যুদ্ধবিরতিতেও সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে ইরান

যুদ্ধবিরতিতেও সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে ইরান
ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সামরিক সক্ষমতা জোরদার করে যাচ্ছে ইরান। দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষ বলছে, আলোচনা ব্যর্থ হলে তারা আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সামরিক শক্তি পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের কাজও চলছে।

এদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নতুন করে সমঝোতার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, চুক্তি না হলে ইরানকে ‘সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ’ করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

তবে তেহরান জানিয়েছে, ওমানসহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আলোচনা চললেও সামরিক শক্তি বৃদ্ধির কার্যক্রম থেমে নেই।

ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আক্রমিনিয়া রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জুনে স্বাক্ষরিত, বর্তমানে স্থগিত থাকা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় যুদ্ধবিরতির প্রতিটি মুহূর্তকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানো হয়েছে।

তিনি বলেন, বিদ্যমান সামরিক সরঞ্জাম বাহিনীতে যুক্ত করা, নতুন সরঞ্জাম আমদানি, ক্ষতিগ্রস্ত অস্ত্রব্যবস্থা মেরামত এবং নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির কাজ চলছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোর সক্ষমতা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

গত মাসে ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাজিদ এবনে রেজা বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। যুদ্ধের আগের তুলনায় ড্রোন উৎপাদন তিন গুণ হয়েছে। যদিও তিনি এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান দেননি।

তিনি আরো বলেন, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হলেও সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয় নষ্ট হয়নি। বরং দ্রুত সিদ্ধান্ত, কৌশলগত দক্ষতা ও নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে বিস্মিত করা হয়েছে।

আইআরজিসিরও একই দাবি

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) একই ধরনের দাবি করেছে।

আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, যুদ্ধবিরতির সময় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বেড়েছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদ ক্ষমতাও উন্নত করা হয়েছে।

তবে আইআরজিসি তাদের অস্ত্রের মজুত, ক্ষয়ক্ষতি কিংবা অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বড় অংশ এখনো অক্ষত

গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ইরানের প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪০ শতাংশ ড্রোনের মজুত এখনো অক্ষত রয়েছে।

এতে ধারণা করা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘ সময় অসম যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা এখনো ইরানের রয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের যুদ্ধবিমান ও ড্রোন ইরানের আকাশসীমায় হাজারো অভিযান চালিয়েছে। যদিও ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবু দেশটির সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা একাধিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং এমকিউ-৯, এমকিউ-১ ও ‘লুকাস’ ড্রোন ভূপাতিত করেছে।

চীনা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে জল্পনা

গত সপ্তাহে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, পাকিস্তান হয়ে ইরানের কাছে চীনে তৈরি সর্বোচ্চ ৪০০টি কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা পৌঁছাতে পারে।

তবে চীন ও পাকিস্তান এই তথ্য অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে ইরানও কোনো মন্তব্য করেনি।

‘দেশীয় উৎপাদন আরও শক্তিশালী হয়েছে’

আইআরজিসির সাবেক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার হোসেইন কানানি মোঘাদ্দাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাজারো হামলাও ইরানের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দিতে পারেনি।

তার ভাষ্য, দেশীয় উৎপাদন ও অস্ত্রের মান আরো উন্নত করা হয়েছে। আগের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা ও ধ্বংসক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটিগুলোতে এখনো বড় ধরনের অস্ত্রের মজুত রয়েছে। এসব ঘাঁটির নতুন অংশ ধাপে ধাপে কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে। এ কারণেই ট্রাম্প একাধিকবার বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন।

উত্তেজনা এখনো অব্যাহত

চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনাসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দেয়। পরে সেই হামলা স্থগিত করে নতুন সমঝোতার সম্ভাবনার কথা জানায় ওয়াশিংটন।

যুদ্ধবিরতির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে স্বস্তি এলেও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমেনি।

মঙ্গলবার ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী জানায়, তারা সৌদি আরবের নজরান বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে লোহিত সাগরে ভারতীয় পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজ বিস্ফোরকবোঝাই নৌকার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে জাহাজটির ১৪ নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

এ ছাড়া কুয়েতে ইরাক সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। কিছু প্রতিবেদনে সেখানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোন হামলার দাবি করা হলেও কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা আইআরজিসি এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।

সোমবার ওমানের খাসাব উপকূলের উত্তর-পূর্বে একটি লাইবেরিয়ান পতাকাবাহী জাহাজও অজ্ঞাত উৎসের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এদিকে গত মাসে জুনের সমঝোতা কার্যত অচল হয়ে যাওয়ার পর থেকে আইআরজিসি হরমুজ প্রণালিতে বেশ কয়েকটি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন বা বাধাগ্রস্ত করেছে। তবে সমন্বয়ের মাধ্যমে কিছু ইরাকি তেলবাহী জাহাজ ইরানের সমুদ্রসীমা ব্যবহার করে উত্তর দিকের রুটে চলাচল করেছে।

অন্যদিকে ওমানের জলসীমা ঘেঁষে দক্ষিণ দিকের রুট ব্যবহারের চেষ্টা করা কিছু জাহাজকে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ওই পথ নিরাপদ নয় বলে সতর্ক করেছে ইরান।

হোসেইন কানানি মোঘাদ্দাম বলেন, সামরিক হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা সম্ভব নয়। তার দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে এবং সেগুলোর অবস্থান প্রতিপক্ষের ধারণার বাইরে। এমনকি দক্ষিণাঞ্চলের কোনো দ্বীপ সাময়িকভাবে দখল করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো পুনরুদ্ধার করবে ইরান।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন