ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনের বিজয়ের দাবি নাকচ করলেন নোবেলজয়ী সাংবাদিক

ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনের বিজয়ের দাবি নাকচ করলেন নোবেলজয়ী সাংবাদিক

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আর বিজয়ের দাবি করতে পারেন না বলে মন্তব্য করেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী রুশ সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভ। তার মতে, প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে যেভাবেই শেষ হোক না কেন, এত মানুষের প্রাণহানির পর এটিকে কোনো পক্ষের বিজয় বলা সম্ভব নয়।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার সংবাদপত্র নোভায়া গাজেতার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান সম্পাদক মুরাতভ বলেন, ইউক্রেনকে ধ্বংস করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু দেশটিকে জয় করা সম্ভব নয়। দুই স্লাভ জাতির মধ্যে এই যুদ্ধে ১০ লাখ বা তারও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এত মানুষের মৃত্যুর পর এটিকে কোনোভাবেই বিজয় বলা যায় না।

বিজ্ঞাপন

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। মস্কো তখন এটিকে বিশেষ সামরিক অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছিল এবং ধারণা করা হয়েছিল, অভিযানটি দ্রুত শেষ হবে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে পরিণত হয়েছে।

এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন এখনো রাশিয়ার বিজয়ের কথা বলছেন। তবে মুরাতভ মনে করেন, যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি রাশিয়ার জন্যও গভীর সংকট তৈরি করেছে। রাশিয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর দমন-পীড়ন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

মুরাতভ বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বহু সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী ও সরকারের সমালোচককে বিদেশি এজেন্ট, উগ্রপন্থি কিংবা সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ায় রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে অন্তত দেড় হাজার মানুষ কারাগারে রয়েছেন। যদিও এই সংখ্যার স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।

মুরাতভের প্রতিষ্ঠিত নোভায়া গাজেতা একসময় রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীন সংবাদপত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নানা ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে পত্রিকাটি ব্যাপক পরিচিতি পায়। ২০২১ সালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় ভূমিকার জন্য ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসার সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান মুরাতভ। তবে নোবেল পুরস্কারও তার সংবাদপত্রকে রক্ষা করতে পারেনি।

মুরাতভ বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তে পত্রিকাটির মুদ্রণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং নিবন্ধন বাতিল করা হয়। বর্তমানে নোভায়া গাজেতার ওয়েবসাইটও রাশিয়ায় ব্লক করা হয়েছে। বিদেশ থেকে বা ভিপিএনের মাধ্যমে এটি দেখা যায়। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার নিরাপত্তা আদৌ বেড়েছে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন মুরাতভ। তিনি বলেন, ইউক্রেনীয় ড্রোন এখন রাশিয়ার অভ্যন্তরের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে। দেশটিতে জ্বালানি সংকট, মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারে বিঘ্নসহ নানা সমস্যাও দেখা দিয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা নিয়ে এই নোবেলজয়ী সাংবাদিকের ভাষ্য, চলতি বছরের শুরু থেকে রাশিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি পাঁচ শতাধিকবার আলোচনায় এসেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে এ নিয়ে আলোচনা তাকে উদ্বিগ্ন করেছে।

তবে পুতিনের ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা নিয়ে তিনি সন্দিহান। মুরাতভ বলেন, রুশ শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন বা গোপন ষড়যন্ত্রের নানা আলোচনা তিনি বিশ্বাস করেন না। তার মতে, রাশিয়া এখনো পুতিনের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে এবং দেশের ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাও তাকে ভয় করেন।

নিজেও রাশিয়ায় ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন মুরাতভ। এই তকমা পাওয়া ব্যক্তিদের নানা অধিকার সীমিত করা হয় এবং সমাজে তাদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়। তবে নিজের সমস্যার চেয়ে কারাবন্দি যুদ্ধবিরোধী ব্যক্তিদের নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন তিনি। সাক্ষাৎকারে তিনি কয়েকজন কারাবন্দি সাংবাদিক ও যুদ্ধবিরোধী কর্মীর ছবি দেখান।

তাদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক আন্তোনিনা ফাভোরস্কায়া, কনস্তানতিন গাবভ, সের্গেই কারেলিন ও আর্তিওম ক্রিগার। উগ্রপন্থার অভিযোগে তাদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলায় কারাগারে রয়েছেন সাবেক স্থানীয় কাউন্সিলর আলেক্সেই গোরিনভও। মুরাতভ স্মরণ করেন পিয়ানোবাদক পাভেল কুশনিরের কথাও। ইউক্রেন যুদ্ধবিরোধী ভিডিও প্রকাশের পর তাকে আটক করা হয়েছিল। পরে অনশনরত অবস্থায় প্রাক-বিচার আটক কেন্দ্রে তার মৃত্যু হয়। তখন তার বয়স ছিল ৩৯ বছর।

রাশিয়ায় সমালোচকদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করলেও পুরোপুরি হতাশ নন মুরাতভ। তিনি বলেন, অনেক মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান। তবে রাস্তায় তার ও সহকর্মীদের প্রতি সমর্থন জানানো মানুষের অভাব নেই। এখন এমন সময় চলছে যখন মানুষ চুপ করে থাকে। কিন্তু তারা ফিসফিস করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আর মানুষ আসলে কী ভাবছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন