এক.
একদিকে বিস্তীর্ণ আরব সাগর, অন্যদিকে সবুজে মোড়া সুউচ্চ পর্বতমালা, মাঝখানে নারিকেল গাছে ঘেরা উর্বর উপকূলভূমি—এই হলো মালাবার।
মালাবারের রাজা জুমান প্রাণখোলা ও প্রজাদরদি মানুষ। কোদনগাল্লুর তার রাজধানী। পাহলভি বংশের গৌরবময় উত্তরাধিকার তার হাতে এলেও তিনি শুধু পূর্বপুরুষদের কীর্তি আঁকড়ে বসে থাকেননি। নিজের প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং দক্ষতায় তিনি গড়ে তুলেছেন এক ভিন্ন পরিচয়।
কদিন ধরে সদাহাস্যোজ্জ্বল এই মানুষটি অন্য মানুষে পরিণত হয়েছেন। চোখেমুখের চিরচেনা সেই দীপ্তি যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। প্রায় সময়ই কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন। রাজকার্যের কোনো ত্রুটি হচ্ছে না বটে, কিন্তু তার অন্তরে যে কী প্রচণ্ড ঝড় বয়ে চলেছে, তা কেউ জানে না।
একান্ত সহচর মাধবন বিষয়টি লক্ষ করে বারকয়েক বিনয়ের সঙ্গে কারণ জানতে চেয়েছে, কিন্তু রাজা মুখ খোলেননি। শুধু নিচু স্বরে বলেছেন, ‘আজ সন্ধ্যায় রাজজ্যোতিষী ত্রৈলোক্যকে আমার কাছে নিয়ে এসো।’ এর বেশি আর কিছু বলেননি তিনি।
দুই.
সন্ধ্যা নেমেছে অনেকক্ষণ। সমুদ্রের দিক থেকে বয়ে আসা নোনা হাওয়া প্রাসাদের চারপাশে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা আম, কাঁঠাল আর নারকেলগাছের সারিগুলোকে অবিরাম দুলিয়ে যাচ্ছে। প্রাসাদের ছাদে একা পায়চারি করছেন রাজা জুমান। এমন সময় রাজজ্যোতিষী ত্রৈলোক্য এসে মৃদু গলাখাঁকারি দিলে রাজা জুমানের সংবিৎ ফিরল। তিনি পেছন ফিরে ত্রৈলোক্যকে দেখে সম্মান জানিয়ে মাথা নত করলেন। ত্রৈলোক্য কোনো কথা না বলে কেবল ডান হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন।
রাজা তাকে নিয়ে ছাদের একপাশে সাজানো কুরসিতে গিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ দুজনেই নীরব। সমুদ্রের হাওয়ায় নারকেলপাতার শোঁ শোঁ আওয়াজ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই। রাজাই নীরবতা ভাঙলেন, ‘জ্যোতিষাচার্য, কদিন ধরে আমার মন বড় অস্থির। কোনো কাজেই মন বসাতে পারছি না।’
ত্রৈলোক্য এতক্ষণ রাজাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। রাজার চেহারা দেখেই কিছুটা আন্দাজ করতে পারছিলেন তিনি। এবার গমগমে ভরাট কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে, মহারাজ? আমাকে খুলে বলুন।’
রাজা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘সেদিন রাতেও আমি এই ছাদেই পায়চারি করছিলাম। ঠিক তখনই এক আশ্চর্য দৃশ্য আমার নজরে পড়ে...।’
‘কেমন দৃশ্য?’
‘দেখলাম, পূর্ণিমার মস্ত চাঁদটি হঠাৎ দুই খণ্ড হয়ে গেল। এক খণ্ড চলে গেল দূরের পাহাড়ের এক পাশে, অন্য খণ্ড আরেক পাশে। কিছুক্ষণ পর আবার জোড়া লেগে গেল।’
ত্রৈলোক্য বিস্ময়ে সোজা হয়ে বসলেন—‘বলছেন কী, মহারাজ! এমন ঘটনার কথা তো কোনো শাস্ত্রেও পড়িনি। মানুষ জাদুবলে অনেক বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু আকাশের চাঁদ...! সেখানে তো মানুষের কোনো ক্ষমতা চলে না।’
রাজা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন—‘সেই কারণেই কাউকে বলতে সাহস পাইনি। যদি সবাই আমাকে বিভ্রমগ্রস্ত কিংবা উন্মাদ মনে করে!’
