হোম > আমার দেশ স্পেশাল

জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতিমন্ত্রীর মঙ্গল শোভাযাত্রাপ্রীতি

আবু সুফিয়ান

একটি রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের অধীন রাষ্ট্র সংস্কার ও জনআকাঙ্ক্ষা প্রতিফলনের দাবি যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে পুরোনো সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ছায়া প্রকট হয়ে উঠছে। সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

গত ৩১ মার্চ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিবর্তে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নাম দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না অন্তর্বর্তী সরকারের। এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দেশে লতা মঙ্গেশকর, সোনু নিগম, নেহা কক্করের মতো শিল্পী তৈরি করতে চাই। বিশেষ করে মঙ্গল শোভাযাত্রার পক্ষে তার ওকালতি এবং দেশের শিল্পীদের উপেক্ষা করে ভারতীয় গায়িকাদের প্রতি অতি আগ্রহকে বিশ্লেষকরা দেখছেন ‘আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক এজেন্ডার ধারাবাহিকতা’ হিসেবে।

বর্তমান সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী পেশায় একজন আইনজীবী হলেও ৯০ শতাংশ বাঙালি মুসলমানের দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। এর আগে তার সংস্কৃতি চেতনা সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া না গেলেও সম্প্রতি কিছু বক্তব্য এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে, তার চিন্তাধারা আওয়ামী এবং ভারতীয় চেতনা দ্বারা বেশ প্রভাবিত।

বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাকি ভারতমুখী নীতি

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সংস্কৃতিমন্ত্রীর এ ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’প্রেমী অবস্থান কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। গত ৯ মার্চ সচিবালয়ে ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সঙ্গে মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ ও ‘গভীর সম্পর্কের’ দোহাই দিয়ে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরো সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়। নিতাই রায় চৌধুরী ভারতের আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও মেঘালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক মিলের কথা উল্লেখ করে যৌথ উদ্যোগের ব্যাপক প্রসারের প্রতিশ্রুতি দেন। পহেলা বৈশাখ উদযাপন, লালন শাহের সংগীতধারা এবং থিয়েটার ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় ভারতের সঙ্গে নিবিড় সহযোগিতার যে নীলনকশা সেখানে আঁকা হয়েছে, বর্তমানের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র বিতর্ক এবং ভারতীয় গায়িকা আনার ঘোষণা তারই বাস্তব রূপায়ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আশ্চর্যের বিষয়, বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে সাংস্কৃতিক মিল খুঁজে বেড়ানোর জন্য বেশি আগ্রহ দেখালেও ভারতের তরফ থেকে সংখ্যাগুরু মুসলমানের সংস্কৃতিকে কখনো বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে স্বীকার করা হয় না। বরং আসামে বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান জনগোষ্ঠীর ওপর অকথ্য নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। আসন্ন বিশেষ নির্বাচন ঘিরে পশ্চিমবঙ্গেও মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে।

ধর্মীয় অঙ্গনে ক্ষোভ : হেফাজত ও জমিয়তের আলটিমেটাম

সরকারের এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী গত বৃহস্পতিবার আমার দেশকে বলেন, “সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্যই ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’-কে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হিসেবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে মূর্তি সাজিয়ে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে করতে হবে কেন? এটা ভারতীয় বয়ান। মঙ্গল শোভাযাত্রায় মূর্তি নিয়ে অংশ নেওয়া স্পষ্ট শিরক। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে এটা কেন চাপাবে?”

তিনি সরকারকে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘সরকার যদি এমন সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আমরা পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করব।’

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা সাজেদুর রহমান গত বুধবার এক বিবৃতিতে মন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘ধর্মীয় উসকানিমূলক’ আখ্যা দেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে এ হেফাজতের আমিরই জামায়াতকে ভোট দিলে ‘কাফের’ হয়ে যাওয়ার ফতোয়া দিয়েছিলেন, অথচ তারাই আজ সরকারের এ ‘লীগপন্থি’ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ।

হেফাজতের সুরেই কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির সভাপতি শায়খুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক এবং মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী যৌথ বিবৃতিতে বলেন, সংস্কৃতিমন্ত্রীর সংসদীয় বক্তব্য গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তারা স্পষ্ট করেছেন, একটি বহুধর্মীয় সমাজে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান অন্য সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়।

‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র ইতিহাস

পহেলা বৈশাখের এ আয়োজনের ইতিহাস নিয়ে দৈনিক আমার দেশ-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৮৯ সালে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে।

