* পৌনে পাঁচ বছরে ৩১৬১ মামলা
* অভিযুক্তদের ৮০% মাদকাসক্ত
* তল্লাশি কমায় বাড়ছে অপরাধ
নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য ট্রেনের কোনো জুড়ি নেই। সেই আরামদায়ক ভ্রমণযানে এখন ঘটছে বহুমুখী অপরাধ। আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনগুলোয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
কোনো ভিকটিম ছিনতাইকারীদের মূল্যবান জিনিসপত্র না দিতে চাইলেই তাদের ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। এতে কেউ পঙ্গু হচ্ছেন, অনেকে আবার প্রাণ হারাচ্ছেন। এসব ছিনতাইকারী যাত্রীবেশে ট্রেনে উঠে এমন অপকর্ম করছে। অপরাধ করার পর তারা নিকটতম স্টেশনে নেমে যায়। পেশাদার অপরাধীদের কেউ কেউ অপরাধ সংঘটন করে চলন্ত ট্রেন থেকে দ্রুত নেমে পড়ে। এসব অপরাধীর প্রায় ৮০ শতাংশই মাদকাসক্ত। ট্রেনে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় ঢাকাসহ সারা দেশে গত চার বছর আট মাসে ৩,১৬১টি মামলা হয়েছে।
জানা গেছে, কমলাপুর বা ঢাকার বাইরে যেসব এলাকা থেকে ট্রেনগুলো গন্তব্যস্থলের উদ্দেশে ছেড়ে যায়, সেসব ট্রেনে রেলওয়ে পুলিশের ১০ জন করে সদস্য থাকেন। তারা ট্রেনে ভ্রমণকালীন চোরাই পণ্য জব্দ, মাদক তল্লাশিসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
কিন্তু চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর ট্রেনে অপরাধের মাত্রা বেড়েছে। আগের চেয়ে তল্লাশি কমেছে, এতে বাড়ছে অপরাধ। তবে পুলিশ বলছে, ট্রেনে অপরাধ ঠেকাতে তারা কাজ করছে। প্রত্যেক স্টেশনে তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে। ট্রেনকেন্দ্রিক ছিনতাই প্রতিরোধে রেলওয়ে পুলিশ তৎপর রয়েছে। নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। স্টেশনের পাশাপাশি ট্রেনেও পোশাকধারী পুলিশ পাহারা দেয়। সাদা পোশাকেও রেলওয়ে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পুলিশের ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার নিকুলিন চাকমা আমার দেশকে বলেন, ট্রেনে তল্লাশি ও প্ল্যাটফর্মকেন্দ্রিক নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ট্রেনে পুলিশের গার্ড ডিউটি বাড়ানো হয়েছে। অপরাধীদের ক্ষেত্রে রেলওয়ে পুলিশ জিরো টলারেন্স দেখাবে।
অপরাধবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, নজরদারি কম থাকার কারণে অপরাধ বাড়ছে। রেলব্যবস্থাকে প্রযুক্তিগতভাবে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
গত ৮ মে কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি ট্রেনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে ওমর ফারুক শাওন নামে এক যাত্রী আহত হন। তিনি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। গাজীপুর যাওয়ার জন্য তিনি বিমানবন্দর স্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠেন। ট্রেনটি স্টেশন ছাড়ার পরপর চার ছিনতাইকারী তাকে পেটে ছুরিকাঘাত করে তিন হাজার টাকা নিয়ে যায়। এর আগে ৪ মে কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি ট্রেন মালিবাগ এলাকায় পৌঁছালে ছিনতাইকারীরা ছুরিকাঘাতে ইব্রাহিম নামে এক যুবককে জখম করে।
গত ৮ জুন কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি ট্রেন বনানী এলাকায় পৌঁছালে ছিনতাইকারীদের হামলায় মাহিদুল ইসলাম নামে এক স্কুলশিক্ষার্থী আহত হয়। ছিনতাইকারীরা তাকে মারধর ও ধারালো ব্লেড দিয়ে আঘাত করে তার কাছ থেকে টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে তাকে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।
এরপর ২০ জুন রাজধানীর তেজগাঁও রেলস্টেশন এলাকায় চলন্ত ট্রেনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে তোফায়েল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থী আহত হন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিজ বাড়িতে ফেরার জন্য কমলাপুর থেকে চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে ওঠেন তিনি। ট্রেনটি তেজগাঁও এলাকা পার হওয়ার সময় বগিতে থাকা তিন-চারজন ছিনতাইকারী দুই বগির মাঝের দরজার সামনে তার পকেটে হাত দিয়ে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তিনি বাধা দিলে তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ছুরিকাঘাত করে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে নেমে যায়।
