হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

প্রাথমিকেই নিভে যায় বস্তিবাসী শিশুদের শিক্ষার আলো

জন্ম যেখানে আজন্ম পাপ (শেষ)

এমরানা আহমেদ

ছবি: সংগৃহীত

‘ইশকুলেও যাই নাই, পড়ালেহাও করতে পারি নাই। করমু ক্যামনে? ছোডকালে ভাইরে রাকতাম। মায় কামে যাইত। আর এহন নিজেই গার্মিসে কাম করি।’ রাজধানীর কারওয়ান বাজার রেললাইনসংলগ্ন বস্তির বাসিন্দা ১৪ বছর বয়সি কিশোরী হোসনে আরা এভাবেই আক্ষেপ করে আমার দেশ প্রতিবেদকের কাছে তার বিদ্যালয়ে যেতে না পাড়ায় কথাগুলো বলছিলেন। বর্তমানে পোশাকশ্রমিক হিসেবে কর্মরত হোসনে আরার কখনো স্কুলের যাওয়ার সুযোগই হয়নি। হোসনে আরার মা লাইলি বেগম বললেন, ‘গরিব মানুষেরা চাইলেও পোলাপাইনগো পড়াইতে পারে না। হাজারডা অসুবিদা থাহে।’

নগরীর আকাশছোঁয়া দালানের ঠিক নিচেই গড়ে ওঠা আরেক শহর—বস্তি। যেখানে হাজারো প্রতিকূলতার মাঝে বেড়ে ওঠে অসংখ্য শিশু। বস্তির শিশুদের চোখেও থাকে স্বপ্ন, মনে থাকে অদম্য কৌতূহল। কিন্তু সে স্বপ্ন আর কৌতূহল দারিদ্র্যের কঠিন দেয়ালে মাথা ঠুকে নিঃশেষ হয়। একবিংশ শতাব্দীর এ সময়ে দাঁড়িয়েও যখন আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলছি, তখন শহুরে বস্তির এসব শিশুর শিক্ষার অধিকার যেন এক বিস্মৃত অধ্যায় হয়েই থেকে যায়।

সরেজমিন রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও কমলাপুর রেললাইন বস্তি, মোহাম্মদপুর বরকতের বস্তি, বেড়িবাঁধ মাস্টারের বস্তি, আগারগাঁও করিমের বস্তি ঘুরে দেখা গেছে, বস্তিতে পরিবেশগত কারণে শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম। বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে প্রি-প্রাইমারি স্কুল পরিচালিত হলেও সেখানে শিশুদের নিয়মিত উপস্থিতি কম। তাদের পড়ালেখা মূলত প্রাথমিকের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। স্কুলে যাওয়ার দিক দিয়ে ছেলে শিশুর চেয়ে মেয়েশিশুরা এগিয়ে। তবে বস্তিতে মেয়েশিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে রয়েছে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা। এর মধ্যে অভাব-অনটন মেয়েশিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। জীবন ও জীবিকার তাগিদে অনেক মেয়েশিশুই স্কুলে যেতে পারে না কিংবা ঝরে পড়ে। বস্তিতে ছেলেশিশুর তুলনায় মেয়েশিশুরা কম বয়সে উপার্জন শুরু করে।

একটু বড় হলেই বাসায় গৃহকর্মীর কাজে লেগে যায়। বয়স ১২-১৩ হলেই পোশাক কারখানায় কাজ শুরু করে।

আগারগাঁওয়ের করিমের বস্তি ও কুমিল্লা বস্তি ঘুরে জানা গেছে, এখানকার শিশুরা শেরেবাংলা আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলোক শিশু শিক্ষালয় ও শেরেবাংলা নগর শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে লেখাপড়া করে। তবে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিভাবকসহ শিক্ষার্থীদের নানা অভিযোগ রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা শিশুদের পড়া বুঝিয়ে দেন না। উপরন্তু খারাপ ব্যবহার করেন বা মারধর করেন। এছাড়াও রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। বিভিন্ন অজুহাতে তারা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেন, যা গরিব মা-বাবাকে অনেক সময় সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে নিরুৎসাহিত করে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একমত পোষণ করে শেরেবাংলা আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ‘শিক্ষকদের মধ্যে অনেকের গরিব বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের প্রতি অবহেলা করার প্রবণতা থাকে। এ কারণে তাদের পড়া বুঝিয়ে দেওয়া বা শেখানোতে আগ্রহ থাকে না। এছাড়াও আমাদের সারাদিন অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়, যে কারণে অনেক সময় শিশুদের প্রতি খেয়াল করা সম্ভব হয় না।’

