আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বঙ্গোপসাগরের তলদেশ দিয়ে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহ প্রকল্প এসপিএমের (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) ওপর থেকে শনির দশা যেন কাটছেই না। নির্মাণপর্ব শেষ হওয়ার তিন বছর পর অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলেও সরকারি আদেশ পাঁচ দিনেও পৌঁছায়নি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে (বিপিসি)। এ কারণে অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া এখনো শুরুই করতে পারেনি জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানটি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ কারিগরিসম্পন্ন এই প্রকল্প চলতি মাসের মধ্যে শুরু না করতে পারলে আগামী বছরের মার্চেও পুরোদমে অপারেশন শুরু করতে পারবে কি না সন্দেহ।
বিপিসি সূত্র জানায়, দ্রুত ও সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে এসপিএম উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। ২০২৩ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও শুরু থেকেই তৈরি হয় বিভিন্ন জটিলতা।
নির্মাণপর্ব শেষ হওয়ার এক বছরের মাথায় ২০২৪ সালের মার্চে কমিশনিংও হয়। কিন্তু পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানের অভাবে গত তিন বছরেও বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়নি এসপিএম প্রকল্প। বিশাল ব্যয়ের এই প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে বোঝা হয়ে দেখা দেয় জ্বালানি সেক্টরে।
সবশেষ গত ২৩ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অপারেটর নিয়োগের প্রস্তাবটির অনুমোদন হয়। ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠান ‘পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টাল’কে প্রাথমিকভাবে অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়। কিন্তু বৈঠকের পাঁচ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো সরকারের লিখিত আদেশ পৌঁছেনি বিপিসিতে। তাই অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো শুরু করা সম্ভব হয়নি।
তবে চলতি মাসের মধ্যেই প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করেছে সরকার। বিপিসির জিএম প্ল্যানিং নঈম উল্লাহ জানান, সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়টি আমরাও শুনেছি; কিন্তু লিখিত কোনো অনুমোদনপত্র পাইনি। লিখিত চিঠি পেলে দাপ্তরিক কাজ শেষ করতে ২৮ থেকে ৩০ দিন লাগবে। এরপর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান প্রজেক্ট বুঝে নেবে। যেহেতু এটা হাইলি টেকনিক্যাল বিষয়, তাই প্রজেক্ট বুঝে নিতেও এক মাস সময় লাগবে। এরপর অপারেশন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সেটা সম্পন্ন করতেও কমপক্ষে তিন মাস লাগবে। সব মিলিয়ে চলতি সেপ্টেম্বরের মধ্যেও যদি আমরা প্রক্রিয়া শুরু করতে পারি, তারপরও মার্চের আগে পাইপলাইনে তেল আনা সম্ভব হবে না।
বিপিসি সূত্র জানায়, আগামী পাঁচ বছরের জন্য ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়োগ দিতে এক হাজার ৯৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। প্রকল্পটি চালু হলে তেল খালাসে বছরে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বাইরে দুই লাখ টন জ্বালানি তেল মজুতের সক্ষমতাও তৈরি হবে। এছাড়া তেল খালাসের সময়ও সাশ্রয় হবে।
বর্তমানে আমদানি করা জ্বালানি তেল বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল থেকে ভাড়া করা লাইটার জাহাজে পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ট্যাংকে আনা হয়। এতে এক জাহাজ তেল আনলোড করতে সময় লাগে ১১ থেকে ১২ দিন। প্রকল্পটি চালু হলে সমপরিমাণ তেল পরিবহনে সময় লাগবে মাত্র দুদিন।
এ বিষয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এসপিএম প্রকল্পের সাবেক পিডি প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত জানান, প্রকল্পটি চালু হলে নানামুখী লাভ হবে। প্রথমেই তেল পরিবহনে সময় বাঁচবে। এতে মাদার ভেসেলের ডেমারেজ চার্জ বাঁচবে। লাইটারে খালাস করার সময় যে তেল সিস্টেম লস হতো, টাকার অঙ্কে সেটাও কম নয়। পাইপলাইনে তেল এলে সেটি হবে না। দেশের জ্বালানি তেল মজুতের সক্ষমতা দুই লাখ টন বৃদ্ধি পাবে। তাই এ প্রকল্প যত দ্রুত অপারেশনে আনা যায়, ততই মঙ্গল বলে জানান তিনি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম জানান, এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অপারেশনে আনতে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের একটি সিদ্ধান্ত চিঠি আকারে আসতে পাঁচ দিন সময় লাগাটা দুর্ভাগ্যজনক। এ প্রকল্পটির ক্ষেত্রে একটি দিনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বৈশ্বিক বাস্তবতায় জ্বালানি তেলের বাজারে এখনো স্থিরতা আসেনি। সে দিক থেকে আমরা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছি। এ প্রকল্পটি অপারেশনে এলে জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বাড়বে।
তিনি আরো বলেন, প্রকল্পটি মাঠ পর্যায়ে চলমান অবস্থায়ই অপারেটর নিয়োগসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলো শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। এটি হলে প্রকল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপারেশনও শুরু হতো। কিন্তু আগের সরকার সে উদ্যোগ নেয়নি। শুধু মেগা প্রকল্পই বাস্তবায়ন করে গেছে, যার খেসারত গত তিন বছর ধরে আমাদের দিতে হচ্ছে। কিন্তু আর একটি দিনও অপচয় করা উচিত নয়। যত দ্রুত সম্ভব প্রকল্পটি অপারেশনে আনার প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত বলে জানান তিনি।