চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়নে পতিত আওয়ামী সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেক শিক্ষক-কর্মকর্তা। নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া ফ্যাসিবাদের সহযোগী ও সুবিধাভোগী এসব শিক্ষক এখনো বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটিতে কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা নামমাত্র বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ শিক্ষক-কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও পরে শাস্তি মওকুফ করা হয়েছে। একইভাবে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাইবিরোধীদের অপরাধকে স্বাভাবিক করে তাদের পুনর্বাসনও চলছে। এতে সংশ্লিষ্টদের মাঝে বেশ স্বস্তি ফিরে এসেছে। অনেকে আবার নানা কৌশলে নতুন করে বাগিয়ে নিচ্ছেন প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা। তাছাড়া নতুন ব্যানারে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকেরা আবার তৎপর হচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই বিপ্লববিরোধী অপপ্রচার ও বিভিন্ন ধরনের ন্যারেটিভ তৈরি করছেন।
সূত্রমতে, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়নে সম্পৃক্ততা এবং উসকানি দেওয়ার অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দুই শিক্ষককে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জুলাইবিরোধী অবস্থান ও হত্যাচেষ্টাসহ নানা অভিযোগের মামলায় কারাগারে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. সাদেকা হালিমকে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে এ ধরনের আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সক্রিয় সহযোগী ও সুবিধাভোগী বহু শিক্ষক ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শাস্তির আশ্বাস দেওয়া হলেও তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এতে চরম ঝুঁকি নিয়ে জুলাই আন্দোলনে জড়িত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। ফ্যাসিবাদী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জোর দাবি অব্যাহত আছে।
এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)-এর সাংগঠনিক সম্পাদক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন বলেন, ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত এবং সহযোগিতা প্রদানকারী প্রত্যেক ব্যক্তির নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত বিচার হওয়া প্রয়োজন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হোন বা অন্য কোনো পেশার মানুষ হোন। অন্যথায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকবে, যা ভবিষ্যতে একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করবে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে অভিযোগের প্রকৃতি অনেক সময় সহিংসতায় অংশগ্রহণ নয়; বরং এমন বক্তব্য, বা বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান গ্রহণ করেছেন, যা সহিংসতা, ঘৃণা ও বিভাজনকে উসকে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা উচিত।
তবে আমি ঢালাওভাবে সব শিক্ষককে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পক্ষে নই। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, কেবল তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ড. বিলাল হোসাইন বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি সমন্বিত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ঢাবিতে ছয় অধ্যাপককে অব্যাহতি, একজনকে বহিষ্কার
জুলাই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের সেই আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা। নিরীহ ছাত্রছাত্রীদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের নৃশংস হামলায় সহযোগী ছিলেন তারা। অথচ নগ্ন দলবাজ শিক্ষকরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। অনেকে আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। যদিও জুলাই বিপ্লবের দুই বছরের মাথায় ফ্যাসিবাদী অবস্থানের কারণে সম্প্রতি স্থায়ীভাবে বরখাস্তের সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন ঢাবি অধ্যাপক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. সাদেকা হালিম। আরো ছয় অধ্যাপককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থি মতাদর্শের ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ‘নীল দল’ নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষকরা। সম্প্রতি উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেন তারা। সে পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ।
গত ২৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বলে জানা গেছে।
