গরু জবাই, গরুর গোশত খাওয়া কিংবা গবাদিপশু পরিবহনের অভিযোগে ভারতে মুসলিমদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা নতুন নয়। কখনো গরু পাচারের সন্দেহে, কখনো মাংস বহনের অভিযোগে, আবার কখনো গবাদিপশুর ব্যবসার কারণে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতার শিকার হচ্ছেন মুসলিমরা। এসব ঘটনায় অনেক সময় হামলাকারীরা নিজেদের ‘গোরক্ষক’ পরিচয় দিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।
এবার মধ্যপ্রদেশে দামোহ জেলায় মহিষ পরিবহনের সময় দুই মুসলিম ব্যবসায়ী ও এক গাড়িচালককে আটক করে বেধড়ক মারধর করেছে একদল লোক। হামলাকারীরা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মী বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গত ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় হিন্দোরিয়া থানার অধীন হারদুয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নির্যাতনের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, দুই ব্যবসায়ীর হাত-পা বেঁধে একটি মাঠের মধ্যে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরে লাঠি দিয়ে তাদের মারধর করছে একদল লোক। এ সময় তাদের ঘিরে রেখেও কয়েকজনকে আঘাত করতে দেখা যায়।
নির্যাতনের শিকার দুই ব্যবসায়ীর নাম আবিদ কুরেশি ও হাসান কুরেশি। তারা স্থানীয় মহিষ ব্যবসায়ী। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি গাড়িতে করে মহিষ নিয়ে যাওয়ার সময় একদল লোক তাদের পথ আটকে দেয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাংবাদিকদের আবিদ জানান, মহিষগুলো চুরি করা নয়, তা প্রমাণ করতে হামলাকারীদের কেনার রসিদ দেখিয়েছিলেন তারা। কিন্তু হামলাকারীরা তাদের কথা শোনেনি।
আবিদ বলেন, তারা আমাদের কথা শোনেনি। আমরা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াদৌড়ি শুরু করি, কিন্তু তারা আমাদের ধরে ফেলে। মহিষগুলো যে চুরি করা নয়—বারবার একথা বলা সত্ত্বেও তারা আমাদের বেধড়ক মারধর করে। পরে পুলিশ এলে আমরা কিছুটা স্বস্তি পাই।
আবিদের মুখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। আহত তিনজনের মধ্যে দুজন দামোহের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অপরজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জবলপুরে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনায় দুটি মামলা করেছে পুলিশ। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা-সংক্রান্ত ধারায় দুই ব্যবসায়ী, গাড়িচালক ও গাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে। অন্যদিকে, হামলার অভিযোগে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম মাকতুবকে দামোহের পুলিশ সুপার আনন্দ কালাদাগি বলেন, মুসলিম ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে তাদের শনাক্ত করা হয়। তবে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।
পুলিশ সুপার বলেন, একটি ছোট ভ্যানে এক বা দুটি প্রাণী পরিবহনের সক্ষমতা থাকলেও তাতে সাত থেকে আটটির বেশি মহিষ নেওয়া হচ্ছিল। এ ছাড়া প্রাণীগুলোকে অস্বাস্থ্যকর ও অমানবিক পরিবেশে পরিবহন করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
হিন্দোরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ধর্মেন্দ্র গুজ্জরও দুজনকে গ্রেপ্তার এবং ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। হামলায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করছে পুলিশ।
মধ্যপ্রদেশের দামোহের এই ঘটনা ভারতে গবাদিপশু পরিবহন ও ব্যবসাকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের ওপর হামলার ধারাবাহিকতারই আরেকটি উদাহরণ। এর আগেও গরু জবাই কিংবা গবাদিপশু পাচারের সন্দেহে মুসলিম ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও সাধারণ মানুষকে পিটিয়ে হত্যার একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব হামলার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে। তবে দামোহের ঘটনায় হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নির্যাতনের শিকার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও মামলা করেছে পুলিশ। ফলে হামলার বিচার এবং ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে করা মামলা ও এর তদন্ত—এসব বিষয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এমএমআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


