।

২০০৪ সালে এই মারারা স্টেডিয়ামেই ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। ২৩ বছর পর সেই ডারউইনেই আবার টেস্ট। সময় বদলেছে। দল বদলেছে। ক্রিকেটের ভাষাও বদলেছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের পরীক্ষার ধরনটা খুব একটা বদলায়নি।

বিজ্ঞাপন

১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৬টায় শুরু প্রথম টেস্ট। হার-জিতের প্রশ্ন পরে। তার আগে উত্তর খুঁজতে হবে অস্ট্রেলিয়ার বাউন্স, গতি আর চাপের সামনে বাংলাদেশ এবার কতটা পরিণত?

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দুই টেস্টের এবারের সিরিজ বাংলাদেশের জন্য সেই পরীক্ষার ক্ষেত্র। পাস মার্ক মিলবে?

সিরিজ শুরুর আগেই ডারউইন বাংলাদেশকে একটা সতর্কবার্তা দিয়েছে। প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে গেছেন নাজমুল হোসেন শান্তরা। হার ইনিংস ও ৩৮ রানে।

প্রস্তুতি ম্যাচের ফল সব সময় টেস্টের ভবিষ্যৎ বলে না। কিন্তু ৫৪ রান কখনোই নিছক একটা সংখ্যা নয়। বিশেষ করে যখন সেই রান এসেছে এমন এক উইকেটে, যেখানে বল ব্যাটের কাছে আসার আগে ব্যাটসম্যানের মাথার ভেতরেই ভয় ঢুকে যেতে পারে।

ডারউইনের শক্তপোক্ত, বাউন্সি ড্রপ-ইন উইকেট বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রাখবে এখানেই। বলকে কীভাবে খেলবেন? শরীরের কাছে আসা বলকে কীভাবে সামলাবেন? আর সবচেয়ে বড় কথা, অস্ট্রেলিয়ার পেসাররা যখন একের পর এক শর্ট বল ছুড়বেন, তখন ধৈর্য কতক্ষণ থাকবে?

প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রান সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। বরং প্রশ্নটাকে আরো বড় করেছে।

বাংলাদেশের বিপদ আরো বাড়িয়েছে প্রতিপক্ষের শক্তি। ছয় মাসের বেশি সময় পর টেস্টে ফিরছেন প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজেলউড ও নাথান লায়ন। স্কট বোল্যান্ড ও মিচেল স্টার্ক তো আছেনই। অর্থাৎ বাংলাদেশের সামনে দাঁড়াবে অস্ট্রেলিয়ার প্রায় পূর্ণশক্তির বোলিং আক্রমণ।

স্টার্কের গতি। কামিন্সের নিখুঁত লাইন। হ্যাজেলউডের ধৈর্য। বোল্যান্ডের বাউন্স। লায়নের ঘূর্ণি। ব্যাটসম্যানের জন্য এর চেয়ে কঠিন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আর কী হতে পারে!

বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চলতি চক্রেও অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান তাদের আত্মবিশ্বাসের ছবি পরিষ্কার করে। সাত জয়, এক হার। পয়েন্ট শতাংশে শীর্ষে। প্রতিটি টেস্ট এখন তাদের কাছে শুধু একটি ম্যাচ নয়, ফাইনালের পথে আরেকটি ধাপ।

অস্ট্রেলিয়ার শক্তির বিপরীতে বাংলাদেশের বাস্তবতা অনেক কঠিন। পেস আক্রমণের বড় ভরসা নাহিদ রানা চোটের কারণে সিরিজেই নেই। সাম্প্রতিক ওয়ানডে সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ছয় উইকেট নেওয়া শরিফুল ইসলামও হ্যামস্ট্রিং সমস্যায় বাইরে। দ্বিতীয় টেস্টে ফেরার সম্ভাবনা থাকলেও প্রথম টেস্টে তার অভাবটা স্পষ্টভাবেই টের পেতে পারে বাংলাদেশ।

ওপেনিংয়েও সংকট রয়েই গেছে। দুই ওপেনার তানজিদ তামিম ও সাদমান ইসলাম কেউ প্রস্তুতি ম্যাচে ফর্ম দেখাতে পারেননি। সৌম্য সরকার ফিরেছেন ২০২১ সালের পর প্রথমবার টেস্ট দলে। নির্বাচক হাবিবুল বাশারও স্বীকার করেছেন, ফর্ম ও অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে এই সিদ্ধান্তে কিছুটা মরিয়া ভাব ছিল। মিডল অর্ডারে ঘাটতি সামলাতেই শেষ মুহূর্তে যোগ হয়েছেন লিটন দাস। মাঝের ব্যাটিংয়ে নাজমুল হোসেন শান্ত, মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস ও মেহেদি মিরাজ—এই পাঁচের ব্যাটিং নির্ভরতাই হবে বাংলাদেশের সাফল্যের নির্ণায়ক।

সব হিসাব অস্ট্রেলিয়ার দিকে গেলেও ক্রিকেটে কাগজের হিসাব শেষ কথা নয়। প্রস্তুতি ম্যাচেই সেঞ্চুরি করেছেন মিরাজ। গত দুই বছরে তাইজুলের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারিও তিনি। মে মাসে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে টানা চার টেস্ট জিতেছিল বাংলাদেশ। জুনে জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হেরে সেই ধারায় ছেদ পড়েছে ঠিকই, কিন্তু তার আগের চার জয় টেস্টে বাংলাদেশের বদলে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছিল।

ব্যক্তিগত কিছু মাইলফলকের দেখাও মিলতে পারে দুই ম্যাচের এই টেস্ট সিরিজে। জশ হ্যাজেলউড দাঁড়িয়ে ৩০০ টেস্ট উইকেটের সামনে। দরকার মাত্র পাঁচটি। আর মুশফিকুর রহিমের সামনে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে সাত হাজার টেস্ট রান ক্লাবে নাম লেখানোর সুযোগ রয়েছে। এই মাইলফলক অর্জনে

ইতিহাসের এক পাশে অস্ট্রেলিয়ার শক্তি, অন্য পাশে বাংলাদেশের কয়েকটি ব্যক্তিগত ও দলীয় গল্প।

সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশের এক নম্বর সমস্যার নাম—টপ অর্ডার। প্রকৃত ওপেনারের অভাব। তা ছাড়া পেস আক্রমণে অভিজ্ঞতার ঘাটতি। আর বাউন্সি উইকেটে শরীরে উড়ে আসা বল সামলানোর দক্ষতার কমতি। এই তিন জায়গাতেই ডারউইন টেস্ট বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নেবে।

ডারউইনে বাংলাদেশের সামনে তাই শুধু বাউন্সি উইকেট নয়, ২৩ বছরের পুরোনো ছায়া ফের বিস্তৃত হচ্ছে। এই বাংলাদেশ সেই ছায়া সরিয়ে নিজেদের ক্রিকেট গল্পটা নতুন করে লিখুক।

সেই অপেক্ষায় আছি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন