মক্কার সামরিক জোট কী ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হয়ে উঠবে

মক্কার সামরিক জোট কী ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হয়ে উঠবে
মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান আর তুরস্কের শীর্ষ নেতারা এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ছবি: বিবিসি বাংলা

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক চুক্তি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। তিন দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা একে অন্যের থেকে আলাদা। ফলে তাদের এই জোটকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

চুক্তিটির প্রতীকী গুরুত্বও রয়েছে। মুসলিমদের পবিত্র শহর মক্কায় এটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ফলে অনেকের কাছে এটি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নতুন নিরাপত্তা সহযোগিতার বার্তা বহন করছে।

বিজ্ঞাপন

তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে চুক্তির একটি শর্ত নিয়ে। এতে বলা হয়েছে, কোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে সেটিকে সব দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ন্যাটোর গঠনতন্ত্রের অনুচ্ছেদ ৫-এর সঙ্গে এই শর্তের মিল রয়েছে।

তাই কেউ কেউ এই জোটকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলছেন। তবে এই জোট বাস্তবে ন্যাটোর মতো কার্যকর সামরিক কাঠামো হয়ে উঠবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

তিন দেশের শক্তি এক জায়গায়

সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে তুরস্ক এই জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটির শক্তিশালী সেনাবাহিনী রয়েছে। তাদের যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিও উন্নত।

অন্যদিকে সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা। দেশটি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়ে থাকে। তুরস্ক থেকেও তারা ড্রোনসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কিনছে।

পাকিস্তান আবার পরমাণু শক্তিধর দেশ। দেশটির সেনাবাহিনী চীনা সামরিক সরঞ্জামও ব্যবহার করে।

এই তিন ধরনের সক্ষমতার সমন্বয়ই নতুন জোটটিকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে। সামরিক প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ব্যয় এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে কে কীভাবে অবদান রাখবে, তা নিয়েও দেশগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ইরান ও ইসরাইলকে ঠেকানোর হিসাব?

নতুন জোটটি কি একই সঙ্গে ইরান ও ইসরাইলকে প্রতিরোধের একটি উদ্যোগ—এ প্রশ্নও উঠেছে।

গাজায় সংঘাত শুরুর পর ইসরাইলের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে সৌদি আরবের উদ্বেগ রয়েছে।

ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের সময় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও তেল স্থাপনায় হামলা হয়েছে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র হামলার শিকার দেশগুলোকে কার্যকর নিরাপত্তা দিতে পারেনি বলে সমালোচনা রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তার একটি অতিরিক্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন। তবে জোটের নেতারা বলছেন, এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়। এর লক্ষ্য সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

পাকিস্তান ও সৌদি আরব গত বছর যে সামরিক চুক্তি করেছিল, এবারের চুক্তিকে তারই বিস্তৃত রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সৌদি আরবের কৌশল

সৌদি আরব এই জোটের কেন্দ্রে রয়েছে। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে আরব উপসাগর, অন্যদিকে লোহিত সাগর। দীর্ঘ সমুদ্রসীমা দেশটিকে কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে।

অর্থনৈতিক শক্তির কারণে সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুই দেশকে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে পারছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

তবে ন্যাটোর মতো কার্যকর সামরিক জোট তৈরি করতে সময় লাগবে। শুধু চুক্তি করলেই একটি সমন্বিত সামরিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে না।

সৌদিতে হামলা হলে কী করবে পাকিস্তান-তুরস্ক?

এই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী একটি দেশে হামলা হলে অন্য দুই দেশ সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে গেলে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। কারণ তিন দেশই আগে থেকে ভিন্ন ভিন্ন সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।

তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য। পাকিস্তান চীনের সামরিক সরঞ্জামের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।

অতীতে সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের অবস্থান ছিল সতর্ক। হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের যুদ্ধে পাকিস্তান সেনা ও বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দিলেও সরাসরি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সহায়তা দেয়নি।

ইরান যখন সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছিল, তখনও পাকিস্তান সৌদির পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে যায়নি। এর একটি কারণ ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্ত রয়েছে।

এ কারণে নতুন জোটের কার্যকারিতা কাগজে-কলমে নয়, বরং বাস্তব কোনো হামলার পর দেশগুলোর পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে।

