চট্টগ্রামে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ঝটিকা মিছিলের পাশাপাশি যেকোনো ইস্যুতে হঠাৎ সক্রিয় হয়ে গুপ্ত থেকে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। প্রশাসনের চোখে ধুলা দিতে এক এলাকার কর্মীদের আনা হচ্ছে অন্য এলাকায়। পুরো নগরীকে দুভাগে বিভক্ত করে অস্থিরতা তৈরির পরিকল্পনা এঁটেছে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
আর এসব কাজে অর্থের জোগান দিচ্ছেন স্থানীয় ১৫ জন ব্যবসায়ী। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করছেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক এক পরিচালক। তিনিই আওয়ামীপন্থি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ফান্ড জোগাড় করছেন। বিদেশে পলাতক দুজন পতিত মন্ত্রী ও একজন এমপির নির্দেশে নির্ধারিত ব্যক্তির কাছে টাকার জোগান পৌঁছে দিচ্ছেন। মাঠপর্যায়ে টাকার সরবরাহ করছেন পাঁচ নারীকর্মী। এমনকি কোনো নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হলে জেলখানার পিসি কার্ডেও টাকা জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন তারা।
এদিকে কারাবন্দি নেতাদের পিসি কার্ডে প্রতি মাসে তালিকা ধরে নির্ধারিত এক অঙ্কের টাকা জমা হচ্ছে। গোয়েন্দা পুলিশ তাদের ওপর নজরদারি শুরু করেছে। তদন্তের স্বার্থে ওই ১৫ ব্যবসায়ী ও তাদের সমন্বয়কের নাম প্রকাশ না করলেও বিকল্প সূত্রে কয়েকজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে আমার দেশ।
সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মতো ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজনের সুযোগ নিচ্ছে নিষিদ্ধ সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল ও বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য পান পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা।
সরকারের দুটি গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে নিষিদ্ধ সংগঠনটির সক্ষমতা ও আগামী দিনের নাশকতার কৌশল জানতে পেরেছে আমার দেশ। সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মহানগর এলাকাকে দুটি গ্রুপে ভাগ করে নাশকতার পরিকল্পনা এঁটেছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা। মাঠপর্যায়ে এ দুই গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাদমান ও জনি নামে দুই প্রশিক্ষিত ক্যাডার। বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগের পতিত মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, হাছান মাহমুদ ও সাবেক এমপি মহিউদ্দিন বাচ্চু এসব কর্মকাণ্ডের তদারক করছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ঝটিকা মিছিলের ক্ষেত্রে দুদিন আগেই জায়গা নির্ধারণ করে একটি পক্ষ। ওই এলাকার জনসমাগম,
টহল পুলিশের আনাগোনা, ট্রাফিক পুলিশের অবস্থান—সবকিছু পর্যালোচনা করে মিছিলের সময় নির্ধারণ করে গ্রুপটি। এ গ্রুপের সদস্য সংখ্যা তিন থেকে পাঁচজন। সকালে মিছিলের সময় নির্ধারণ হয় আগের দিন রাতে। আর বিকালে সময় নির্ধারণ হলে ওইদিন সকালে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হোয়াটসঅ্যাপে একটি গ্রুপ ওপেন করা হয়। ওই গ্রুপে ১৫-২০ জনকে যুক্ত করে মিছিলের সব তথ্য আদান-প্রদান করা হয়।
কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিঅ্যাকটিভ করে দেওয়া হয় গ্রুপটি। নির্ধারিত সময়ের আগেই কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে এলাকায় জড়ো হতে শুরু করেন নেতাকর্মীরা। অনেকের গায়ে কৌশল হিসেবে দুটি টিশার্ট থাকে, কেউ কেউ মাস্ক পরে আসেন। এর মধ্যে একজন ব্যাগে করে ব্যানার নিয়ে আসেন। নির্ধারিত সময়ে ব্যানার বের করেই মিছিল শুরু করা হয়। এ মিছিলকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। একপক্ষ আগে থেকে পুরো এলাকার চারপাশে বিভিন্ন চায়ের দোকানে অবস্থান নিয়ে রেকি করার কাজ করে। ওই এলাকায় পুলিশের মুভমেন্ট কেমন আছে ও সাধারণ মানুষের গতিবিধি নজরদারি করে।
মিছিলে অংশ নেওয়া ক্যাডাররা জনতার প্রতিরোধের মুখে পড়লে পাল্টা মব তৈরির প্রস্তুতি থাকে গ্রুপটির। আরেকটি অংশের দায়িত্ব থাকে মিছিলের ভিডিও ধারণ করে বিদেশে পলাতক নেতাদের কাছে পাঠানো। এ গ্রুপের সঙ্গে দুয়েকটি মোটরসাইকেলও থাকে। তবে মিছিলের আগে সে মোটরসাইকেলগুলোর নম্বর প্লেট খুলে ফেলা হয়। মূল মিছিলে অংশ নেওয়া ক্যাডাররা কেউ স্থানীয় নন, আশপাশের উপজেলা, এমনকি দুর্গম পাহাড় থেকে নেতাকর্মীদের এনে জড়ো করা হয় নির্ধারিত এলাকায়। হঠাৎ করে ঝটিকা মিছিল শেষে গায়ের পোশাক বদলে এলাকা ছাড়েন তারা।
গত সোমবার সকালে নগরীর জিইসি ও বুধবার দুপুরে অক্সিজেন এলাকায় সবচেয়ে বড় মিছিল বের করেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সোমবারের মিছিলের পর থেকে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত দিনভর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৬৮ জন গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে ছয়জন এসেছেন খাগড়াছড়ির গুইমারা এলাকা থেকে। তারা সেখানকার যুবলীগের সক্রিয় কর্মী ও সমর্থক।
গত রোববার বিকালে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে তারা চট্টগ্রামে আসেন। মুরাদপুর এলাকার একটি সস্তা হোটেলে রাতযাপন শেষে সকালে জিইসি মোড়ের এমইএস কলেজের সামনে অবস্থান নিতে শুরু করেন তারা। নির্ধারিত সময়ে মিছিল শেষে নিজেদের পরিহিত ডাবল টিশার্টের একটি করে খুলে ফেলে এলাকা ছাড়েন তারা। দুপুরের পর খাগড়াছড়ি ফিরে যাওয়ার সময় পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে।
সিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) আমিরুল ইসলাম জানান, শুধু সোমবারের মিছিলেই নয়। এর আগেও একাধিকবার নগরীর মিছিলে অংশ নিতে আসা জেলার বিভিন্ন এলাকার নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একবার লেগুনা গাড়িতে আসা ১২ জন ও আরেকবার প্রাইভেট কারে সীতাকুণ্ড থেকে আসা তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু সোমবার জিইসি মোড়ে সবচেয়ে বড় মিছিলের পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
একদিনে ৬৮ জনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপুর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে উল্লেখ করে সিএমপির উপপুলিশ কমিশনার জানান, তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কারা নেপথ্যে থেকে এসব মিছিল অর্গানাইজড করছে, কারা অর্থের জোগান দিচ্ছে—সবকিছুই চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ফরম্যাটে গুপ্ত থেকে নগরীকে অস্থির করার প্রস্তুতি নিয়েছে। কিন্তু পুলিশের প্রস্তুতি তাদের চেয়ে বেশি।
গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ-যুবলীগের শোডাউন ও সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বেশ কয়েকটি ঝটিকা মিছিল পর্যবেক্ষণ করেছে তারা। এরই মধ্যে নিষিদ্ধ সংগঠনটির সক্ষমতা সম্পর্কেও একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, নিষিদ্ধ সংগঠনটির অর্থের সাপ্লাই চেইন এখনো অক্ষত রয়েছে। আর এ কারণেই দিনদিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে তারা।
ঝটিকা মিছিলের পাশাপাশি যেকোনো ইস্যুতে নিজেরা ভাগ হয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা করছেন তারা। বিশেষ করে সম্প্রতি নগরীর বাকলিয়ায় একটি শিশু ধর্ষণকে কেন্দ্র করে অভিযুক্ত ধর্ষককে গ্রেপ্তার করতে গেলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। পরে তদন্তে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের লোকজন সাধারণ মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে পুলিশের মনোবল ভাঙতে রাতভর চোরাগোপ্তা হামলা চালায়।
এছাড়া সম্প্রতি সিটি কলেজে জুলাই বিপ্লবের গ্রাফিতি মোছা নিয়ে সংঘর্ষে জড়ান ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সংঘর্ষে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন। তদন্তে জানা যায়, ছাত্রলীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সিটি কলেজে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের সংঘর্ষের কলকাঠিও নাড়ে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। এভাবে বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেরা গুপ্ত থেকে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
