ইসরাইলের পক্ষে কাজে অস্বীকৃতি, বরখাস্ত গুগলের ইঞ্জিনিয়ার

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ইসরাইলের পক্ষে কাজে অস্বীকৃতি, বরখাস্ত গুগলের ইঞ্জিনিয়ার
ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

ইসরাইল সরকারের জন্য গুগলের কাজ করার প্রতিবাদ করায় তাকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রকৌশলী। এ নিয়ে তিনি যুক্তরাজ্যের একটি কর্মসংস্থান ট্রাইব্যুনালে গুগলের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে এই ঘটনাটি সামনে এল।

ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ওই প্রকৌশলী গুগলের ‘ডিপমাইন্ড’ লন্ডন কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। তিনি অফিসের সহকর্মীদের মধ্যে একটি লিফলেট বা ফ্লায়ার বিতরণ করেছিলেন, যাতে লেখা ছিল ‘গুগল সেই বাহিনীকে সামরিক এআই সরবরাহ করছে যারা গণহত্যা চালাচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

এর পাশাপাশি তিনি সহকর্মীদের প্রশ্ন করেন, ‘আপনার বেতন কি সত্যিই এর যোগ্য?’

এ ছাড়া তিনি সহকর্মীদের ইমেইল পাঠিয়ে গুগলের ২০২৫ সালের একটি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান, যেখানে গুগল মানুষকে ক্ষতি করে এমন অস্ত্র তৈরি এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘনকারী নজরদারি প্রযুক্তির প্রকল্পে যুক্ত না হওয়ার পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছিল। একই সঙ্গে তিনি কর্মীদের ইউনিয়ন বা সংগঠন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা অভিযোগে ওই কর্মী উল্লেখ করেন,‘কোনো মানুষেরই যুদ্ধাপরাধের সহযোগী হওয়া উচিত নয়-এমন ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কারণে গুগল তার সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে।

গত সেপ্টেম্বরের মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগের সঙ্গে কয়েকটি বৈঠকের পর গুগল দাবি করে তিনি পদত্যাগ করেছেন, যা ওই কর্মী পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।

দ্য গার্ডিয়ান-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই প্রকৌশলী জানান, ‘একটি ফ্রন্টিয়ার এআই গবেষণা ল্যাবে চাকরি করা তার শৈশবের স্বপ্ন ছিল। কিন্তু গুগল একের পর এক নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করার পর তার সেই অনুভূতি বদলে যায়।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘তখন তার ভীষণ খারাপ লাগত, কারণ প্রতিদিন অফিসে গিয়ে মনে হতো আপনি মানবতা এবং আপনার নিজের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।’

গুগল ডিপমাইন্ড অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গুগলের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘ওই কর্মীর বিবরণ বাস্তব তথ্যের সঠিক প্রতিফলন নয়।’

গুগলের অবস্থান হলো-প্রতিষ্ঠানের নীতি মেনে কোনো মতামত প্রকাশ বা গঠনমূলক আলোচনার জন্য কোনো কর্মীকে বরখাস্ত করা হয় না, কিংবা ইউনিয়নভুক্ত কর্মীদের সঙ্গে আলাদা কোনো আচরণ করা হয় না। ওই প্রকৌশলী তার সহকর্মীদের ‘ইউনাইটেড টেক অ্যান্ড অ্যালাইড ওয়ার্কার্স’ নামক কমিউনিকেশন ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের একটি শাখায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

মাল্টি-ট্ৰিলিয়ন ডলারের এই কোম্পানির এআই প্রযুক্তি বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কার্যকলাপে ব্যবহার করা নিয়ে উদ্বিগ্ন গুগল কর্মীদের মধ্যে তিনি একজন।

ডিপমাইন্ডের একজন ভেতরের সূত্র জানিয়েছেন, ‘২০২৫ সালে গুগলের এআই নীতিমালার পরিবর্তন কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্র বলেন,‘আমি অন্তত ১০ জনকে চিনি যারা নৈতিকতার খাতিরে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। শুরুর দিকের অনেক এআই গবেষকই মানবজাতির কল্যাণে এআই-এর ব্যবহারের বিষয়ে আদর্শবাদী ছিলেন, যা কোম্পানিটিও প্রচার করতে পছন্দ করত। কিন্তু যখন এআই সত্যিই কাজ করা শুরু করল এবং এই প্রযুক্তির বাজারমূল্য অনেক বেড়ে গেল, তখন এর অনৈতিক ব্যবহার দেখে তারা হতাশ হয়ে পড়েছেন, যেখানে ক্যানসার নিরাময়ের মতো সমস্যার পেছনে খুব একটা জোর দেওয়া হচ্ছে না।’