সূত্রমতে, জুলাই বিপ্লবের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের বিরুদ্ধে স্থায়ী বহিষ্কারের সুপারিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. তাজমেরি এস এ ইসলাম বলেন, জুলাই নিয়ে কটূক্তি করা এবং জুলাইবিরোধী অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সব দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আরো অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাবিতে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নামমাত্র শাস্তি, ক্ষোভ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) জুলাই-আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দীর্ঘ ১৮ মাস তদন্ত কার্যক্রম শেষে নামমাত্র শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পাশাপাশি শাস্তিপ্রাপ্ত ৪৩ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতার শাস্তি পুনর্বিবেচনা করে ১৬ জনকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি ও ২০ জনের শাস্তি হ্রাস করা হয়। গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় হামলায় মদত দেওয়ায় অভিযুক্ত ২১ শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী ইকবালকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এছাড়া ৯ জন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তার পদাবনতি ও বেতন অবনমন করা হয়। দুই শিক্ষককে সতর্ক এবং সাত শিক্ষক ও এক কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই বিচারকে প্রহসনমূলক ও আইওয়াশ বলছেন শিক্ষার্থীরা। অনেকে সমঝোতার বিচারও বলছেন। এ বিচার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনজুম শাহরিয়ার বলেন, শিক্ষকদের নামমাত্র বিচার করে দায়মুক্তি দিয়েছে এই প্রশাসন। ছাত্রলীগকেও শাস্তি থেকে অব্যাহতি দিয়েছে এই প্রশাসন।
ছাত্রশক্তির জাবি শাখার সভাপতি জিয়াউদ্দিন আয়ান বলেন, এটা কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়, অরুনাপল্লীতে বসে করা এক সাজানো সমঝোতা। এই প্রহসনের বিচার আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি।
ধরাছোঁয়ার বাইরে রাবির ফ্যাসিবাদী শিক্ষকরা
জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে চব্বিশের ৩১ জুলাই আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ (হলুদ প্যানেল) মানববন্ধন করে এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার জন্য উস্কানিমূলক বক্তব্য দিতে দেখা যায় তাদেরকে। তবে বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি প্রশাসনকে।
উল্টো ‘ডিন’ পদে দীর্ঘদিন বহাল ছিলেন আওয়ামীপন্থি হলুদ প্যানেল থেকে নির্বাচিতরা। এছাড়াও সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবেও কয়েকজন আওয়ামীপন্থি শিক্ষক আছেন। তবে ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর দিনব্যাপী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, চেম্বারে তালা ও রেজিস্ট্রারকে অবরুদ্ধ করে রাখার মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় ডিন পদত্যাগ করেন।
সর্বশেষ গত মাসের ১৪ তারিখে জুলাই আন্দোলনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রায় ৩০০ শিক্ষকের একটি তালিকা উপাচার্যের কাছে জমা দেয় রাবি কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (রাকসু)। একইসঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষকদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানায় সংগঠনটি।
তালিকা হস্তান্তরের পর রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, তালিকাভুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেলের ফুটেজ, সংবাদ প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে অভিযুক্ত অনেক শিক্ষক এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছেন। তাদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই বিপ্লববিরোধী অপপ্রচার ও বিভিন্ন ধরনের ন্যারেটিভ তৈরি করছেন। প্রশাসন যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমরা তাদের চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সোপর্দ করব।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের একটি শক্ত আইনগত ভিত্তি (লিগ্যাল গ্রাউন্ড) তৈরি করতে হবে। আইনগত ভিত্তি ছাড়া আগালে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী মহলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। প্রশাসনের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জবিতে বিচার হয়নি ফ্যাসিবাদীদের
পতিত আওয়ামী সরকারের সময় রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পান শিক্ষক-কর্মকর্তারা। জুলাই বিপ্লববিরোধী অবস্থানে তারা বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো ছাড়তে বাধ্য হলেও কোনো শাস্তির মুখোমুখি হননি। যে কারণে ফ্যাসিবাদী শিক্ষকরা নতুন করে সক্রিয় হচ্ছেন বলে জানা গেছে।
সূত্রমতে, জবির সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন পদে গত ৭ জুলাই নিয়োগ পান ফ্যাসিবাদী শিক্ষক অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম। ১২ জুলাই তিনি পদটিতে যোগদানও করেন। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ১৯ জুলাই তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। যদিও তিনি পদত্যাগপত্রে ব্যক্তিগত কারণ দেখান।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের কয়েকটি সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ৩ আগস্ট গণভবনে অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকে অংশ নেন আইনুল ইসলাম। পরদিন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে নীল দলের ব্যানারে একটি মানববন্ধন করেন। তার অন্য সহকর্মীরাও একইভাবে বহাল তবিয়তে আছেন।
এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন আমার দেশকে বলেন, জুলাই গণহত্যার বিরুদ্ধে যে-ই থাকুক, আমার বাবা থাকুক বা ছেলে থাকুক তার বিচার যেন হয়, নয়তো অন্য গণহত্যায় তাকে উৎসাহিত করা হবে। সুতরাং এই ক্ষেত্রে আওয়ামী বিএনপি কোনো বিষয় নয়। এখানে যারাই ওই সময়ে গণহত্যার সঙ্গে জড়িত বা কোনো না কোনো দায় খুঁজে পাওয়া যাবে। যারাই হোক, জুলাইয়ের প্রশ্নে কোনো আপস নেই।
তিনি আরো বলেন, জবি শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নতুন করে বিচার বিভাগীয় কমিশন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে ৫ আগস্টের পরপরই তাদের বিচার করার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই তদন্ত কমিটিতে শিক্ষকরা ছিলেন। শিক্ষকরা অন্য শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যেতে চায় না বলে এই কমিশন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি তার কাজ সুষ্ঠুভাবেই করছেন। আশা করা যায় অতি শিগগিরই আমরা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট হাতে পাব এবং সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চবিতে হাসিনার পক্ষে মিছিলকারীদের কিছুই হয়নি
শিক্ষার্থীদের জুলাই আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি অংশ পতিত হাসিনা সরকারের সমর্থন জানিয়ে কর্মসূচি পালন করেন। ৪ আগস্টও ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’-এর ব্যানারে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা একটি মৌন মিছিল বের করেন। এতে প্রায় অর্ধশত শিক্ষক অংশ নেন। মিছিলের সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এবিএম আবু নোমান। একই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও শেখ হাসিনার পক্ষে স্লোগান দিয়ে ক্যাম্পাসজুড়ে মিছিল করেন এবং সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এসব শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এছাড়া শিক্ষার্থীরা কয়েকজন আওয়ামীপন্থি শিক্ষককে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করলেও পরে প্রশাসন তাদের ছেড়ে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন ধরনের হেনস্তার শিকার হওয়া শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ন্যায়বিচার পাবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান আমার দেশকে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেগুলো পুনর্গঠন করে নতুন কমিটি করা হবে। এরপর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, অপরাধের মাত্রা কতটুকু ছিল, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ কতটা বিদ্বেষপূর্ণ ও ক্ষতিকর ছিল—এসব বিষয় পর্যালোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ইবিতে শাস্তি মওকুফ, মাথাচাড়া দিচ্ছে ফ্যাসিবাদীরা
জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে বেশ সরব ছিলেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থি শিক্ষক-কর্মকর্তারা। সে সময় স্থানীয় এমপিদের পরামর্শে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যোগসাজশে আন্দোলনকারীদের দমন করতে উঠে পড়ে লাগেন তাদের অনেকে। স্থানীয় এমপি ও পতিত আওয়ামী লীগের যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ হানিফের পরামর্শে গোটা কুষ্টিয়া অঞ্চলে আন্দোলন দমনে মাঠে নামেন তারা। ক্যাম্পাসে এক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান হিসেবে কাজ করেন এমপি হানিফের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রোভিসি ড. শাহিনুর রহমান, তৎকালীন প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা, শাপলা ফোরাম ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের তৎকালীন ও সাবেক নেতারা। পেছন থেকে ইন্ধন দেয় তৎকালীন ও সাবেক প্রশাসক ও নেতারা। জুলাই বিরোধীদের তালিকায় শুধু মিছিলকারীরা আসলেও আড়ালে থেকে যায় গডফাদাররা।
সূত্রমতে, গত বছরের ৩০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭১তম সিন্ডিকেট সভায় জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের বিরুদ্ধে অবস্থানকারী ১৯ জন শিক্ষক, ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই অপরাধে ৩৩ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার ও সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে গত ১৮ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরুরি সিন্ডিকেট সভায় ওই ১৯ শিক্ষক ও ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর শাস্তি মওকুফ করা হয়। অবশ্য বহিষ্কৃত ৩৩ শিক্ষার্থীর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
