কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন প্রকল্প ও সংস্থায় ঘাঁটি গেড়ে থাকা আওয়ামী লীগের সুবিধাবাদী আমলা এবং প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) অতীত কর্মকাণ্ডের আমলনামা পর্যালোচনা শুরু করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এ ঘটনায় কৃষি মন্ত্রণালয় ও এর আওতাধীন সংস্থাগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের অফিসগুলোতেও বদলি ও অপসারণের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এর ফলে একদিকে যেমন আওয়ামী লীগের সুবিধাবাদী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে গত ১৭ বছর ধরে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
মন্ত্রণালয়টির একজন দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারক আমার দেশকে বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরপরই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের আমলনামা পর্যালোচনা করা উচিত ছিল। বিলম্বে হলেও এখন সেই উদ্যোগ শুরু হওয়ায় পুরো মন্ত্রণালয়ে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ১৭টি সংস্থা ও অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ ও উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) পদ এখনো ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দখলে রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিগত দীর্ঘ ১৭ বছরে ভিন্ন মতাদর্শের কোনো আমলাকে এসব পদে পদায়ন করা হয়নি।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পরও আওয়ামী লীগ সরকারের অনুগত কর্মকর্তাদের সরাতে দৃশ্যমান বড় কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারও এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সচিবদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে এসব কর্মকর্তা নিজ নিজ পদে বহাল ছিলেন। এ নিয়ে দীর্ঘদিনের বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছিল। অন্যদিকে, মন্ত্রণালয়ের নমনীয় মনোভাবের কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে শৈথিল্য দেখা গেছে, যার সুযোগ নিচ্ছিল সুযোগসন্ধানীরা।
সম্প্রতি দেশে সার পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার পেছনে আওয়ামী লীগঘেঁষা এসব কর্মকর্তার ইন্ধন রয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই কঠোর অবস্থানে যায় মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে ওএসডি ও বদলি করা হয়।
একই সঙ্গে বিতর্কিত এসব কর্মকর্তা ও প্রভাব বিস্তারকারী পিডিদের বিগত দিনের ‘আমলনামা’ বা অতীত কর্মকাণ্ড সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিতর্কিতদের সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। অবশ্য এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খান আমার দেশকে বলেন, বিষয়টি আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। খোঁজ নিয়ে দেখব।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অধীনে ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন’ প্রকল্পের কার্যক্রম পর্যালোচনা করেছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, একদিনেই এই প্রকল্প থেকে ৪২০টি ই-জিপি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের তৎকালীন পিডি নুরুল ইসলাম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনারও তোয়াক্কা করতেন না। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে এই সুবিধাভোগী কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যেই পিডি পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে ৬০২ কোটি দুই লাখ টাকা বরাদ্দের এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারিত। এছাড়া বিএডিসির ২৯২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দের ‘বিদ্যমান বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের (২য় পর্যায়) পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. ইব্রাহিম খলিল।
শুধু এই দুটি প্রকল্পই নয়, মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রায় এক ডজন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বিগত আওয়ামী সরকারের অনুসারী কর্মকর্তারা এখনো পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে পার্টনার প্রকল্প, কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প, কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প, স্মলহোল্ডার অ্যাগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট (এসএসিপি), আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প, ঢাকা অঞ্চলে কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প, ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট (সিএসএডব্লিউএম) প্রকল্প, টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প, মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প (সংশোধিত), কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারকরণ প্রকল্প এবং বিল্ডিং ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস ইন ভালনারেবল ল্যান্ডস্কেপস ইন বাংলাদেশ (বিসিআরএল) প্রকল্পের পিডিরা রয়েছেন।
এসব প্রকল্পের অধিকাংশ পিডি সাবেক সরকারের মেয়াদে অনৈতিক সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে তাদের অতীত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করছে মন্ত্রণালয়। উন্নয়ন কাজের গতি যেন ব্যাহত না হয়, সে জন্য দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের নতুন পিডি হিসেবে নির্বাচন ও পদায়নের প্রক্রিয়া চলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, বিতর্কিত ও সুবিধাভোগী পিডিরা স্বপদে থেকে এখনো নানা ধরনের অপতৎপরতা চালাচ্ছেন। তবে মন্ত্রণালয় নিয়মতান্ত্রিক পথেই তাদের সরাতে চায়। উন্নয়ন প্রকল্পে গতি ফেরাতে হলে এই পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই।