১৪ মাস ধরে বেতন দেয় না বসুন্ধরা কিংস!

১৪ মাস ধরে বেতন দেয় না বসুন্ধরা কিংস!

২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে একচ্ছত্র রাজত্ব করে আসছে বসুন্ধরা কিংস। ছয়বার প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন, তিনবার করে ফেডারেশন কাপ ও স্বাধীনতা কাপের শিরোপা জয় এবং এএফসি কাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা—সব মিলে নতুন করেই যেন সাফল্যের সংজ্ঞা লিখে ক্লাবটি। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং ভালো মানের খেলোয়াড়দের দলে অন্তর্ভুক্ত করে দেশের ফুটবলে রীতিমতো আলোড়ন তৈরি করা ক্লাবটি হঠাৎ করেই মুদ্রার উল্টো পিঠও দেখাচ্ছে। আর্থিক সংকট, ফিফা নিষেধাজ্ঞা আর খেলোয়াড়-কোচিং স্টাফদের একের পর এক বকেয়া না পাওয়ার অভিযোগ—সব মিলে অস্তিত্ব হারানোর মুখে ক্লাবটি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেশ কয়েক বছর ধরে ক্লাবটি যে আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, সেটি বর্তমানে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ফুটবলারদের অভিযোগ, ১৪ মাস ধরে বেতন দেয় না বসুন্ধরা কিংস!

বসুন্ধরা কিংসের চুক্তিবদ্ধ সিনিয়র একজন ফুটবলার মুঠোফোনে আমার দেশকে অভিযোগ করে বলেছেন, তার দুই বছরের বেতন বকেয়া পড়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পারিশ্রমিকের কিছু অংশ দেওয়া হলেও সিংহভাগই বকেয়ার খাতায় জমা। সব মিলে বর্তমানে তার বকেয়া ২ কোটি টাকারও ওপরে দাঁড়িয়েছে। ওই ফুটবলার আরো বলেন, ‘আমরা পেশাদার খেলোয়াড়। ফুটবল খেলা ছাড়া আমাদের আয়ের আর কোনো উৎস নেই। প্রতি মাসে যে বেতন পাই, সেটি দিয়েই সংসার চলে। কিন্তু সেটি যদি ঠিকমতো না পাই তাহলে কীভাবে চলব। অনেক কষ্টে দিন পার করছি এখন। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে আছি।’ ওই সিনিয়র ফুটবলারের মতো কিংসের অন্য খেলোয়াড়দের গল্পটা একই ধরনের। নানা ভোগান্তি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন তারা। জানা যায়, সিনিয়রদের দুই বছর আর জুনিয়র ও নতুন ফুটবলারদের ক্ষেত্রে এক বছর বা তার চেয়ে বেশি সময়ের বেতন বকেয়া পড়েছে কিংসের খাতায়। সর্বশেষ লিগ শেষ হওয়ার পর অল্প পরিমাণ অর্থ পেয়েছিলেন খেলোয়াড়রা। ফুটবলারদের মতে, বকেয়া বেতনের ব্যাপারে বসুন্ধরা কিংসের বক্তব্য, দ্রুতই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বারবার আশ্বাস দিলেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, বরং প্রকট আকার ধারণ করছে।

বিজ্ঞাপন

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে থেকেই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বসুন্ধরা কিংস। জাতীয় দলের ডিফেন্ডার তারিক কাজী প্রায় এক বছর ধরে বকেয়া বেতন না পাওয়ার অভিযোগ এনে ক্লাব ছেড়েছেন। এই ক্লাবে খেলে আর্থিক অনিশ্চয়তা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। ইংল্যান্ডের প্রবাসী ফুটবলার কিউবা মিচেলও বসুন্ধরা কিংসের সঙ্গে তিন বছরের চুক্তি করার পর মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ক্লাব ছেড়ে চলে যান। কিংসের সাবেক রোমানিয়ান কোচ ভ্যালেরিও তিতা এবং তিউনিশিয়ার ফিটনেস ট্রেইনার খলিল চাকরুন বকেয়া পারিশ্রমিকের ব্যাপারে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগই দিয়েছেন। সব মিলে এ পর্যন্ত বসুন্ধরা কিংসের বিরুদ্ধে ফিফার কাছে ১২টি অভিযোগ জমা পড়েছে। যে কারণে ক্লাবটির দলবদলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ফিফা। এ নিষেধাজ্ঞার কারণে নতুন মৌসুমে বসুন্ধরা কিংসের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত।

বর্তমানে বসুন্ধরা কিংসে চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড় যারা আছেন, তাদের ভবিষ্যৎ ঘিরেও তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ক্লাবটিতে জাতীয় দলের অনেক ফুটবলার খেলেন। এখন সবাই নিজেদের ক্যারিয়ার আর পরিবার নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে আছেন। সময়মতো বেতন না পাওয়া এবং ক্লাব ছাড়তে চাইলে ফিফার নিয়মের বেড়াজাল ও জটিলতার কারণে বলতে গেলে এক ধরনের বন্দিদশায় আছেন ফুটবলাররা! ফুটবলের নতুন মৌসুম দরজায় কড়া নাড়লেও বসুন্ধরা কিংসের অভ্যন্তরীণ আর্থিক অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার কোনো স্পষ্ট লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি ইমরুল হাসানের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে মুঠোফোনে অনেকবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া বসুন্ধরা কিংসের অন্য কর্মকর্তারাও এ ব্যাপারে মুখ খুলতে চাইছেন না। এমন মহাসংকটের সময় ক্লাবটির কর্তাদের মিডিয়া থেকে দূরে থাকাটা এক রহস্যেরই জন্ম দিচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন