হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

যাত্রাবাড়ীতে ব্যাপক চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি

মাহমুদা ডলি

ঢাকা-৫ নির্বাচনি এলাকায় প্রায় হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্র ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে অস্ত্রের মহড়া, সহিংসতা ও হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিনদিন অবনতি হচ্ছে।

যাত্রাবাড়ী-ডেমরা ও কদমতলীর একাংশে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই গোলাগুলি, হামলা ও খুনের ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজির ভাগ না পেয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়েছেন স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী নেতারা। এ ধরনের নানা অভিযোগে স্থানীয় বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে যাত্রাবাড়ীর সাদ্দাম মার্কেট এলাকায় দুই লাখ টাকা চাঁদাবাজির বিরোধকে কেন্দ্র করে অটোরিকশা গ্যারেজের মালিক সাগর খান ওরফে ইমরানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরদিন নিহতের স্ত্রী যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা ও চাঁদাবাজির মামলা করেন। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গত ২৩ জুলাই ডেমরার সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির নির্বাচন বানচাল করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সামনে তিনটি ফাঁকা গুলি এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় পাল্টাপাল্টি মিছিল ও বিক্ষোভ করে জামায়াত-বিএনপি।

এরপর ২৮ আগস্ট ভোরে সারুলিয়ায় ডেমরা থানা বিএনপির আহ্বায়ক রেজা চৌধুরী সেলিমের বাড়িতে চারটি মোটরসাইকেলে করে আসা ৮-৯ জন হেলমেটধারী দুর্বৃত্ত তিন রাউন্ড গুলি ছোড়ে। মাদক কারবারের প্রতিবাদ করায় এই হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রেজা চৌধুরীর। এ ঘটনায় তিনি ডেমরা থানায় মামলা করেন।

রেজা চৌধুরী বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় আমার বাসায় গুলি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে যারা মাদক সিন্ডিকেট চালাতেন, তাদের সঙ্গে নিয়ে মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন ছাত্রদল নেতা মাসুদ। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেছি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সে এ বিষয়ে কথা বলতে আমাকে নিষেধ করে।

স্থানীয়দের মতে, অপরাধী গ্রুপগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। গত জাতীয় নির্বাচনের সময় এবং পরবর্তীতে বিএনপি ও অন্যান্য দলের তৃণমূল কর্মীদের কোন্দলে এই এলাকায় প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া দেখা গেছে।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে (যাত্রাবাড়ী) একাধিক অপরাধী চক্র সক্রিয়। তারা স্থানীয় রাজনীতিকদের ছত্রছায়ায় নানা অপরাধ করছে। অপরাধী গ্রুপগুলো চাঁদাবাজি, জমি দখল এবং মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিনিয়ত অস্ত্রের ব্যবহার করছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ডে চাঁদা আদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবহন থেকে মাসোহারা নেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে হামলার ঘটনাও ঘটছে। এতে পরিবহন শ্রমিক, চালক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চাপ ও আতঙ্ক।

যাত্রাবাড়ীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধে নিয়মিত নজরদারি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে যাত্রাবাড়ীতে ব্যাপক চাঁদাবাজির তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন পরিবহন থেকে এককালীন এবং প্রতিদিন চাঁদা আদায় করা হয়। ‘শরীয়তপুর সুপার’ বাস থেকে এককালীন ছয় লাখ ও প্রতিদিন এক হাজার টাকা, ‘পদ্মা সুপার’ থেকে এককালীন তিন লাখ এবং দৈনিক তিন হাজার টাকা, ‘ফেম পরিবহন’ থেকে এককালীন আড়াই লাখ এবং প্রতিদিন দুই হাজার টাকা এবং ‘ডিএম পরিবহন’ থেকে প্রতিদিন পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা নেন তারেক।

এছাড়া ‘নড়িয়া সুপার’ থেকে এককালীন আড়াই লাখ এবং প্রতিদিন ২০০০ টাকা চাঁদা নেন কাব্য খন্দকার। ‘পদ্মা এসি পরিবহন’ থেকে এককালীন দুই লাখ এবং দৈনিক ২০০০ টাকা নেন শাকিল মোল্লা। সোনালী, সার্বিক ও গোল্ডেন লাইন পরিবহন থেকে এককালীন চার লাখ এবং দৈনিক ৬০০০ টাকা চাঁদাবাজি করেন দ্বীন ইসলাম দিনা। রাজিব ও সাধ পরিবহন থেকে দৈনিক গাড়িপ্রতি ১০০০ টাকা নেন জাহিদুল ইসলাম অপু ও তারেক। হটলাইন কাউন্টার থেকে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা চাঁদাবাজি করেন চান্দি রতন ও অপু । গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য প্রত্যেকে গাড়ি থেকে ১০০ টাকা করে প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা চাঁদা নেন শ্রমিকদলের খন্দকার রানা ও শাকিল।