সূত্রটি জানায়, নিষিদ্ধ সংগঠনটির অর্থের সাপ্লাই চেইন এখনো শক্ত অবস্থানে আর সেটা কারাগারে বন্দি নেতাকর্মীদের পিসি কার্ড পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়। যেকোনো চিহ্নিত নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হলে ওইদিনই তার পিসি কার্ডে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা হচ্ছে। টাকা শেষ হওয়ার আগে আবার নতুন করে টাকা জমা হচ্ছে। এছাড়া উৎসব পার্বণের আগে গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের সবার নামে একই অ্যামাউন্টের টাকা জমা হয়। দু-তিনজন ব্যক্তি নির্ধারিত দিনে এসে জেলগেটে তালিকা ধরে পিসি কার্ডে টাকা জমা করে যায়।
সম্প্রতি এ বিষয়টিও নজরে এসেছে গোয়েন্দাদের। এসব টাকার জোগান আসে আওয়ামীপন্থি কয়েকজন শীর্ষ ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে। এমন ১৫ জন ব্যবসায়ীকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ না করলেও বিকল্প সূত্রে কয়েকজনের নাম জানতে পেরেছে আমার দেশ। তাদের মধ্যে অন্যতম ডোনার পটিয়ার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েল অ্যাসোসিয়েটের মালিক দিদারুল ইসলাম। অন্যদের মধ্যে রয়েছেন—সমতা শিপিংয়ের মালিক আজিজুর রহমান, বড়তাকিয়া গ্রুপের পরিচালক নিয়াজ মোর্শেদ এলিট, সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান ওয়েল গ্রুপের মালিক আব্দুস ছালাম, কেএসআরএম গ্রুপের পরিচালক শাহরিয়ার জাহান রাহাত, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ওহিদ সিরাজ স্বপন, এশিয়ান গ্রুপের পরিচালক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সাকিফ আহমেদ সালাম, বনফুল গ্রুপের এমএ মোতালেব ও স্মার্ট গ্রুপের মজিবুর রহমান। এর বাইরে আরো কয়েকজন ব্যবসায়ীকে আওয়ামী লীগের ডোনার হিসেবে নজরদারিতে রেখেছে গোয়েন্দা পুলিশ।
রাজনীতি বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান জানান, আওয়ামী লীগের মতো এত বড় একটি নিষিদ্ধ শক্তিকে মোকাবিলা করতে পুলিশের যে আন্তরিক সক্রিয়তা থাকার কথা ছিল তা নেই। কারণ প্রশাসনকে দলীয়করণ করতে গিয়ে যোগ্য কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এর বাইরে এখনো প্রশাসনের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিস্ট অপশক্তি সক্রিয় আছে। এ ম্যাসেজটি নিষিদ্ধ সংগঠনটির প্রতিটি নেতাকর্মীর কাছে আছে। আর এ কারণে তাদের মনোবল অনেকটায় চাঙা। যেসব নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হচ্ছেন, সপ্তাহ না পেরোতেই অধিকাংশ জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছেন।
এর বাইরে জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদবিরোধী যে রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হয়েছিল সেটাতেও ফাটল ধরেছে মন্তব্য করে জিয়া হাবিব আহসান বলেন, নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে দূরত্ব দৃশ্যমান হওয়ায় ফ্যাসিস্ট শক্তি আরো ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। সব মিলিয়ে রাজপথে নিজেদের শক্তি জানান দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময় বলে মনে করছেন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায় বাতলে দিয়ে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার বিকল্প নেই। নিষিদ্ধ সংগঠনটি রাজপথে জনতার প্রতিরোধের ভয়ে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি নেয়নি। কিন্তু এ অপশক্তিকে আমরা চিনি। এভাবে চলতে থাকলে অল্পদিনের মধ্যে ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠবেন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।