‘অন্য কেউ কি ঘটনাটি দেখেছে বলে শুনেছেন?’
‘না। খোঁজ নেওয়ারও সাহস হয়নি।’
ত্রৈলোক্য কিছুক্ষণ নীরবে চিন্তা করলেন। তারপর ধীর কণ্ঠে বললেন, ‘মহারাজ, আপনার দেখা যদি বিভ্রম না হয়ে থাকে, তবে এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো মহাজাগতিক তাৎপর্য আছে। জগতে কোনো অসাধারণ ঘটনা ঘটলে কখনো কখনো প্রকৃতিও তার ইঙ্গিত বহন করে।’
রাজা আগ্রহভরে সামনে ঝুঁকে এলেন—‘কী বলতে চাইছেন?’
‘শাস্ত্রে বর্ণিত আছে, কলিযুগে এক মহাপুরুষের আবির্ভাব হবে। কেউ তাকে কল্কি অবতার বলেন, কেউ নরাশংস নামে উল্লেখ করেন। আমি নিশ্চিত নই, তবে আপনার দেখা ঘটনাটির সঙ্গে তার আবির্ভাবের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে।’
রাজা বিস্ময়ে বললেন, ‘তাহলে তো তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।’
ত্রৈলোক্য মাথা নাড়লেন। ‘শাস্ত্রে তার জন্মস্থান হিসেবে শম্ভলের কথা আছে। কিন্তু সেই শম্ভল কোথায়, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না।’
রাজা দৃঢ়স্বরে বললেন, ‘আপনি খোঁজ শুরু করুন। যত মুদ্রা লাগে, রাজকোষ থেকে দেওয়া হবে।’
তিন.
শহরের বন্দরসংলগ্ন সরদার বাসুমতির সরাইখানায় এসে ঢুকলেন ত্রৈলোক্য। সকাল হলেও সরাইখানাটি ইতোমধ্যে জমে উঠেছে। নানা দেশের বণিকের আনাগোনায় মুখর চারদিক। সাধারণ অতিথিদের পাশে একটি আসনে গিয়ে বসলেন ত্রৈলোক্য। আশপাশের লোকজনও তাকে দেখে সসম্ভ্রমে জায়গা করে দিল।
কিছুক্ষণ পর তার সামনে পরিবেশন করা হলো ধোঁয়া ওঠা এক বাটি কাঞ্জি, সঙ্গে কোরানো নারকেল আর দুটি পাকা কলা। খেতে খেতে ত্রৈলোক্যের দৃষ্টি পড়ল পাশের সারিতে বসা একদল আরব বণিকের দিকে।
দলটির মাঝখানে বসে আছেন শুভ্র দাড়িওয়ালা এক প্রবীণ ব্যক্তি। বাকিরা তাকে ‘শেখ সালেম’ বলে সম্বোধন করছে। বৃদ্ধ গল্প বলছেন, আর চারপাশের সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে। ত্রৈলোক্যের আরবি ভাষায় তেমন দখল না থাকলেও, কাজ চালানোর মতো আরবি তিনি জানেন। তবে বৃদ্ধের কথার ভঙ্গি, শ্রোতাদের বিস্মিত চেহারা আর বারবার উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ তার মনে কৌতূহল জাগিয়ে তুলল। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বলছিলেন, ‘...তিনি একজন বিস্ময়কর মানুষ। জীবনের চল্লিশটি বছর মক্কার মানুষের সঙ্গে কাটিয়েছেন। অথচ আজ পর্যন্ত কেউ তার বিরুদ্ধে একটি মিথ্যার অভিযোগও তুলতে পারেনি। কাউকে গালি দেননি, কারো হক নষ্ট করেননি। মানুষ নির্দ্বিধায় তার কাছে নিজেদের মূল্যবান সম্পদ আমানত রাখত। কারণ সবাই জানত, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ আমানতের খেয়ানত করেন না। মক্কার লোকেরা তাকে ভূষিত করেছিল আল-আমিন উপাধিতে।’
বৃদ্ধের কণ্ঠে এমন এক আকর্ষণ ছিল যে, সরাইখানার কোলাহল ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এলো। উপস্থিত সবাই ডুবে গেল তার কথার ফুলঝুরিতে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। শুধু একজোড়া বিস্মিত চোখ নিবদ্ধ সেই প্রবীণ আরবের দিকে।
ত্রৈলোক্যও আর নিজের মধ্যে নেই। সামনে রাখা কাঞ্জির বাটিতে হাত চালালেও তার মনও পড়ে আছে পাশের আসরে। তিনি আড়চোখে বৃদ্ধের দিকে তাকান, আবার দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেন। যেন শুনছেন না, এমন ভান করে প্রতিটি কথাই মন দিয়ে শুনে চলেছেন।
বৃদ্ধের বর্ণনায় আরবের সেই নবীর চরিত্র, শিক্ষা আর কোরআনের কথা শুনতে শুনতে ত্রৈলোক্যের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আলোড়ন জাগে। ‘তবে কি...এই মানুষটিই সেই মহাপুরুষ?’ তিনি নিজের মনে বললেন, ‘না, এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নয়। আগে দেখি, বৃদ্ধ আর কী বলেন...।’
যুবকদের মধ্যে একজন এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। এবার সে নড়েচড়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা চাচা, নবী মূসার লাঠি সাপ হয়ে যাওয়া কিংবা নবী ঈসার মৃতকে জীবিত করার মতো চোখে দেখা যায়—এমন কোনো মুজিজা কি নবী মুহাম্মাদ থেকে প্রকাশ পায়নি?’ বৃদ্ধ স্মিত হেসে বললেন, ‘কেন থাকবে না! এমন বহু মুজিজা তার দ্বারা প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ একটি হলো চাঁদ দুই টুকরা হওয়ার ঘটনা।’
চাঁদ দুই টুকরা হওয়ার ঘটনা শুনে এক ঝটকায় ঘুরে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন বৃদ্ধের দিকে। ‘তবে কি মহারাজ জুমানের দেখা ঘটনা...?’
চার.
রাতের শেষ প্রহর পেরিয়ে সবে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। পূর্ব দিগন্তে একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ছে লালচে আভা। এমনই ভোরে রাজজ্যোতিষী ত্রৈলোক্য এসে দাঁড়ালেন সরাইখানার দোরগোড়ায়। শেখ সালেম তখন শেষ রাতের ইবাদত সেরে মুসল্লায় বসে তাসবিহ আদায় করছেন। ভোরের নিস্তব্ধতায় হঠাৎ কামরার বাইরে একটি অপরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘শেখ সালেম ঘরে আছেন? দেখা করা যাবে আপনার সঙ্গে?’
ত্রৈলোক্য কোনো ভূমিকা না করে এক নিঃশ্বাসে সব কথা খুলে বললেন। সবশেষে প্রায় আবদারের সুরে বললেন, ‘শেখ, যদি অনুগ্রহ করে আমার সঙ্গে রাজপ্রাসাদে যান, তবে মহারাজ চিরকৃতজ্ঞ থাকবেন।’
কথাগুলো শুনে শেখ সালেমের চোখ দুটো উদীপ্ত হয়ে উঠল। তিনি আবেগভরা কণ্ঠে বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ! এ তো আমার জন্য বিরাট সম্মানের বিষয়।’
পাঁচ.