ডেমরা-যাত্রাবাড়ী লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা তোলা হয়, এর দায়িত্বে জামাই রনি। সিটি করপোরেশন মার্কেট শাকপট্টি থেকে দৈনিক ৩০ হাজার টাকা চাঁদা নেন বিএনপি নেতা নবী উল্লাহর ভাগ্নে আওলাদ। সিটি করপোরেশন মার্কেট থেকে দৈনিক দুই লাখ টাকা তোলেন নবীউল্লাহর ছোট মেয়ের জামাই রনি। যাত্রাবাড়ী-জুরাইন লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে দৈনিক ১০ হাজার টাকা চাঁদাবাজি, ৫০নং ওয়ার্ডে মাদক কারবার থেকে প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা এবং যাত্রাবাড়ী-চিটাগাং রোড লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা নেন ভাগিনা দীপু। অভিযোগ রয়েছে, যাত্রাবাড়ী ও ডেমরাসহ ঢাকা-৫ আসনের বিভিন্নস্থানে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা নবী উল্লাহ নবী।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ডেমরা-স্টাফ কোয়ার্টার লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে শিপন ও ফেরদৌস হোসেনের মাধ্যমে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া বাহাদুর শাহ পরিবহন থেকে শিপন, আসমানী ও আলিফ পরিবহন থেকে রফিক, রাজধানী পরিবহন থেকে মাসুদ রানা, অছিম পরিবহন থেকে প্রকাশ ও ফেরদৌস হোসেন রনির মাধ্যমে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। অন্যদিকে স্টাফ কোয়ার্টার ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে রফিক এবং সাইনবোর্ড ফুটপাত থেকে আজিজ, ফারুক আহমেদ সাদু ও রনির মাধ্যমে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়।

মাটি ভরাট ও জমি দখল

শীতলক্ষ্যা নদীতে হজরত আলী ও রনির মাধ্যমে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া ৬৭নং ওয়ার্ডে মাসুদ রানা ও রনির মাধ্যমে জায়গা-জমি দখল ও চাঁদাবাজি করা হয়। ৬৯নং ওয়ার্ডে প্রকাশ ও রনির মাধ্যমে ড্রেজার বসিয়ে মাটি ভরাট এবং অবৈধ চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। আর ৭০নং ওয়ার্ডে নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা সম্রাটের সহযোগী মোফাজ্জল হোসেন ভুঁইয়ার মাধ্যমে জমিতে মাটি ভরাট ও দখল করা হয়। পরবর্তীতে আজিজ ও রনির মাধ্যমে চাঁদা আদায় করা হয়।

মাদক কারবার থেকে চাঁদা

বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৬৬নং ওয়ার্ডে হেলাল, ৬৭নং ওয়ার্ডে মাসুদ রানা ও রনি এবং ৬৯নং ওয়ার্ডে প্রকাশ, আল-আমিন ও তোফাজ্জলের মাধ্যমে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরো কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া বাস্তুহারা লীগ ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি শাহীনের ভাই সাবেক যুবদল নেতা মুশফিকুর রহমান ফাহিম যাত্রাবাড়ীতে কয়েকটি কাউন্টারে চাঁদাবাজি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চাঁদা না দেওয়ায় তার টর্চার সেলে যুবককে নির্যাতনের ভিডিও প্রকাশ হওয়ার পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। সম্প্রতি সে আবার জেল থেকে বের হয়ে নতুন করে প্রবাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় থেকে ফের চাঁদাবাজি শুরু করেছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

এ ব্যাপারে নবী উল্লাহ নবী আমার দেশকে বলেন, ঢাকা-৫ আসনের এমপি সংসদে যে চাঁদাবাজির কথা বলেছেন, সেটা স্পেসিফিক আমার কথা বলেননি। তিনি চাঁদাবাজির কথা বলেছেন, সেটা বহিরাগতরা হতে পারে, আওয়ামী লীগের গুপ্তবাহিনী বা যে কেউ হতে পারে। যাত্রাবাড়ীতে রাজনৈতিক কোন্দল বা আধিপত্য বিস্তার বলতে কিছু নেই। স্থানীয় জনগণ বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন বলে হাইকমান্ড কমিটি ভেঙে দিয়েছেন। এজন্য ওই গ্রুপ রাগ করে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে। কোন্দল বলে কিছু নেই।

তিনি আরো বলেন, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলাম, এখনো সোচ্চার রয়েছি। চাঁদাবাজির ভাগ পাচ্ছি না— সংবাদ সম্মেলনে এমন বক্তব্যের ব্যাপারে নবী উল্লাহ নবী বলেন, ওরা ফেক আইডি খুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছে। এগুলো সত্য নয়।

যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু আমার দেশকে বলেন, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে কেউ মাসোহারা নিচ্ছে— এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। গাড়িপার্কিং নিয়ে চাঁদাবাজির ব্যাপারে তিনি বলেন, ট্রাফিক বিভাগ বিষয়টা দেখছে। তবুও আমি কাজ করছি, যাতে যাত্রাবাড়ীতে কোনো যানজট না থাকে।

ঢাকা-৫ আসনের এমপি কামাল হোসেন আমার দেশকে বলেন, নবী উল্লাহ নবী কিছুদিন আগে নিজের মুখে স্বীকার করেছেন যে, কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে, তাকে ভাগ দেওয়া হচ্ছে না। সব জায়গায় থেকে অভিযোগ আসছে চাঁদাবাজির।

পর্যালোচনায় বিতর্কিত পিডি ও কর্মকর্তাদের ‘আমলনামা’

অভিযুক্তকেই প্রমাণ করতে হবে পাচার করা অর্থ বৈধ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সর্বত্র

পুলিশের দাবি উন্নতি, বাস্তবে নিরাপত্তাহীনতা

রাজধানীতে ঠেকানো যাচ্ছে না ছিনতাই, বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতাবোধ

কেরোসিনের দাম এখন ভারতের দ্বিগুণ, পেট্রোলে ১৫ টাকা বেশি

আড়াই লাখ টন বেশি আমদানি, তবু কাটছে না সার সংকট

ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণ জনসংখ্যা, ডুবছে ঢাকা

খাল খননে মহাপরিকল্পনা সাফল্য নিয়ে সংশয়

১২০০ কোটি টাকা আজও ফেরত দেয়নি ভারত