সূত্রমতে, শাস্তি মওকুফ হওয়ায় ফ্যাসিবাদী শিক্ষক কর্মকর্তারা নতুন করে তৎপরতা বাড়িয়েছেন। তারা ক্যাম্পাসে ও ক্যাম্পাসের বাইরে বিভিন্ন সময় মিটিং করে নানা ষড়যন্ত্র করছেন। এমনকি সাবেক প্রক্টর ড. মাহবুবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক হয়ে একটি সংগঠন খুলেছেন, যার নাম ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’। তাদের স্লোগান—বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত : মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অপ্রতিরোধ্য। ফ্যাসিবাদের পক্ষে তিনিসহ অন্য আওয়ামীপন্থিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অহরহ পোস্ট দিচ্ছেন। সাবেক ছাত্রলীগ নেতারাও এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। কয়েক দিন আগে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের ঝটিকা পোস্টারিংও হয়েছে।
এছাড়া ফ্যাসিবাদীদের নিষ্পাপ দেখানোরও নানা চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি শাপলা ফোরামের সাবেক নেতা ইংরেজি বিভাগের ড. মামুনুর রহমানকে জাপানি ভাষা শিক্ষাবিষয়ক একটি বিশেষ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ ইতোপূর্বে ওই একই ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। একই বিভাগের সাবেক প্রোভিসি অধ্যাপক শাহিনুর রহমানকেও বিশেষ ছুটি দেওয়া হয়। তিনি বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থান করছেন। ফ্যাসিবাদীদের এসব তৎপরতায় ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
ফ্যাসিবাদীদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গ ওঠে গত রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রিন ফোরামের এক সেমিনারে। সেখানে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মতিনুর রহমান বলেন, বর্তমানে ফ্যাসিস্ট দল নিষিদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষক সংগঠন বা ছাত্র সংগঠন আছে, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনসিদ্ধ কোনো সংগঠন নয়। এখানে কোনো আইন নেই। যেহেতু আইন নেই, সেহেতু এটি নিষিদ্ধের প্রসঙ্গটি অপ্রাসঙ্গিক।
তিনি আরো বলেন, ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দল যেহেতু নিষিদ্ধ, সুতরাং তার অনুষঙ্গ যা-ই থাক না কেন ‘অটোমেটিক্যালি ইমপ্লাইড অল আর প্রহিবিটেড’। এটি নতুন করে আলোচনা করার কোনো প্রয়োজন নেই।
বেরোবির দুই শিক্ষককে কারাদণ্ড
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়নে সম্পৃক্ততা এবং উসকানি দেওয়ার অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দুই শিক্ষককে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত ৯ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করে। রায়ে কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—বেরোবির গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান ও লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ।
দুই শিক্ষকের নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হওয়ার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামরিক বহিষ্কার করা হয়। পরে রায়ে অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ায় তাদের সব প্রকার বেতন, ভাতা সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ট্রাইবুনালে তাদের রায়ের কপির জন্য আবেদন করেছে। রায়ের কপি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পৌঁছালে তাদের স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের (ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার) প্রফেসর ড. মো. ফেরদৌস রহমান।
গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ববির ফ্যাসিবাদীরা
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার গদি টিকিয়ে রাখতে চব্বিশের ৪ আগস্ট গোপন সভায় অংশ নেন একদল শিক্ষক। দুই বছর পেরোলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরেই আছেন তারা। অনেকেই এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। জুলাই আন্দোলন দমনে তৎপরতা, এক দফা দাবি প্রত্যাখ্যান ও ছাত্র-শিক্ষকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এই শিক্ষকরা এখনো ডিন, বিভাগীয় প্রধানসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরোলেও এখনো তাদের বিচার করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থীরা।
সূত্রমতে, শিক্ষার্থীরা দফায় দফায় এসব আওয়ামী দোসর শিক্ষকদের অপসারণ ও বিচারের দাবি জানালেও কর্ণপাত করেনি বিগত দুই প্রশাসন। আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন তৎকালীন উপাচার্য। বাকিরা নির্বিঘ্নে চাকরি করছেন।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রক্টর মেহেদী হাসান সোহাগ আমার দেশকে বলেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ করছি। পরবর্তী সিন্ডিকেটে বিষয়টি তুলে একটি জুডিশিয়ারি কমিটি করে তদন্ত সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশীদ বলেন, অবশ্যই আমরা দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। আগামী সিন্ডিকেট সভায় বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে। সেখানে সদস্যদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের স্বার্থে একটি জুডিশিয়ারি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
[প্রতিবেদনটি তৈরি করতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন জাবি, রাবি, জবি, চবি, ইবি, বেরোবি ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি।]
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