আগেও ‘ইসলামিক ন্যাটো’ গড়ার চেষ্টা হয়েছিল

সৌদি আরব এর আগেও এমন একটি জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল।

বিবিসির নিরাপত্তাবিষয়ক সংবাদদাতা ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সৌদি আরবের উদ্যোগে ৩০টির বেশি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশকে নিয়ে ‘ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেররিজম কোয়ালিশন’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

এর লক্ষ্য ছিল আন্তদেশীয় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করা। সৌদি আরবে সদস্যদেশগুলোর অংশগ্রহণে ‘নর্থ থান্ডার’ নামে বড় সামরিক মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

তখন মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা এই জোটকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নামে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু পরে এর কার্যক্রম তেমন দৃশ্যমান হয়নি।

এবারের উদ্যোগের পার্থক্য হলো, এতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত শক্তি—সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক—একসঙ্গে রয়েছে।

তবে মক্কায় স্বাক্ষরিত চুক্তিতে এমন কোনো স্পষ্ট শর্ত নেই যে সৌদি আরবে হামলা হলে পাকিস্তান ও তুরস্ককে অবশ্যই সেনা পাঠাতে হবে।

ফলে জোটটি কতটা কার্যকর, তা বোঝার জন্য ভবিষ্যতের কোনো সংকটের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।

পাকিস্তানের জন্য ভারসাম্যের পরীক্ষা

এই জোটে পাকিস্তানের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

একদিকে পাকিস্তান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইরানের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে—এমন একটি সামরিক জোটে যোগ দিয়েছে।

ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কও রয়েছে। এ কারণে ইরানের কাছে পাকিস্তানের একটি কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আছে।

আবার মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গেও পাকিস্তানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দেশটি ওই অঞ্চল থেকে জ্বালানি আমদানি করে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি কাজ করেন। তাদের পাঠানো অর্থ পাকিস্তানের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাই ইসলামাবাদকে একই সঙ্গে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে।

এই কারণে জোটের নেতারা বারবার বলছেন, এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে গঠিত হয়নি। তবে পরিস্থিতি বদলালে পাকিস্তানের জন্য ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ভারত, চীন ও ইরানের নজরও থাকবে

নতুন জোটের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এশিয়ার কয়েকটি দেশও এর দিকে নজর রাখছে।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে গত কয়েক মাসে একাধিকবার সীমান্তে সংঘর্ষ হয়েছে। ভবিষ্যতে পাকিস্তানে হামলা হলে সৌদি আরব ও তুরস্ক কী করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ভারতের সঙ্গেও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতে আবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে নতুন জোটের সদস্যরা কী ভূমিকা নেবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সৌদি আরব ও তুরস্ক সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে না গেলেও পাকিস্তানকে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে পারে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও প্রভাব পড়তে পারে।

এর সঙ্গে ভারতের ইসরাইলের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্কের বিষয়টিও যুক্ত হচ্ছে। একই সময়ে ভারত সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার চুক্তির প্রাথমিক রূপরেখায় স্বাক্ষর করেছে।

অন্যদিকে পাকিস্তান চীনের কাছ থেকেও যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও নজরদারি প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন সামরিক সহায়তা পেয়ে থাকে।

ফলে নতুন জোটকে ঘিরে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

পাকিস্তানের জোটে থাকা যেমন ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে, তেমনি সৌদি আরবের অংশগ্রহণ ইরানের জন্য এবং তুরস্কের অংশগ্রহণ গ্রিসের জন্য উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

ন্যাটোর মতো জোট হতে কতটা সময় লাগবে?

সব মিলিয়ে মক্কায় স্বাক্ষরিত সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

তবে এর প্রকৃত শক্তি নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। তিন দেশের সামরিক বাহিনী কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে, গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক প্রযুক্তি কীভাবে ভাগ করে নেয় এবং কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্যরা বাস্তবে কী পদক্ষেপ নেয়—এসবই হবে মূল পরীক্ষা।

ভবিষ্যতে মিসর বা কাতারের মতো দেশ এই কাঠামোয় যুক্ত হলে জোটটির পরিসর আরো বাড়তে পারে। তখন ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নামটি আরো জোরালোভাবে আলোচনায় আসবে।

কিন্তু আপাতত এটি একটি সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগ। ন্যাটোর মতো কার্যকর সামরিক জোটে পরিণত হতে হলে এর সামনে এখনো অনেক পথ বাকি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন