হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

ভুল নীতি দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে, উপেক্ষিত সুপারিশ

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ

মাহফুজ সাদি

ছবি: এআই

দেশে প্রতিদিনই সড়কে ঝরছে প্রাণ। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে বর্তমান সরকার। কিন্তু বেড়েই চলছে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া ভুল নীতির কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। যেসব সুপারিশ করা হয়, তা উপেক্ষিতই থেকে যায়। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের লাগাম টানতে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি আরো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

এমন প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশÑসবার আগে বাংলাদেশ’। দিবসটি উপলক্ষে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আজ বেলা ১১টায় কাকরাইল থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব পর্যন্ত বর্ণাঢ্য র‍্যালি করবে।

দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তার দিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে বেসরকারি সংগঠনগুলো। সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে এ খাতের সংস্কার, সড়ক নিরাপত্তা আইন সময়োপযোগী করা, আইনের কঠোর প্রয়োগ, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে অংশীজনদের সুপারিশ আমলে নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়, যা দেশের মোট মৃত্যুর এক শতাংশ। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১৮ জনের বেশি, যা দক্ষিণ এশিয়া (১৬.১) এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের (১৫.২) গড়ের চেয়ে বেশি।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশের জিডিপির ৫.৩ শতাংশ ক্ষতি হয় বলে ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে সরকারি পরিসংখ্যানে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা কম দেখানো হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫,৪৯০ জন নিহত হয়েছেন, যা ডব্লিউএইচওর হিসাবের তুলনায় প্রায় ছয়গুণ কম।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। যাত্রী কল্যাণ জানায়, দেশে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী ২০১৪ থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ১৩ বছরে ৭২ হাজার ৭৩৬ সড়ক দুর্ঘটনায় এক লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত এবং এক লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন আহত হয়েছেন। তবে দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র বলছে, হতাহতের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। ফলে ইউক্রেন-রাশিয়া এবং ফিলিস্তিন-ইসরাইলসহ বিশ্বে চলমান বিভিন্ন যুদ্ধে নিহতের সংখ্যার চেয়ে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেশি।

রোড সেফটি বলেছে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৯৬৩ শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৩,৫৪৭ জনের বয়স ১৩-১৭ বছরের মধ্যে; ২,৮৮৪ জনের বয়স ৬-১২ বছরের মধ্যে এবং ১,৫৩২ জনের বয়স শূন্য থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে। সড়ক পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনা এবং ট্রাফিক আইন বিষয়ে অসচেতনতার কারণে শিশুরা সড়ক দুর্ঘটনায় উদ্বেগজনক মাত্রায় হতাহত হচ্ছে।

সরকার বলছে, সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিকে সহায়তাকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য ডিমেরিট পয়েন্ট ব্যবস্থা চালু এবং পুনরায় আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সম্প্রতি জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মরক্কোতে অনুষ্ঠিত সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক আন্তর্জাতিক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে এ সময়ের মধ্যে বৈশ্বিক ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনটি করার অঙ্গীকার করেন।

চলতি বছরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এবং আহত হওয়ার সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন মন্ত্রী শেখ রবিউল। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর অংশীদারত্ব ও সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মদশকের (২০২১-২০৩০) বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে আইনি, নীতিগত ও প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) গতিনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি সেবা নিশ্চিত করা; বিশেষ করে পথচারীদের নিরাপত্তা জোরদারে মহাসড়কে লক্ষ্যভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করছে।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে দেশবাসীর উদ্দেশে গতকাল বুধবার লন্ডন থেকে দেওয়া বার্তায় নিসচার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন, ২২ অক্টোবর থেকে পরবর্তী বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার দায়িত্ব নির্ধারণ করে পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে পরবর্তী জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ঘাটতির হিসাব দেশবাসীর সামনে প্রকাশ করতে হবে।

২২ অক্টোবর শুধু একটি দিবস নয় উল্লেখ করে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সড়ক নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন করার বর্ণনা দিয়ে তিনি আরো বলেন, জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে এক বছরের কাজের প্রকাশ্য মূল্যায়ন করা হোক। যে ক্ষেত্রগুলোতে দুর্বলতা থাকবে, সেগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী বছরের কর্মপরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ সময়ে নতুন কোনো ঝুঁকি বা প্রয়োজন দেখা দিলে সেটিও পরিকল্পনায় যুক্ত করতে হবে।

এক বার্তায় যাত্রী কল্যাণের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ও ভুল নীতির ফলে সড়ক দুর্ঘটনা ৮০ শতাংশ বেড়েছে। তাই সড়কে গণহত্যার দায় অতীতের সব সরকারকেই নিতে হবে।

সড়কে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, পরিবহনে বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্যের কারণে সড়কে বিশৃঙ্খলা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল, সড়ক নির্মাণে ত্রুটিসহ বিভিন্ন কারণ তুলে ধরেন।

যাত্রী কল্যাণ ও রোড সেফটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির উল্লেখযোগ্য কারণ হলো— মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ ছোট যানের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, সড়কে ডিভাইডার না থাকা, মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো।

সংগঠন দুটির সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ আমলাদের পরিবর্তে দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে বিআরটিএ পরিচালনা, সারা দেশে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক এবং প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, চালকদের উন্নত প্রযুক্তির প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লাইসেন্স দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ফুটপাতসহ সার্ভিস লেনের ব্যবস্থা করা, কাঠামোগত সংস্কার করে সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা, ফিটনেস প্রদান পদ্ধতি আধুনিকায়ন, মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন স্ক্র্যাপ করা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়ানো, ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলা।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, বেসরকারি সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করে আসছে। তারা অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে মাসিক এবং বার্ষিক প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার কারণ ও তার আলোকে সুপারিশ করে থাকে। কিন্তু সেগুলো সব সময় সরকার বা কর্তৃপক্ষ উপেক্ষা করে থাকে। অথচ তাদেরই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা।

রহস্যঘেরা মাদক আড্ডায় গ্রেপ্তার ওরা কারা

এমপিদের খুশি করতে বরাদ্দ বাড়ছে ৪০০০ কোটি টাকা

সচিবালয়ে ডিজিটাল হাজিরা, তদারকিতে প্রধানমন্ত্রী

অরক্ষিত সড়কে দস্যুদের রাজত্ব

পিএমওর নির্দেশনার পরও গোঁজামিলে ভরা জবাব বিটিআরসির

দুর্গাপূজার ছুটিতে ফাঁকা রাজধানী

অভিযোগ দাখিলের আট মাসেও শুরু হয়নি বিচার

কওমি অঙ্গনে টার্গেট মামুনুল হক

চায়ের আমন্ত্রণের পর সদস্যদের পদত্যাগ

সংখ্যালঘুদের ধর্মপালনের অধিকারের বিপরীত চিত্র