দেশের বিভিন্ন স্থানে উন্নয়ন কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের উপকরণে চলছে সড়কসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ । এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করেও উন্নয়ন কাজে বন্ধ হচ্ছে না দুর্নীতি ।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের লালপুর-সালামপুর অংশে তিনটি সেতুর সংযোগ সড়কসহ প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারে ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে গিয়ে অনিয়ম দেখে ঠিকাদারকে ভর্ৎসনা ও কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার বিরুদ্ধে ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দরখাস্ত করেন প্রকল্পের সাব-ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম।
জানা যায়, সড়কটি হাওড়ের চার উপজেলার মানুষের চলাচলের একমাত্র সড়ক। ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় কাজটি পান ঢাকার ঠিকাদার বদরুল ইকবাল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি দেশ ছাড়লে ২০ কোটি টাকায় সাব-ঠিকাদারি নেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন। পরে আজাদকে মামলা দিয়ে জেলে পাঠিয়ে কাজের নিয়ন্ত্রণ নেন আওয়ামীপন্থি ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত মঙ্গলবার সলুকাবাদ ইউনিয়নের লতারগাঁও হাইস্কুল মাঠে ফুটবল টুর্নামেন্ট শেষে ফেরার পথে স্থানীয়রা এমপিকে সড়কের ত্রুটি দেখান। এমপি দেখতে পান, সদ্য নির্মিত গার্ডওয়াল একপাশে হেলে পড়েছে, ফাটল ধরেছে, ব্লকে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। ভিটি বালুর বদলে ফসলি জমির টপসয়েল, মাটি কমপ্যাকশন না করেই জিওটেক্সটাইলের ওপর ব্লক বসানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম পলাশ বলেন, শুরু থেকেই সড়কের কাজে অনিয়ম হচ্ছে। বর্ষায় এই সড়ক ভেঙে নদীতে তলিয়ে যাবে। এ ধরনের অনিয়ম করার কারণে এমপি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এ ঘটনায় গত বুধবার সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলামকে নিয়ে ফের পরিদর্শনে যান এমপি। সেখানে ঠিকাদার শফিকুল অনুপস্থিত ছিলেন।
এমপি নুরুল বলেন, ৮৭ কোটি টাকার সড়কে অনিয়ম হওয়ায় কাজ বন্ধ রাখতে বলেছি। ঘণ্টা না যেতেই আমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হলো। আমি চাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। কাজে গাফিলতি থাকলে প্রমাণ হোক, আর মিথ্যা চাঁদাবাজির অভিযোগেরও বিচার হোক।
সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের ৪৩ শতাংশ কাজ শেষ, ৩৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা বিল পরিশোধ হয়েছে। এমপির অভিযোগ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাব।
ইউপি চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন বলেন, আমি ২০ কোটি টাকায় কাজ কিনে নেই, চুক্তির সাক্ষী ছিল শফিকুল। আমাকে মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে সে কাজ দখল করেছে। এ বিষয়ে সাব-ঠিকাদার শফিকুল ইসলামের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, চাঁদপুরে এলজিইডির দেড় কোটি টাকার সড়ক মেরামতের কাজ ১৫ দিনও টেকেনি। কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে গাড়ির চাকার সঙ্গে। মাত্র দুই সপ্তাহেই বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে সড়কটি। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সদর উপজেলা প্রকৌশলী রাহাত আমিন পাটোয়ারী বলছেন, অভিযোগের পর আমরা ওই ঠিকাদারকে ওই কাজ আবার করার নির্দেশ দিয়েছি। রোববার কুমিল্লা থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সেই কাজ দেখার জন্য আসছেন।
গর্ত আর ইট-সুরকি উঠে গিয়ে বেহাল হয়ে যাওয়া দুর্ভোগের সড়ক হিসেবে পরিচিত জেলা কারাগারের দক্ষিণ দিক থেকে শাহতলি বাজার পর্যন্ত সড়কটির নাম ফিডার রোড। অবশেষে সেই সড়কের কাজ করছে এলজিইডি। আশা ছিল, এবার চলাচলে ভোগান্তি কমবে, টেকসই হবে এই সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা। কিন্তু সেই আশা পূরণ হওয়ার আগেই দেখা দিয়েছে নানা সংশয় ও সংকট। সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার ১৫ দিন না যেতেই ওই সড়কের বিভিন্ন স্থানে উঠে যাচ্ছে ঢালাই। কোথাও কোথাও হাতের সামান্য চাপে ঢালাইয়ের অংশ গুঁড়া হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। সরেজমিনে দেখা গেছে, রাস্তা কার্পেটিংয়ে যে পরিমাণ বিটুমিন ব্যবহারের কথা ছিল, ঠিকাদার তার চার ভাগের এক ভাগও ব্যবহার করেননি।
চাঁদপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী জানান, ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা সড়কের এমন অবস্থা দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, জেলা কারাগার থেকে শাহতলি বাজার পর্যন্ত সড়কটির দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থা ছিল। সড়কের দুরবস্থা নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সংস্কারকাজ করা হয়। তবে পুরো কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন স্থানে ঢালাই উঠে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ফারুক ও মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন সড়কটি সংস্কার না হওয়ায় এলাকাবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে। সম্প্রতি সংস্কারকাজ হওয়ায় তারা স্বস্তির আশা করেছিলেন। কিন্তু কাজের মান ভালো না হওয়ায় সেই আশা পূরণ হয়নি।
সিএনজিচালক কাদের ও লিটন বলেন, অনেক দুর্ভোগের পর সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজের মান নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তাতে সড়কটি বেশি দিন টিকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কেন এমন হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের নির্মাণমান, কার্পেটিংয়ের পুরুত্ব, ব্যবহৃত উপকরণ এবং কাজের সময় তদারকির বিষয়গুলো যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সদর উপজেলা প্রকৌশলী রায়হাত আমিন পাটওয়ারী বলেন, ‘সড়কটি কার্পেটিংয়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় বিটুমিন ব্যবহার না করায় এ অবস্থা হয়েছে। সে কারণে আমরা রাস্তাটিতে পুনঃকাজ করার নির্দেশ দিয়েছি।’
তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি জানান, রংপুরের তারাগঞ্জে এক বছরেও শেষ হয়নি সড়কের কাজ । এতে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন ২৫ গ্রামের মানুষ । জানা গেছে, তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বুড়িরহাট-শেখেরহাট সড়কের ২ হাজার ২৫০ মিটার অংশ সংস্কারের কাজ নির্ধারিত সময়ের ছয় মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি। এক দফা সময় বাড়ানো হলেও কাজ শেষ হয়নি। সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে খোয়া। কোথাও মাটি ও খোয়ার স্তর অসমান। এতে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা জানান, দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। শেখেরহাট, তেলিপাড়া, চিলাপাক, প্রামাণিকপাড়া, কাংলাচড়া, কাজীপাড়া, দামোদরপুর, দোলাপাড়া ও মাটিয়াল পাড়াসহ আশপাশের অন্তত ২৫টি গ্রামের মানুষ এ সড়ক ব্যবহার করেন।
বুড়িরহাট দোলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সাদিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। ভ্যান-অটোরিকশার ঝাঁকুনিতে শরীর ব্যথা হয়ে যায়। রাস্তার খোয়া আর উঁচু-নিচুর জন্য গাড়িতে ঠিকমতো বসাও যায় না। প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হয়, কখন গাড়ি উল্টে যায়। রাস্তার কাজ শুরু হওয়ায় ভাবছিলাম, এবার বুঝি কষ্টের দিন শেষ হবে। কিন্তু এক বছর পার হলেও কাজ শেষ হলো না।
চিলাপাক প্রামাণিকপাড়া গ্রামের মাদরাসা শিক্ষক মাওলানা আব্দুল বারী বলেন, সড়কটির সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় এলাকাবাসী ভেবেছিলেন, এবার তাদের দুর্ভোগ কমবে। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় সেই আশা পূরণ হয়নি। সড়কের বিভিন্ন স্থানে খোয়া ছড়িয়ে আছে। কোথাও মাটি ও খোয়ার স্তর অসমান। ফলে হেঁটে চলাচলের পাশাপাশি যানবাহন চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে।
উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বুড়িরহাট-শেখেরহাট সড়কের ২ হাজার ২৫০ মিটার অংশ সংস্কারে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬২ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮৪ টাকা। জিওবিএম প্রকল্পের আওতায় কাজটি পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাহমুদ আলী সরকার। কার্যাদেশ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি কাজ শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় ছিল ৪ এপ্রিল। ওই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় এক দফা সময় বাড়ানো হয়। তবে বর্ধিত সময়সীমার বিষয়ে উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এখনো জানে না। বরাদ্দের অর্থে সংস্কারকাজ শুরু হলেও দীর্ঘসময় পরও সড়কটি পুরোপুরি চলাচলের উপযোগী হয়নি। এতে কাজের অগ্রগতি এবং নির্ধারিত সময়ে তা শেষ না হওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে ঠিকাদার মাহমুদ আলী সরকার বলেন, কাজটা গত বছর জুন মাস পার হওয়া গেছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, যার কারণে কাজটা করা হয়নি, এবার হবে। তবে কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি।
উপজেলা প্রকৌশলী নাফিউর রহমান বলেন, সড়কটির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গেও কথা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




