বিতর্কিত নজরদারি সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশনস মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। কিন্তু নতুন সরকার এসে এনটিএমসির মেয়াদ আরেক বছর বাড়িয়েছে। অপরদিকে ‘ডেথ স্কোয়াড’ হিসেবে কুখ্যাত র্যাবের নাম ও পোশাক বদলের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি নেই।
সূত্র বলছে, এনটিএমসির সার্ভারে থাকা কল রেকর্ড, লোকেশন ও সোশ্যাল মিডিয়া ডেটা এখন মাথাব্যথার বড় কারণ। বিশাল এ তথ্যভান্ডার ধ্বংস হবে নাকি কোথাও সরানো হবে, তা নিয়ে কোনো স্বচ্ছ পরিকল্পনা নেই। তাই কোনো রোডম্যাপ ছাড়া এ সময় বৃদ্ধি আসলে গুমের প্রমাণ মোছার সুযোগ করে দিচ্ছে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গত ৪ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) নাম বদলে হচ্ছে স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স (এসআইএফ)। নাম ও পোশাকের পাশাপাশি এ বাহিনীর কার্যক্রমেও সংস্কার আনা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ স্কলার মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, ‘২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে এনটিএমসির মতো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা কী, সেটা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের পেছনে জনগণের করের টাকা কী কারণে ব্যয় করতে হবে, সেটা আমাদের সবার জানার অধিকার আছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বিএনপি র্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছিল। র্যাব বিলুপ্তির পথে এখন আর কোনো বাধা থাকার কারণ নেই। সরকার কেন সময়ক্ষেপণ করছে, সেটা বোধগম্য নয়।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাজনৈতিক
বিশ্লেষক শেখ ওমর আমার দেশকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার লঙ্ঘন, অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত নজরদারি এবং গুমের ঘটনায় এনটিএমসির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে এসেছে, যা আদালতের নথি এবং সরকার গঠিত গুমসংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও প্রতিফলিত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে এনটিএমসি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার প্রস্তাবও এসেছে। কিন্তু সরকার উল্টো এর মেয়াদ আরেক বছর বাড়িয়েছে, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নাগরিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
তিনি বলেন, ‘মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এনটিএমসির সার্ভারে থাকা বিপুল পরিমাণ কল রেকর্ড, লোকেশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশাল এ তথ্যভান্ডারের ভবিষ্যৎ কী হবে—তা ধ্বংস করা হবে, নাকি কোথাও সরিয়ে নেওয়া হবে; এ বিষয়ে কোনো স্বচ্ছ রোডম্যাপ নেই। ফলে সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছাড়া এনটিএমসির মেয়াদ বৃদ্ধি সমালোচকদের কাছে গুম ও নজরদারির সম্ভাব্য প্রমাণ নষ্ট বা আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে হচ্ছে। একই সময়ে র্যাব সংস্কারের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় উদ্বেগ আরো বাড়ছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে এ ধরনের কালক্ষেপণ শেষ পর্যন্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংস্কৃতিকে দীর্ঘস্থায়ী করার আশঙ্কা তৈরি করে।’
গুমসংক্রান্ত কমিশনের সুপারিশে কী ছিল
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মূলে ছিল র্যাব ও এনটিএমসি। গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি এ দুই সংস্থার আমূল সংস্কার ও বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল।
গুম কমিশনের প্রধান বিচারপতি (অব.) মইনুল ইসলাম চৌধুরী ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে এবং পরে জমা দেওয়া সুপারিশে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, এনটিএমসির মতো নজরদারি সংস্থা ও র্যাবের বর্তমান কাঠামো নাগরিক জীবনের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ প্রেক্ষাপটে এনটিএমসি বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল কমিশন।
অন্যদিকে, র্যাবকে নিয়ে খেলা হচ্ছে অদ্ভুত ‘লুকোচুরি’। গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০২১ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পায় র্যাব। কমিশন অব ইনকোয়ারি ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, র্যাব পরিচালিত গোপন বন্দিশালার অস্তিত্ব এবং তাদের ক্ষমতার অপব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। সমাধান হিসেবে তারা র্যাব অ্যাক্টের আমূল পরিবর্তন বা বাহিনীকে বেসামরিক পুলিশিংয়ের অধীনে আনার পরামর্শ দিয়েছিল।
এনটিএমসির আয়ু বাড়ল
মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসান ছিলেন এনটিএমসির প্রধান কারিগর। শেখ হাসিনার পতনের আগ পর্যন্ত টানা সাত বছর মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালেন করেন তিনি। তার নেতৃত্বেই সংস্থাটি ফোনকল রেকর্ড, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আড়িপাতার দানবীয় যন্ত্রে পরিণত হয়। ইসরাইলসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কেনা পেগাসাসের মতো অত্যাধুনিক স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাংবাদিক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাতেন। গুমসংক্রান্ত কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে, এনটিএমসির প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়েই জিয়াউল আহসান শত শত মানুষকে অপহরণ ও ‘আয়নাঘরে’ আটকে রাখার নীলনকশা বাস্তবায়ন করতেন।
চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারির সরকারি আদেশ বলছে, এ নজরদারি সংস্থা আরেক বছর বহাল থাকবে। উপসচিব কেএম ইয়াসির আরাফাত স্বাক্ষরিত চিঠিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত জানায়। সংস্থাটির মহাপরিচালককে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কন্ট্রোল (সংশোধনী) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর বিধান বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত এ অনুমতি কার্যকর থাকবে।’
এর আগে অন্তর্বর্তী প্রশাসন এনটিএমসি বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। অধ্যাদেশের একটি খসড়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ‘আগে থেকে বিদ্যমান কোনো ইন্টারসেপশন সংস্থা বা টেলিকমিউনিকেশনস মনিটরিং সেন্টার বা প্ল্যাটফর্ম’ বিলুপ্ত করা হবে। গত বছরের ২২ নভেম্বর সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সংস্থাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। অবশেষে ২৫ ডিসেম্বর অধ্যাদেশটি অনুমোদিত হয়, যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এনটিএমসি বিলুপ্ত করে ‘সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট’ (সিআইএস) নামে একটি নতুন সংস্থা গঠনের পথ তৈরি করা হয়।
সিআইএস স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত হওয়ার কথা এবং নিয়মানুযায়ী তারা নিজেরা সরাসরি আড়ি পাততে পারবে না। আদালত বা রিভিউ কাউন্সিলের অনুমোদনসাপেক্ষে কেবল অনুমোদিত সংস্থার অনুরোধে তারা ইন্টারসেপশন কার্যক্রম পরিচালনা করবে। পরিকল্পনা ছিল, এনটিএমসি তাদের সব সরঞ্জাম সিআইএসের কাছে হস্তান্তর করবে। তবে মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক চিঠির ফলে এনটিএমসি কার্যত আরেক বছর সময় পেল।
গত ১১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের মাত্র একদিন আগে নজরদারি ও প্রযুক্তি ক্রয়সংক্রান্ত সরকারি কমিটি সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এনটিএমসির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কোনো স্বতন্ত্র বা স্পষ্ট আইন নেই। এমনকি ব্যক্তিগত যোগাযোগে আড়িপাতার ক্ষেত্রে বিচারিক অনুমোদনের কোনো বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়নি। প্রশাসনিক আদেশ ও অসীম ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে কার্যক্রম চলায় নজরদারির পরিধি ও শর্তগুলো অস্পষ্ট থেকে গেছে, যা কাঠামোগত অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ পরিস্থিতির মধ্যেই সংস্থাটির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়।
‘ডেথ স্কোয়াড’ র্যাবের ভবিষ্যত কী?
শেখ হাসিনার আমলে র্যাব প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুম, খুন ও ক্রসফায়ারে জড়িয়ে ভয়াবহ ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছিল। তাদের গোপন কারাগারগুলোয় অসংখ্য মানুষকে বছরের পর বছর বিনা বিচারে আটকে রাখা হতো।
বিগত সরকারের পতনের পর র্যাবের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া দলগুলো র্যাবকে পুরোপুরি বিলুপ্ত করার দাবি জানায়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) শুরু থেকেই র্যাবকে রাজনৈতিক দমনের হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। হাসিনার পতনের পর একাধিক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতারা জানান, তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে র্যাব বিলুপ্ত করবেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিভিন্ন সময় (আগস্ট ’২৪ ও ফেব্রুয়ারি ’২৫) উল্লেখ করেন, র্যাবের মতো একটি বিতর্কিত সংস্থা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে টিকে থাকতে পারে না।
অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি র্যাব বিলুপ্তির দাবিতে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং পাঁচ দফা দাবিতে তারা র্যাবকে একটি ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী কাঠামো’ হিসেবে অভিহিত করে একে অবিলম্বে ভেঙে দেওয়ার দাবি জানান। এছাড়া জামায়াতে ইসলামী এবং বাম গণতান্ত্রিক জোটও বিভিন্ন সময় র্যাবকে একটি ‘প্যারা-মিলিটারি ফোর্স’ হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিলোপ অথবা সিভিল পুলিশিংয়ে একীভূত করার পক্ষে মত দেয়।
গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় র্যাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এমন অন্তত ১০ জন সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন সময় র্যাবের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এনটিএমসির এই ‘এক বছরের আয়ু’ কিংবা র্যাবের খোলস বদলের শ্লথগতি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘ প্রতীক্ষাকে আরো দীর্ঘায়িত করছে। এনটিএমসির মতো নজরদারি সংস্থার বিলুপ্তি ঝুলিয়ে রাখা কিংবা বিতর্কিত বাহিনীর সংস্কারে অনীহাÑদিন শেষে আইনের শাসনের প্রতি রাষ্ট্রের সদিচ্ছাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।