অন্য একজন ভেতরের ব্যক্তি বলেন,‘আমাদের অনেকেই সব ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীতে এআই ব্যবহারের বিরোধী নন, তবে আমরা এর দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যবহার বা অগণতান্ত্রিক শক্তির দ্বারা এর অপব্যবহারের বিরোধী।’

তিনি আরো বলেন, ‘এআই যে কর্তৃত্ববাদকে শক্তিশালী করার একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি হতে পারে, সে বিষয়ে অত্যন্ত যৌক্তিক উদ্বেগ রয়েছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও অন্তর্ভুক্ত।’

গাজা সংঘাতের সময় ইসরাইল সরকারের সঙ্গে গুগল ও আমাজনের ১.২ বিলিয়ন ডলারের ‘প্রোজেক্ট নিম্বাস’ নামক ক্লাউড কম্পিউটিং চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ ও বিক্ষোভ চলছে।

ইসরাইলি কর্মকর্তারা গাজা সংঘাতের সময় এই প্রযুক্তির কৃতিত্ব দিয়ে বলেছিলেন,‘এটি যুদ্ধে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটাতে সক্ষম করেছে, যা বিজয়ের একটি বড় অংশ।,

গত মাসে শত শত গুগল কর্মী মার্কিন সরকারকে কোম্পানির এআই প্রযুক্তি গোপন প্রতিরক্ষা কাজের জন্য ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। তারা চান এই প্রযুক্তি যেন ‘মানবতার কল্যাণে’ ব্যবহৃত হয়, ‘অমানবিক বা অত্যন্ত ক্ষতিকর উপায়ে’ নয়।

তবে অ্যানথ্রোপিক নামক প্রতিষ্ঠানটি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বা অভ্যন্তরীণ নজরদারিতে তাদের এআই ব্যবহারের সুরক্ষাকবচ বা গার্ডরাইল সরাতে অস্বীকৃতি জানানোর পর, গুগল পেন্টাগনের সঙ্গে একটি এআই চুক্তি স্বাক্ষর করে।

গুগলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা এই ঐকমত্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে উপযুক্ত মানুষের তদারকি বা ‘হিউম্যান ওভারসাইট’ ছাড়া এ ধরনের কাজে এআই ব্যবহার করা উচিত নয়।

এআই প্রযুক্তির বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান বিরোধের মধ্যেই এই কর্মসংস্থান বিতর্কটি সামনে এল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কলেজের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এআই প্রযুক্তির উল্লেখ আসতেই দুয়োধ্বনি দেওয়া হয়েছে। গত শুক্রবার অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে গুগলের সাবেক প্রধান নির্বাহী এরিক শ্মিট যখন বলেন, এআই ‘আপনার প্রতিটি পেশা, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি হাসপাতাল, প্রতিটি গবেষণাগার, প্রতিটি ব্যক্তি এবং প্রতিটি সম্পর্ককে স্পর্শ করবে’, তখন স্নাতকেরা তাকে ধিক্কার বা দুয়োধ্বনি দেন।

গত সোমবার গ্রেট ব্রিটেনে প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রতি তিনজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন আশঙ্কা করছেন এআই এত দ্রুত চাকরি কেড়ে নেবে যে এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

প্রযুক্তি ন্যায়বিচার বিষয়ক প্রচারণা গোষ্ঠী ‘ফক্সগ্লোভ’ এই আইনি লড়াইয়ে ওই সাবেক প্রকৌশলীকে সমর্থন দিচ্ছে। সংগঠনটির কো-এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রোজা কার্লিং সাবেক কর্মী সম্পর্কে বলেন,‘তিনি সংঘাত ও নজরদারি সংক্রান্ত সেই নৈতিক নীতিগুলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন যা গুগল গত বছর পরিত্যাগ করেছে। তার সতর্কতা শোনার পরিবর্তে, প্রতিষ্ঠানটি অভ্যন্তরীণ হুইসেলব্লোয়িংয়ের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হেনে তাকে বরখাস্ত করেছে।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন