পবিত্র ঈদুল আজহা এলেই শুরু হয় কোরবানির পশু নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি। দেশের মহাসড়ক, নৌপথ ও পশুর হাটগুলোতে দেখা যায় চিরাচরিত ব্যস্ততা। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা ও চরাঞ্চল থেকে হাজার হাজার গরু, মহিষ ও ছাগল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের হাটে পৌঁছাতে দিনরাত ছুটে চলে ট্রাক ও নৌযান। কোরবানির মৌসুম ঘিরে প্রতি বছরই সামনে আসে গবাদিপশুর ওপর ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা, নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের নানা চিত্র।
ট্রাকে গাদাগাদি করে পশুবোঝাই, পা বেঁধে ফেলে রাখা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি ও খাবার ছাড়া পরিবহন, চলন্ত গাড়িতে মারধর কিংবা জবাইয়ের আগ পর্যন্ত অমানবিক আচরণ—এসব যেন এখন অনেক ক্ষেত্রে ‘স্বাভাবিক দৃশ্য’। অথচ প্রাণিকল্যাণ নিশ্চিত করতে দেশে রয়েছে সুস্পষ্ট আইন, বিধিমালা এবং শাস্তির বিধানও। প্রশ্ন উঠছে—আইন থাকলেও বাস্তবায়ন কোথায়?
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি। সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় এক কোটি এক লাখ। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখের পশু অতিরিক্ত রয়েছে। এ বিপুলসংখ্যক পশু দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পরিবহনের সময় মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কী আছে আইনে
বাংলাদেশ সরকার ২০১৯ সালে ‘প্রাণিকল্যাণ আইন’ প্রণয়ন করে এবং ২০২১ সালে ‘পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা’ কার্যকর করে। এসব আইনে পশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ রোধে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী, পশুবাহী ট্রাকে পর্যাপ্ত জায়গা রাখতে হবে। প্রতিটি পশুর ডানে-বাঁয়ে অন্তত ১৫ সেন্টিমিটার এবং সামনে-পেছনে ৩০ সেন্টিমিটার ফাঁকা স্থান রাখতে হবে, যাতে পশু সহজে দাঁড়াতে ও শ্বাস নিতে পারে। একই ট্রাকে গরু ও ছাগলের মতো ভিন্ন প্রজাতির পশু একসঙ্গে পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
টানা তিন ঘণ্টা বা ১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করলে পশুকে অবশ্যই বিশ্রাম দিতে হবে। বিশ্রামের সময় পরিষ্কার ও ছায়াযুক্ত স্থানে পানি ও খাবারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এছাড়া ট্রাকে ওঠানো-নামানোর সময় র্যাম্প ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এছাড়া পশুকে টেনেহিঁচড়ে ফেলা কিংবা লাফ দিতে বাধ্য করাও আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ।
আইনে আরো বলা হয়েছে, পশুকে এমনভাবে পরিবহন করতে হবে, যাতে তারা স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে, বসতে বা শুতে পারে। আহত বা অসুস্থ পশুকে চিকিৎসা ছাড়া পরিবহন করা যাবে না।
বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন
আইনের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না। ঈদের আগে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে দেখা যায়, একটি ট্রাকে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ পশু বোঝাই করা হচ্ছে। কোথাও গরুর পা বেঁধে রাখা হচ্ছে, কোথাও পশুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা না খাইয়ে পরিবহন করা হচ্ছে।
বিশেষ করে রাতের আঁধারে অনেক পরিবহনকারী দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছতে গিয়ে পশুর মৌলিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষা করছেন। এতে পশু আহত হচ্ছে, অসুস্থ হয়ে পড়ছে, এমনকি অনেক সময় মারা যাচ্ছে।
প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অমানবিক পরিবহন শুধু প্রাণিকল্যাণের পরিপন্থী নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও শারীরিক নির্যাতনের কারণে পশুর শরীরে হরমোনগত পরিবর্তন ঘটে, যা মাংসের গুণগত মানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আইন থাকাই যথেষ্ট নয়
প্রাণিকল্যাণ নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও কার্যকর বাস্তবায়ন আরো বেশি জরুরি। প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদের সময় পশু পরিবহনে যেসব অনিয়ম দেখা যায়, তার বড় কারণ হলো তদারকির ঘাটতি এবং মানুষের অসচেতনতা।
‘অভুক্ত বা তৃষ্ণার্ত পশু পরিবহন করা আইনত দণ্ডনীয়। পশুবাহী যানবাহনে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস থাকতে হবে। অতিরিক্ত পশুবোঝাই বা মারধর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়ম অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হচ্ছে।’
কোরবানির পশুর প্রতি মানবিক আচরণ শুধু আইনি নয়, ধর্মীয় দায়িত্বও। ইসলাম ধর্মে কোরবানির সময় প্রাণীর কষ্ট কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধারালো ছুরি ব্যবহার, পশুকে ভয় না দেখানো, এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই না করা—এসব বিষয় ইসলামি শরিয়াহতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
জবাইয়ের ক্ষেত্রেও নির্মমতা
শুধু পরিবহন নয়, কোরবানির সময় জবাইয়ের ক্ষেত্রেও নানা অনিয়ম দেখা যায়। অনেক স্থানে প্রকাশ্য রাস্তায় পশু জবাই করা হয়। কোথাও এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করা হচ্ছে, আবার কোথাও পশু পুরোপুরি মারা যাওয়ার আগেই চামড়া ছাড়ানো শুরু করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব আচরণ শুধু নিষ্ঠুরতাই নয়, বরং ধর্মীয় বিধান ও রাষ্ট্রীয় আইনেরও লঙ্ঘন। বিধিমালা অনুযায়ী, জবাইয়ের আগে পশুকে অন্তত ছয় ঘণ্টা বিশ্রামে রাখতে হবে। জবাইয়ের ২৪ ঘণ্টা আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোও বাধ্যতামূলক। কিন্তু দেশের অধিকাংশ অস্থায়ী হাট ও কোরবানির স্থানে এসব নিয়মের কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায় না।
হাটগুলোতে অব্যবস্থা
পশুর হাটে রোদবৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য ছাউনি, বিশুদ্ধ পানি ও পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা রাখার কথা থাকলেও অনেক হাটে এসবের ঘাটতি রয়েছে। অসুস্থ বা দুর্বল পশুও অনেক সময় বিক্রির জন্য আনা হচ্ছে। এতে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাট ইজারাদার, স্থানীয় প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সমন্বিত নজরদারি ছাড়া এ পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
প্রয়োজন কঠোর নজরদারি
প্রাণিকল্যাণ আইন অনুযায়ী, পশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের অপরাধে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। একই অপরাধ পুনরায় করলে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শাস্তির বিধান থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রয়োগ খুবই সীমিত। এজন্য ঈদের মৌসুমে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন, মহাসড়কে চেকপোস্ট, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং অনস্পট জরিমানার ব্যবস্থা জোরদারের দাবি উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ভেটেরিনারি সার্জন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রাণিকল্যাণ আইনের বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলম মিয়া আমার দেশকে বলেন, ১৯২০ সালের ‘অ্যানিমেল ক্রুয়েলিটি অ্যাক্ট’ এটাকে রোহিত করে পরবর্তী সময়ে ‘প্রাণিকল্যাণ আইন’ যেটা ২০১৯ সালে জাতীয় সংসদে পাস হয়।
তিনি বলেন, এখানে প্রাণির কল্যাণের জন্য অনেক বিধি সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সরকার যদি এগুলো পালন করে, তাহলে প্রাণিকল্যাণে অনেক ভালো হবে। দেশে আইন অনেক আছে, তবে সেগুলো পালন করতে গিয়ে আমাদের মধ্যে অনীহা। এ আইনটি পালন করলে আমাদের সবার জন্য ভালো।
ড. মোহাম্মদ আলম মিয়া বলেন, এটা না মানলে অনেক রোগ আছে, যা মানুষ থেকে অ্যানিমেল, অ্যানিমেল থেকে মানুষের হতে পারে। আইন পালন না করলে পশুদের যে কল্যাণ সেটা ব্যাহত হবে।
এ থেকে উত্তরণে বিষয়ে প্রাণী বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আলম আরো বলেন, সমাজে প্রাণিকল্যাণ আইন সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। বিশেষ করে গণমাধ্যাম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ আইন সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে। পাশাপশি স্কুল-কলেজে প্রাণিকল্যাণ আইন সম্পর্কে সচেতনতা প্রয়োজন।
এছাড়াও আমাদের ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক প্রাণীর যে কল্যাণ এটা বলা আছে। মসজিদে যদি ইমামরা মাঝেমধ্যে একটু প্রাণির কল্যাণ সম্পর্কে আলোচনা করেন, তাহলে সবাই সচেতন হবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি।
কোরবানি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু এ ইবাদত পালনের সময় যদি পশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়, তাহলে তার মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণির প্রতি সদয় আচরণ শুধু আইনের বাধ্যবাধকতা নয়, এটি সভ্যতা ও মানবিকতারও পরিচয়। ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং কঠোর প্রশাসনিক তদারকি একসঙ্গে কাজ করলেই কোরবানির সময় পশুর প্রতি অমানবিক আচরণ কমানো সম্ভব হবে।