ইউনিসেফ ও ব্র্যাকের তথ্যানুযায়ী, এসব শিশুর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পায় না। যারা স্কুলে যায়, তাদের বড় অংশই পঞ্চম শ্রেণির আগে ঝরে পড়ে। এর প্রধান কারণ দারিদ্র্য, স্থান সংকুলান এবং স্কুলে বৈষম্যমূলক পরিবেশ।

শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে ইউনিসেফের ভিন্ন একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক স্তরে শিশুদের শিক্ষায় গুণগত মান ও দক্ষতা অর্জনে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে, বাংলাদেশে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত এবং প্রান্তিক ও প্রতিবন্ধী শিশুরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার আঁধারে নিমজ্জিত।

ইউনিসেফ প্রতিবেদন বলছে, তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে মাত্র ১৯ শতাংশ প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে। যদিও মেয়ে এবং ছেলেদের প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য প্রায় সর্বজনীন, প্রাপ্ত তথ্য যে ইঙ্গিত প্রদান করে তাহলো, শিশুদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্কুল থেকে ঝরেপড়ার সংখ্যাও বেড়ে যায়। মেয়েদের ক্ষেত্রে এটি প্রায়শই বাল্যবিবাহের কারণে হয় এবং ছেলেদের বেলায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয় শিশুশ্রমের কারণে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, অনেক শিশু—যারা স্কুলে যায়, তাদের মধ্যেও অনেককেই ন্যূনতম শিক্ষাগত দক্ষতা অর্জনে বেশ বেগ পেতে হয়। তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের এক-তৃতীয়াংশেরও কম সাক্ষরতা এবং সংখ্যাগত দক্ষতা পূরণের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারির আগে বাংলাদেশে ১০ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ৪৩ শতাংশ দক্ষতার সঙ্গে পড়তে পারত। এছাড়াও মাধ্যমিক পর্যায় পার হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ মৌলিক দক্ষতা অর্জন করেছিল।

বস্তিতে বসবাসকারী অভিভাবকরা আমার দেশকে বলেন, পড়ালেখা একবার বন্ধ হলে আর শুরু হয় না। আবার বস্তির পরিবেশও পড়ালেখাবান্ধব নয়। অনেকে মেয়েকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর চেষ্টা করলেও তারা যায় না। গেলেও নানা অজুহাতে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। পড়ালেখার প্রতি তাদের কোনো আকর্ষণ নেই। মোহাম্মদপুর বরকতের বস্তির কামাল বলেন, ‘মাইয়ারে ডেইলি পিডাইছি, তাও ইশকুলে যায় নাই।’

বেড়িবাঁধ মাস্টারের বস্তির স্বপ্নীল শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষক মামুন রহমান বলেন, এখানে মূলত সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ানো হয়। নানা সমস্যার কারণে এদের পড়ালেখা হয় না। কিন্তু প্রত্যেক মা-বাবাই চান, তার সন্তানটি পড়ালেখা করুক। সরকারসহ অনেক এনজিও শিশুদের শিক্ষার জন্য নানা কর্মসূচি চালু করেছে। তবে বস্তির শিশুদের তুলনায় প্রয়োজনীয় স্কুল বা শিক্ষক কোনোটাই নেই। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না হতেই অনেকে শিশুশ্রমিক হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, বস্তির অভিভাকরা পড়ালেখার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানে। কিন্তু নানা কারণে সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারেন না বা সন্তানের পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেন না। এখানে শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যাও কম নয়। কেউ চায়ের দোকানে, আবার কেউ রিকশার গ্যারেজে বা অন্য কোনো জায়গায় কাজ করে। তাদের কেউ কেউ স্কুলে যাওয়ার বদলে পরিবারের হাল ধরেছে। যদিও এনজিও পরিচালিত কিছু অস্থায়ী স্কুল রয়েছে, তবুও শিশুদের বড় অংশ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত বলে আমার মনে হয়েছে।

শিক্ষক মামুন রহমানের মতে, এসব শিশুর শিক্ষার পথে প্রধান অন্তরায় পরিবারের অসচ্ছলতা। তাদের বাবা-মা দিনমজুর বা অস্থায়ী কাজে নিযুক্ত। তাদের কাছে সন্তানের স্কুলের বেতনের চেয়ে দিনের একবেলার খাবার জোগাড় করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শিশুরা খুব অল্প বয়সেই উপার্জনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে যায়। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পুষ্টিহীনতা এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগ্রহ কেড়ে নেয়। অনেক বস্তিতে ভালো মানের স্কুল নেই, আবার থাকলেও স্কুলের পরিবেশ ও শিক্ষকদের আচরণ বস্তির শিশুদের জন্য সহানুভূতিশীল হয় না। ফলে বৈষম্যের শিকার হয়ে অনেক শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ে।

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন এনজিও বস্তিতে বা তার আশপাশে অস্থায়ী স্কুল, ব্রিজ একাডেমি বা আনন্দ স্কুল পরিচালনা করছে। এ স্কুলগুলো শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনার জন্য প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে বই বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান এবং স্কুলফিডিং কর্মসূচির মতো উদ্যোগগুলোও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সংবিধান অনুযায়ী, শিক্ষা প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্র এ অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শহরের ঝলমলে আলোর নিচে বস্তির শিশুরা একধরনের অদৃশ্য জীবনযাপন করে। তাদের অনেকেরই নেই জন্মনিবন্ধন সনদ, যা স্কুলে ভর্তির প্রথম এবং প্রধান শর্ত। ফলে শিক্ষাজীবনের শুরুতেই তারা পিছিয়ে পড়ে। যে বয়সে তাদের হাতে বই-খাতা থাকার কথা, সে বয়সে তারা সংসারের বোঝা কাঁধে তুলে নেয়। শিশুশ্রমের নির্মম চক্রে বাঁধা পড়ে তাদের ভবিষ্যৎ।

বস্তিতে শিক্ষা বলতে শুধু এনজিও স্কুল

বস্তিগুলোতে সরকারি-বেসরকারি কোনো স্কুল নেই। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) শিশুদের কিছুটা পড়াশোনা করায়। বনানীর গোডাউন বস্তিতে এনজিওকর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের বিনামূল্যে পড়ান জুলিয়া সুবর্ণা। তিনি বলেন, ‘আমার এখানে শিশুরা দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণির সমমানের পড়াশোনা করতে পারে। এরপর অধিকাংশ শিশু টাকার অভাবে বাইরের স্কুলে পড়তে পারে না। অনেক শিশুর মেধা আছে, ইচ্ছাশক্তি আছে। কিন্তু সামর্থ্য না থাকায় বাবা-মা বাইরের স্কুলে পড়াতে পারেন না। অধিকাংশই শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে যায়। আমার এখানকার অ আ ক খ তাদের জীবনের শেষ শিক্ষা। একপর্যায়ে তারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। অনেক শিশু আবার নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। জুলিয়া সুবর্ণার মতে, বস্তিতে থাকা কিশোরীরাও নানা সমস্যায় পড়ে। তাদের অনেককেই ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে তারা পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তান জন্মদানের কারণে নানা স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগতে হয় তাদের। বস্তিতে মেয়েশিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিবাহ। যেহেতু বস্তিতে কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়, সেক্ষেত্রে চাইলেও তারা পড়ালেখা করতে পারে না। এখানকার অভিভাবকদের ধারণা, মেয়েরা বিয়ে হলে অন্যের ঘরে চলে যায়। তাহলে তাদের পেছনে খরচ করে পড়াশোনা করিয়ে লাভ কী?

অনিয়মে জড়িত বিটিআরসির এক ডজন কর্মকর্তা

বাংলাদেশেও রাজনৈতিক হত্যায় ভারতের সম্পৃক্ততা

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগকে অর্থদাতা ১৫ ব্যবসায়ী নজরদারিতে

পুষ্টিহীনতায় বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিতে বস্তিবাসী শিশুরা

মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস

স্থানীয় নির্বাচনে থাকছে না প্রার্থীদের অঙ্গীকারনামা, বাড়ছে জামানত

জন্মসনদ নেই বস্তিবাসী ৫৮ শতাংশ শিশুর

আইসিইউ নেই ১৯ জেলার সরকারি হাসপাতালে

নরম খোলসের কাঁকড়া নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে কেন

পশু পরিবহনে নিষ্ঠুরতা, আইন থাকলেও নেই বাস্তবায়ন