পহেলা বৈশাখের নামে চারুকলাকেন্দ্রিক যে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়, তা মূলত একটি নির্দিষ্ট ঘরানার সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের ফসল। ১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে এর নাম পরিবর্তন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ রাখা হয়, যা সরাসরি একটি বিশেষ ধর্মের আচার ও বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইউনেস্কোর স্বীকৃতির দোহাই দিয়ে পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা একটি গভীর ষড়যন্ত্র। বর্তমান সংস্কৃতিমন্ত্রীর মঙ্গল শোভাযাত্রায় ফেরার ঘোষণা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের দাবি উঠলেও সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনো ভারতপন্থি চেতনার লালন চলছে। নানারকম বিজাতীয় প্রতীকের মাধ্যমে জাতীয় ঐতিহ্যকে কলুষিত করার এ প্রক্রিয়া মূলত বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

তোপের মুখে সাবেক উপদেষ্টারা : মুখ খুলতে আতঙ্ক

বর্তমান সরকারের আকস্মিক ‘ইউটার্ন’ এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিব্রতকর ও আতঙ্কজনক অবস্থায় পড়েছেন পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা। এ বিষয়ে মন্তব্য চাইলে সাবেক এক উপদেষ্টা সরাসরি কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

তবে আরেক সাবেক উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদকের কাছে তার তীব্র ক্ষোভ ও বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘ওরা (বর্তমান প্রশাসন) এখন আমাদের নানাভাবে হেয় করার চেষ্টা করছে। আমাদের গৃহীত জনবান্ধব সিদ্ধান্তগুলো বিতর্কিত করে আমাদের নিয়মিত আক্রমণের মুখে রাখা হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিবেশ এমন করা হয়েছে যে, এ বিষয়ে কথা বলে নতুন কোনো বিতর্কে জড়াতে এখন আর চাই না।’ সাবেক এ উপদেষ্টার মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী প্রশাসনের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ সংস্কারগুলো মুছে ফেলে পুনরায় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘরানার সাংস্কৃতিক বলয় তৈরিতে মরিয়া।

এ ব্যাপারে গত বৃহস্পতিবার সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীকে ফোন করা হলেও সাড়া মেলেনি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, “এবার কি পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে হবে নাকি ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবে?” এ প্রশ্নের জবাবও দেননি তিনি।

তবে গতকাল শনিবার মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় আধুনিক মানের ডাকবাংলোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, বাংলা নববর্ষের শোভাযাত্রা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে করা হবে। এ সময় তিনি বলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রা বা আনন্দ শোভাযাত্রার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আগামীতে বৈশাখী শোভাযাত্রা নামেই এ শোভাযাত্রা করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা বাংলাদেশি তথা বাঙালি সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্য। এটি কোনো দলের নয়, সবার। ফলে এটা মঙ্গল শোভাযাত্রা বা আনন্দ শোভাযাত্রা কোনোটাই হবে না, এবার থেকে হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলাকে টেলিফোন করা হলেও সাড়া মেলেনি। ‘শোভাযাত্রা’র বিষয়ে বার্তা পাঠালেও তার কোনো সাড়া মেলেনি।

হেফাজত নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে সংস্কৃতিকে ‘সেক্যুলারিজমের’ আড়ালে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, বর্তমান সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রীও একই পথে হাঁটছেন। সাংস্কৃতিক অবকাঠামো সংস্কার না করে বিতর্কিত প্রতীকী নাম পরিবর্তন ও ভারতীয় শিল্পীদের তোষণের মাধ্যমে জনমনে এ বার্তাই যাচ্ছে যে, চেহারা বদলালেও সরকারের ‘সাংস্কৃতিক মগজ’ এখনো সেই পুরোনো লীগ স্টাইলেই পরিচালিত হচ্ছে।

সিন্ডিকেটের হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

কোনো কাজে আসছে না ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

বিদেশি জাহাজের ওপর নির্ভরতা কমাতে মেগা প্রকল্প বিএসসির

হাদির দুই খুনিকে ফেরানোর অনুরোধে সাড়া দেয়নি ভারত

বিটিভির ডিজিটাল সম্প্রচার শিখতে তিন দেশে যাচ্ছেন ২১ কর্মকর্তা

হামের টিকা দিতে ব্যর্থ ড. ইউনূসের সরকার

ইভিএম প্রকল্পে গচ্চা ৩৮২৫ কোটি টাকা

‘মাই ম্যান’ পদায়ন নিয়ে তিন গ্রুপের শীতল যুদ্ধ

কয়েকশ প্রার্থীর চাপে হিমশিম বিএনপি

তীব্র জ্বালানি সংকটে দেশ, মন্ত্রীরা বলছেন সমস্যা নেই