রাজজ্যোতিষী ত্রৈলোক্য শেখ সালেমকে নিয়ে রাজপ্রাসাদের এক নির্জন গোপন কক্ষে এসে বসলেন। রাজা আপাতত চান না, এই সাক্ষাতের খবর পাঁচকান হোক।
খাওয়ার পর্ব শেষ হতেই রুপোর ছোট থালায় করে অতিথিদের সামনে আনা হলো তাজা পানপাতা, কুচি করা সুপারি, সঙ্গে সামান্য এলাচ, লবঙ্গ ও এক চিমটি সুগন্ধি কর্পূর। মালাবারের অভিজাতদের কাছে ভোজনের এই হলো শেষ পর্ব।
রাজা জুমান শেখ সালেমকে নিয়ে জানালার ধারে বসলেন। সূর্য ততক্ষণে মাথার ওপর উঠে এসেছে। দূরে আরব সাগরের ঢেউয়ের গর্জন ভেসে আসছে ক্ষীণ হয়ে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে রাজা বললেন, ‘সরাইখানায় সেদিনকার আলোচনার কথা আমি ত্রৈলোক্যের কাছে শুনেছি। কিন্তু তাতে আমার তৃষ্ণা আরো বেড়েছে। দয়া করে আপনি তা নিবারণ করুন।’
শেখ সালেম গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করলেন; বললেন, ‘মহারাজ, আমাদের নবী বলেন, আল্লাহ এক, তার কোনো শরিক নেই। তিনিই আকাশ-জমিন, চন্দ্র-সূর্য, পাহাড়-সমুদ্র—সবকিছুর স্রষ্টা। ইবাদতের উপযুক্ত একমাত্র তিনিই।’
কক্ষজুড়ে নেমে এলো গভীর নীরবতা। বাইরে কোথাও একটি পাখি ডেকে উঠল একবার, আবার সব নিস্তব্ধ। দীর্ঘক্ষণ পর রাজা ধীরে ধীরে মুখ তুললেন। তার কণ্ঠ কাঁপছিল—‘আচ্ছা... কেউ যদি আপনাদের নবীর ধর্ম গ্রহণ করতে চায়, তবে তাকে কী করতে হয়?’
প্রশ্নটি শুনে শেখ সালেমের বুক কেঁপে উঠল। তিনি বিস্ময়ে রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
ছয়.
একদিন নির্জনে শেখ সালেমকে তিনি বললেন, ‘শেখ, যে মানুষটির জন্য অন্ধকার থেকে আলোর পথ পেলাম, তাকে একবার না দেখে শান্তি পাব না। আমার প্রাণ তাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। আমি মক্কায় তার কাছে যেতে চাই।’
শেখ সালেম জানালেন, তাদের বণিকদল মূলত সিংহল দ্বীপের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। সেখানে আদম (আ.)-এর পদচিহ্ন বলে খ্যাত এক পাহাড় দর্শনের ইচ্ছা তাদের বহুদিনের। মালাবারে তারা সাময়িক নোঙর ফেলেছে কেবল।
সব কথা শুনে রাজা কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘তাহলে আপনারা সিংহল থেকে ফিরে আসার সময় আমাকে সঙ্গে করে নেবেন।’
সাত.
রাজা জুমান রাজকার্যের দায়িত্ব বিশ্বস্ত কয়েকজনের হাতে বুঝিয়ে দিলেন। সবাইকে শুধু এতটুকুই জানালেন, ‘আমি কয়েক দিনের জন্য নির্জন উপাসনায় থাকব। এ সময় কেউ যেন আমাকে বিরক্ত না করে।’
কয়েক দিন পর শেখ সালেমদের কাফেলাও নিরাপদে ফিরে এলো। সেই বহু প্রতীক্ষিত সময়ও এসে উপস্থিত হলো। দুরুদুরু বক্ষে রাজা জুমান জাহাজে উঠে বসলেন। কালো আলখাল্লা ও পাগড়িতে নিজেকে এমনভাবে আড়াল করে রাখলেন যে, তাকে দেখে কোনোভাবেই মালাবারের রাজা বলে মনে হয় না।
সমুদ্র উপকূলে তখন জাহাজটি মৃদু দোল খাচ্ছে। তীরে সারি সারি নারকেলগাছ, দূরে রাজপ্রাসাদের চূড়া, আরো দূরে সবুজ পাহাড়রেখা—সবকিছু যেন শেষবারের মতো তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সন্ধ্যায় জোয়ার উঠলে মাল্লারা নোঙর তুলল একযোগে। পালগুলো ফুলে উঠল হাওয়ার তোড়ে। ধীরে ধীরে জাহাজটি তীর ছেড়ে ভেসে চলল গভীর সমুদ্রের দিকে। রাজা জুমান জাহাজের প্রান্তে এসে দাঁড়ালেন। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রইল ক্রমেই দূরে সরে যেতে থাকা মালাবারের দিকে। একসময় তিনি মুখ ফিরিয়ে তাকালেন পশ্চিম দিগন্তে। সেই দিগন্তের ওপারেই আরব।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

