হাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে রাজধানীর অলিগলি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কিশোর গ্যাং। বিভিন্ন জেলা শহর এমনকি উপজেলায় পর্যায়েও বেপরোয়া হয়ে উঠছে উঠতি বয়সের তরুণরা। তাদের সহিংসতা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার থেকে শুরু করে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। মাঠপর্যায়ে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েও তাদের দমানো যাচ্ছে না। কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হলেও আইনের ফাঁকফোকর ও তদবিরে পার পেয়ে যাচ্ছে তারা।
জন্মসনদের হিসাবে বয়স আঠারোর নিচে হওয়ায় আইনি সুরক্ষার অপব্যবহার করা হচ্ছে। দেশে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের চরম সংকট থাকায় তাদের সেখানে রাখা যাচ্ছে না। এছাড়া রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপে থানা থেকে বারবার মুচলেকায় মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে এসব অপরাধী। এই বাস্তবতায় কিশোর অপরাধের শেকড় উপড়ে ফেলতে এবং মাঠপর্যায়ের স্থবিরতা কাটাতে আইন সংশোধনসহ যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত প্রস্তাবনা তৈরি করছে পুলিশ সদর দপ্তর।
কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে বড় বাধা আটক কিশোরদের রাখার সক্ষমতার ঘাটতি। দেশে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে মাত্র তিনটি। এর মধ্যে গাজীপুরের টঙ্গীতে বালকদের জন্য ৩০০, কোনাবাড়ীতে বালিকাদের জন্য ১৫০ এবং যশোরের পুলেরহাটে বালকদের জন্য রয়েছে ১৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে অনুমোদিত আসন মাত্র ৬০০। কিন্তু বাস্তবে চাপ অনেক বেশি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের হিসাবে ৬০০ আসনের বিপরীতে ইতোমধ্যেই কেন্দ্রগুলোয় রয়েছে ১,০৬৪ জন।
জানা গেছে, গত বছর টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে দৈনিক গড়ে ৮০৯ জন নিবাসী ছিল। চলতি বছরের ২৬ মার্চও সেখানে ছিল ৭২১ জন। এ অবস্থায় বিভাগীয় পর্যায়ে নতুন শিশু সংশোধন বা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে। এক্ষেত্রে স্থায়ী ভবন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত অব্যবহৃত সরকারি ভবন বা উপযুক্ত স্থাপনা ব্যবহার করে অস্থায়ী কেন্দ্র চালুর কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ অভিযান চালানোর পর যদি আইন অনুযায়ী কিশোরকে রাখার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকে, তাহলে মাঠপর্যায়ের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, বয়স ১৮ বছরের নিচে হলে শিশু হিসেবে বিবেচিত। কোনো শিশুকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশকে তার বয়স প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করে নথিভুক্ত করতে হয়। জন্মনিবন্ধন সনদ না থাকলে স্কুলের সনদসহ সংশ্লিষ্ট দলিল যাচাই করে বয়স নির্ধারণের বিধান রয়েছে। গ্রেপ্তার করা শিশুকে বা কিশোরকে হাতকড়া বা কোমরে দড়ি দেওয়ার বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিশু আদালতে হাজির করার কথা আইনে বলা হয়েছে। আদালত প্রয়োজন মনে করলে তাকে জামিন দিতে পারে অথবা নিরাপদ স্থান কিংবা শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখার নির্দেশ দিতে পারে। এখানেই মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য জটিলতা তৈরি হয়।
দেখা যাচ্ছে, একই ঘটনায় জড়িত পাঁচজনের মধ্যে কেউ ১৭ বছর, কেউ ১৮ বা ১৯ বছরের হলে তাদের ক্ষেত্রে একই আইনি ব্যবস্থা প্রযোজ্য হয় না। আবার কিশোর গ্যাংয়ের নামে সব সদস্য অপ্রাপ্তবয়স্কও নয়।
বিভিন্ন অভিযানে দেখা গেছে, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে ১৮ বছরের বেশি বয়সিরাও যুক্ত। কুমিল্লার সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানেও ১৯-৪৭ বছর বয়সিদের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য এসেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পর্যালোচনা অনুযায়ী, জঘন্য ও সহিংস অপরাধের ক্ষেত্রে বয়সের আইনি ছাড় পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে পুলিশ সূত্র বলছে, অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে ১৮ বছরের এই বয়সসীমা কিছুটা কমানো কিংবা বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরো কঠোর মানদণ্ড আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি, জন্মসনদ বা শিক্ষাগত সনদের জালিয়াতি রোধে বয়স যাচাইয়ের একটি দ্রুত ও নির্ভুল ডিজিটাল পদ্ধতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যাতে অপরাধীরা ভুয়া কাগজপত্রের আড়ালে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যেতে না পারে।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা
কিশোর গ্যাংগুলোর পেছনে মূল শক্তি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও বিভিন্ন অপরাধ চক্রের গডফাদাররা। অর্থের লোভ দেখিয়ে বা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য উঠতি বয়সের এই তরুণদের তারা ব্যবহার করে থাকে। পুলিশ যখনই কোনো বিশেষ অভিযানে এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের ধরে থানায় নিয়ে আসে, তখনই বিভিন্ন মহলের রাজনৈতিক তদবির ও ক্ষমতার চাপ শুরু হয়। ফলে বাধ্য হয়ে পুলিশকে অনেক সময় তাদের মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দিতে হয়।
কিশোর অপরাধীদের ছাড়ার পেছনে পুলিশের কারো কারো আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়ানোর ঘটনাও রয়েছে। এই সংস্কৃতি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করার আইনি ও প্রশাসনিক নিশ্চয়তা চায় পুলিশ। বলা হচ্ছে, এক্ষেত্রে অভিযুক্ত কিশোরকে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে ছাড়ানোর জন্য কোনো ধরনের অনানুষ্ঠানিক চাপ এলে সেটি লিখিতভাবে নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা কেন কাউকে ছেড়ে দিয়েছেন, তারও একটি স্বচ্ছ রেকর্ড থাকা প্রয়োজন। যদিও গত ২৯ সেপ্টেম্বরের সভায় আইজিপি আলী হোসেন ফকিরও অপরাধীর ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সভায় কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
পৃষ্ঠপোষকদের কঠোর আইনের আওতায় আনা
কিছু কিশোরকে ধরে সাময়িকভাবে জেলে বা কেন্দ্রে পাঠালেই অপরাধের এই কাঠামো ভাঙা সম্ভব নয়। কারণ গ্যাংগুলোর মূল নেতৃত্ব, অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতা এবং পেছনের কারিগররা (যাদের পুলিশ আশ্রয়দাতা হিসেবে চিহ্নিত করে) পর্দার অন্তরালে বহাল তবিয়তে থেকে যায়।
নতুন প্রস্তাবনায় বলা হচ্ছে, কিশোরদের ব্যবহারকারী পেছনের এই প্রভাবশালী ও প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারের গ্রিন সিগন্যাল পেলে অ্যাকশনে যাবে পুলিশ।
এছাড়া কে প্রথমবার অপরাধে জড়িয়েছে এবং কে বারবার একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে, তা ট্র্যাক করার জন্য থানাভিত্তিক আলাদা ডিজিটাল ডেটাবেজ থাকা জরুরি। কোন কিশোরের সঙ্গে কোন গ্যাংয়ের যোগাযোগ রয়েছে এবং কার বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে, তার সঠিক তথ্য সংরক্ষণ করলে অপরাধ দমনে কৌশলগত সুবিধা পাওয়া যাবে। কেন্দ্রীয়ভাবে এই ডেটাবেজ যুক্ত থাকলে এক থানার অপরাধী অন্য থানায় গিয়ে সহজে অপরাধ করার সুযোগ পাবে না।
সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে সব জেলা থেকে কিশোর গ্যাংয়ের হালনাগাদ তালিকা তৈরি করে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মাঠপর্যায়ে। তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
অভিযানের পরেই বড় প্রশ্ন
কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক আটকের পরও সামনে এসেছে ‘আটকের পরও মুচলেকায় মুক্তি’র বিষয়টি একটি চ্যালেঞ্জ আকারে। কুমিল্লায় চাঞ্চল্যকর স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর জেলা পুলিশের অভিযান শুরু হয়েছিল। এই জেলায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর এক রাতের অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করে ৪৫১ জনকে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয়, আর ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরবর্তী দুই দফায় আরো ২৫৪ ও ৪১৫ জন আটক হয়—তিন দফায় সংখ্যা দাঁড়ায় ১,২৯৩।
একই চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রামে। জেলার ১৭ থানায় ৪৪৫ জন আটক হওয়ার পর ২৯৩ কিশোরকে অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়া হয়। লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ও রামগতিতে এক রাতেই আটক হয় ১০০ জন। আটকের চূড়ান্ত যে সংখ্যা প্রকাশিত হয়, বাস্তবে অনেক বেশি আটক করে পরে ছেড়ে দিতে হয়।
এসব ঘটনায় স্পষ্ট, অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা এবং আটক করা হলেও বিপুলসংখ্যক কিশোরকে বয়স, কিশোর সংশোধন কেন্দ্রের অপ্রতুলতা আর প্রভাবশালীদের তদবিরের কারণে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সব মিলিয়ে অভিযান চালানোর পাশাপাশি তাদের পুনরায় গ্যাংয়ে ফেরার পথ বন্ধ করতে পরিবার-স্কুলের নজরদারি এবং অপরাধে কিশোরদের ব্যবহারকারী বড়দের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াও চ্যালেঞ্জ বলে আলোচনায় উঠে আসছে।
গত ৫ অক্টোবর বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র, সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করতে বলা হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করে যেন অভিযান করা হয়, নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকে সচেতন থাকার জন্য মাঠ পর্যায়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
আইন সংশোধনসহ বিভিন্ন প্রস্তাবনার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রয়োজনে কোনো আইন সংশোধন কিংবা প্রস্তাবনার বিষয়ে বাস্তবতার নিরিখে সরকার বিবেচনা করবে। এই মুহূর্তে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলার সুযোগ কম।