স্কুলব্যাগের দুই বন্ধু

জালাল জাবির

স্কুলব্যাগের দুই বন্ধু

একটি স্কুলব্যাগে প্রতিদিন যাতায়াত করত নানারকম জিনিস—রঙপেন্সিল, কলম, স্কেল, ইরেজার, শার্পনার... সবাই মিলে ব্যাগটার ভেতরটা যেন একটা ছোট্ট শহর। কিন্তু এই শহরের ভেতর দুজন বাসিন্দার মধ্যে একটু ঝাগড়া হতো—একজন কলম আর অন্যজন পেন্সিল।

কলমটি ছিল নীল রঙের, চকচকে আর দেখতে বেশ আধুনিক। সে নিজেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করত। যখনই স্কুলে পড়ার সময় হতো, সে গর্বভরা স্বরে বলত, ‘দেখো, আমাকে ছাড়া তো কিছুই হয় না! পরীক্ষা, চিঠি, নোট—সবকিছুই আমাকে দিয়ে লেখা হয়। আমিই আসল লেখার উপকরণ!’

বিজ্ঞাপন

পেন্সিল চুপচাপ কলমের কথা শুনত। সে ছিল সাধারণ, কাঠের তৈরি, উপরের দিকে গোলাপি রঙের ইরেজার বসানো। দেখতে সাদামাটা হলেও মনটা ছিল খুব কোমল। কলমের অহংকারী আচরণে সে মাঝে মাঝে মন খারাপ করত। তবুও সে কিছু বলত না; কারণ পেন্সিল জানত—প্রতিটি জিনিসেরই আলাদা কাজ আছে এবং সব জিনিসই গুরুত্বপূর্ণ।

একদিন সকালে স্কুলের খাতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ নোট লেখা শুরু হলো। কলম আবার সেই একই কথা বলল, ‘সবাই তো আমাকে দিয়েই লেখে। আমাকে ছাড়া কেউ কিছু লিখতে পারে?’

পেন্সিল একটু ভেবে শান্ত গলায় বলল, ‘তোমাকে খুব কাজে লাগে, এটা সত্যি; কিন্তু আমি যে কত কাজ করি, সেটা কি তুমি জান?’

কলম ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘ওমা! তুমি আবার কী কাজ কর? তোমাকে তো বারবার শানাতে হয়, আবার ভুল হলে তোমার লেখাও মুছে যায়!’

পেন্সিলের চোখটা একটু নরম হলো। সে বলল, ‘হ্যাঁ, আমাকে শানাতে হয়, আর আমার লেখা মুছেও যায়। কিন্তু ভুল করলে শিশুদের ঠিক করতে সুবিধা হয় বলেই তো আমাকে ব্যবহার করা হয়।’

সেদিন ছবি আঁকার ক্লাস ছিল। সবাই পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করল—কেউ ঘর, কেউ ফুলফল, পাখি আরো কত কিছু। ভুল হলে তারা ইরেজার দিয়ে মুছে আবার আঁকে। পেনসিল ব্যস্ততায় ও আনন্দে খাতার পাতায় নাচছিল। কলম খাতার কোণে পড়ে রইল, আঁকার কাজে কেউ তাকে ব্যবহারই করল না!

কলম মন খারাপ করে বলল, ‘হায়! আমাকে কেউ ডাকছেই না আজ...’

পেন্সিল পাশ থেকে বলল, ‘দেখলে? আঁকার সময় আমাকে লাগে, লেখার সময় তোমাকে। তাই অহংকার করলে তো হবে না।’

কলম একটু লজ্জা পেল, কিন্তু পুরোপুরি মেনে নিতে পারল না। পরদিন বাংলা ক্লাসে শিক্ষক গল্প লিখতে বললেন। বাচ্চারা তখন কলম হাতে নিল। এবার পেন্সিল একটু চুপচাপ। সে হাসিমুখে বলল, ‘আজ তোমার দিন।’

কলম খুশিতে ঝলমল করে উঠল; কিন্তু এবার তার মনটা আগের মতো শক্ত ছিল না। পেন্সিলের কথা তার মাথায় ঘুরছিল—‘প্রতিটি বস্তুই প্রয়োজনীয় এবং তাদের কাজের ক্ষেত্র আলাদা।’

গল্প লেখা শেষে শিক্ষক বললেন, ‘আমরা প্রথমে পেন্সিল দিয়ে লিখি বা আঁকি; কারণ ভুল হওয়া স্বাভাবিক। ভুল ঠিক করেই শেখা হয়। তারপর যখন ভালোভাবে শিখে যাই, তখন কলম ব্যবহার করি, যেন লেখা স্থায়ী হয়।’

এই কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো কলমের মনে আঘাত করল। সে ভাবল—‘আরে, তাহলে তো পেন্সিলের কাজ আমার চেয়ে কম নয়! বরং শেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টা তো পেন্সিলই সামলায়!’

স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে ব্যাগের ভেতর কলম ধীরে ধীরে পেন্সিলের কাছে এলো। সে নরম গলায় বলল, ‘বন্ধু... আমি এতদিন তোমার ওপর অহংকার করেছি; ভেবেছি, আমিই সবকিছু। কিন্তু আমি ভুল করেছি। তুমি না থাকলে বাচ্চাদের লেখা শিখতে অনেক কষ্ট হতো। তুমি কি আমাকে ক্ষমা করবে?’

পেনসিল কোমল হেসে বলল, ‘ক্ষমা চাইছ কেন, ভাই! তুমি আমাকে বুঝেছ, সেটাই বড় কথা।’

কলম খুশিতে একটু ‘টুং’ করে শব্দ করল। স্কুলব্যাগের ভেতর যেন নতুন আলো ছড়িয়ে পড়ল। রঙপেন্সিল থেকে শার্পনার—সবাই দুজনকে দেখে খুশি হলো। তার পর থেকে কলম ও পেন্সিল হলো দারুণ বন্ধু—স্কুলব্যাগের সবচেয়ে প্রিয় জুটি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...