জানা গেছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে কমলাপুর থেকে জামালপুরগামী ব্রহ্মপুত্র ট্রেনে সাজিদ নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাত করে টাকা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় মোবাইল ও টাকা কেড়ে নিয়ে হাফিজুর রহমান (৩৫) নামে এক যুবককে ট্রেনের ছাদ থেকে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। ছিনতাইকারীরা তার কাছে থাকা টাকা ও আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির মধ্যে তাকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া হয়।
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন রুটের চলন্ত ট্রেনে মাঝেমধ্যেই ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। চলন্ত ট্রেনে ছুরিকাঘাত করে ছিনতাইয়ের পাশাপাশি অজ্ঞান পার্টি, গামছা পার্টি, টানা পার্টি, ঝুলন্ত ছিনতাই পার্টি ও পকেটমারসহ সংঘবদ্ধ কিছু চক্রের দৌরাত্ম্য সাম্প্রতিক সময়ে এতটা বেড়েছে যে, তাদের কাছে অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছেন খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও। একাধিকবার অভিযান চালালেও এসব অপরাধীকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। অপরাধীরা যাত্রীবেশে এমন অপরাধ করছে। এদের কেউ কেউ চেতনানাশক স্প্রে ব্যবহার করে অজ্ঞান করে মালামাল লুটে নিচ্ছে।
রেলওয়ে পুলিশের মামলা পরিসংখ্যান
ট্রেনে বিভিন্ন অপরাধের কারণে ২০২২ সালে ৭৮৬, ২০২৩ সালে ৬৩৯, ২০২৪ সালে ৬৪৫ এবং ২০২৫ সালে ৮৫১টি এবং চলতি বছরের গত আট মাসে ২৫০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডাকাতির ঘটনাও। এসব ঘটনায় চার বছর আট মাসে ৩,১৬১টি মামলা হয়েছে।
মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত চার বছরে ৭০ শতাংশ হারে ট্রেনে চুরির ঘটনা বেড়েছে। বর্তমানে রেলওয়ে পুলিশের সংখ্যা ২,৪৯৩ জন। ছয়টি রেলওয়ে জেলায় ২৪ থানা ও ৩৩টি ফাঁড়ি রয়েছে। এত কমসংখ্যক জনবলে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে রেলওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তারা পুলিশ সদর দপ্তরে অতিরিক্ত জনবল চেয়ে আবেদন করেছে।
রেলওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, যাত্রীদের নিরাপত্তা জন্য রেলওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্টেশনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। সাদা পোশাকে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া চলন্ত ট্রেনে যাতে কোনো ধরনের অপরাধ ঘটতে না পারে, এজন্য তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে। সন্দেহভাজনদের দেহ তল্লাশি ও প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনার মামলাগুলোয় আসামি চিহ্নিত করতে বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে।
এআই ব্যবহারের উদ্যোগ
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় পুলিশের টনক নড়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে রেলওয়ে পুলিশ এখন অপরাধীদের ধরতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে এআই (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তি ব্যবহারের চিন্তা করছে রেলওয়ে পুলিশ।
সূত্র জানায়, প্রত্যেক স্টেশনে এআই ক্যামেরা লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে পুলিশ। যেসব ট্রেনে ঘটনা ঘটবে, সেসব ট্রেন যে স্টেশন থেকে ছেড়ে যাবে, ওই স্টেশনের ছবি পর্যালোচনা করে অপরাধী চিহ্নিত করতে এআই ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
ক্রিমিনাল ডেটা ম্যানেজমেন্ট আপডেট
বিভিন্ন সময় ট্রেনে অপরাধ করে গ্রেপ্তার হলেও জামিন পেয়ে তারা আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এসব অপরাধীর ডেটা অর্থাৎ ক্রিমিনাল ডেটা ম্যানেজমেন্ট (সিডিএম) নতুন করে আপডেট করার চিন্তা করছে রেলওয়ে পুলিশ। ওই ডেটা ম্যানুয়ালের পাশাপাশি কম্পিউটারে সংরক্ষণ থাকবে। ওই ডেটায় ট্রেনে বহুমুখী অপরাধে জড়িতদের বর্তমান অবস্থান চিহ্নিতকরণ এবং তাদের মামলার সবশেষ অবস্থা উল্লেখ থাকবে। এতে আসামির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে রেলওয়ে পুলিশ।