ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ঘোষিত ইশতেহার বাস্তবায়নের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ইশতেহারে দেওয়া ফ্যামিলি কার্ড, বৃক্ষরোপণ এবং নদী-খাল-জলাধার খনন বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শুধু কথার ফুলঝুরি নয়; বরং প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ব্যাপারে সরকারে আন্তরিকতা ফুটে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির বড় প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু। দলের ইশতেহার অনুযায়ী, পরিবারের নারী প্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ইস্যু করবে বিএনপি সরকার। প্রায় চার কোটি প্রান্তিক পরিবারের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। এ কার্ড মূলত পরিবারের নারী প্রধানদের নামে ইস্যু করা হবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেওয়ার দ্বিতীয় দিনে সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজে হাত দিয়েছে। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করার লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্তকরণের বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এ সভায় অর্থমন্ত্রীকে সভাপতি করে ১৫ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরো সদস্য যুক্ত করা হতে পারে।
সভা সূত্রে জানা গেছে, কমিটি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নের একটি উপযুক্ত ডিজাইন প্রণয়ন এবং সুবিধাভোগী নির্বাচন পদ্ধতি প্রণয়ন করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটিতে একটি করে উপজেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রবর্তনের ব্যবস্থা নিতে এ কমিটি কাজ করবে। নারীদের জন্য সরকারের বিদ্যমান কোনো কর্মসূচিকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, তা পর্যালোচনা করবে কমিটি।
জানা গেছে, ‘ফ্যামিলি কার্ড প্রদান-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’ সুবিধাভোগীদের ডেটাবেজ প্রণয়নের লক্ষ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডেটাবেজ আন্তঃসংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনা প্রণয়নের সুপারিশ করবে। আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ করার লক্ষ্যে এ কমিটি আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকারকে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন দেবে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে।
বিএনপির এবারের নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে প্রতি মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা অথবা খাদ্য সুবিধা দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে এ কার্ড হবে দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধামুক্তি ও নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার নিশ্চয়তা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিলেন আর এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে চায়।
বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন ও সুবিধাভোগীদের মধ্যে বিতরণে অনিয়ম রোধে রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আমলারাও থাকবেন। কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট কমিটির পক্ষ থেকে বিষয় তদন্ত করা হবে বলেও জানিয়েছে সূত্রটি।
এছাড়া একই দিন দুপুর ২টায় ‘পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ এবং জাতীয় পর্যায়ে ‘নদী-খাল-জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি’-বিষয়ক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়। সভা শেষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু সাংবাদিকদের জানান, আমাদের মেনিফেস্টোতে একটি জিনিস হয়তো আপনারা দেখছেন যে, বৃক্ষরোপণ, প্রতি বছর পাঁচ কোটি বৃক্ষরোপণ। আমাদের মোটামুটি কথা হয়েছে, বৃক্ষরোপণ করা হবে। চারা কোথায় পাওয়া যাবে, মিনিস্ট্রি অব এনভায়রনমেন্ট ফরেস্টে আছে, মিনিস্ট্রি অব এগ্রিকালচারে আছে। এছাড়া প্রাইভেট সেক্টরে যদি পাওয়া যায়, সব মিলিয়ে এ বছর আমরা কত বৃক্ষরোপণ করতে পারব, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, মে মাসের মধ্যে শুরু হবে, এটা জুলাইয়ের পর তো আর লাগানো যায় না।
বৃক্ষরোপণের স্থান নিয়ে মন্ত্রী বলেন, সাত থেকে আটটি ক্রাইটেরিয়াতেই আমরা গাছ লাগানোর চেষ্টা করব। একটি হলো চরে লাগানো, নদীর দুই ধারের বাঁধে, তার পরে রাস্তার ধারে, হিল ট্র্যাক্টসের (পার্বত্যাঞ্চল) একটি এরিয়া আছে, তার পরে ম্যানগ্রোভ আছে, সুন্দরবনে বা যেখানে লবণাক্ত পানি আছে। মোট কথা আমাদের মেনিফেস্টোতে আছে পাঁচ কোটি বৃক্ষরোপণ করার কথা প্রতি বছর। এ বছর হয়তো হবে না কিন্তু আগামী বছর এটাকে মেকআপ করে যেন আমরা পাঁচ কোটির বেশি করতে পারি-এটাই আমাদের প্ল্যান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইশতেহার বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়গুলোকে স্ব স্ব ক্ষেত্রে নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। তারই অংশ হিসেবে গতকাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে নবনিযুক্ত মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, এ দেশের মানুষ অনেক প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের নির্বাচিত করেছে। তাই দেশবাসীর প্রতি আমাদের নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে চাই।
ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকারের এ কর্মচাঞ্চল্য মনোভাবকে সাধুবাদ জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম সেলিম আমার দেশকে বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের এ উদ্যোগ থেকে এটি স্পষ্ট যে, তারা জনগণের কল্যাণে কাজ করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই সঙ্গে এ ইশতেহার বাস্তবায়ন যে কেবল কথার ফুলঝুরি নয়, সরকারের আন্তরিকতার মাধ্যমে সেটিই ফুটে উঠেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান আমার দেশকে বলেন, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণের দুদিনের মাথায় এ কর্মকল্পনা বাস্তবায়নের বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, এগুলো কেবল প্রতিশ্রুতি বা ঘোষণার মধ্য দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার পরিকল্পনা ছিল না। বরং এগুলো সত্যিকারার্থে বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের লক্ষ্যে প্রণীত তার পরিকল্পনার অংশ।
নতুন সরকারের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে এই শিক্ষাবিদ বলেন, আমরা ভবিষ্যতেও প্রত্যাশা করব যে, তিনি জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সার্বিক মানোন্নয়নের জন্য, পরিবর্তনের জন্য তিনি যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন, সেটি তিনি রক্ষা করবেন।