মিয়ানমারের সমুদ্রসীমায় ক্যাবল ও অবৈধ কনসোর্টিয়াম
দেশের ইন্টারনেট অবকাঠামো শক্তিশালী করতে লাইসেন্স পাওয়া তিনটি বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির কার্যক্রম এবং তাদের গঠিত ‘কনসোর্টিয়ামের বৈধতা’র বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সামিট, মেটাকোর ও সিডিনেট নামের এ তিনটি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সিং নীতিমালা লঙ্ঘন করে দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলে সাবমেরিন ক্যাবলে সংযুক্ত হতে যাচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বেসরকারি পর্যায়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে আলাদা আলাদা সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে যে ‘কনসোর্টিয়াম’ গঠন করেছে, তার জন্য মন্ত্রণালয় বা বিটিআরসির কোনো পূর্বানুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এছাড়া গঠিত কনসোর্টিয়ামটি সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স এবং সরকারি গাইডলাইনের শর্তাবলি যথাযথভাবে পালন করছে কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় আনতে বলা হয়েছে। বিটিআরসি থেকে পাঠানো এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তদন্তের এ সিদ্ধান্ত নেয়।
বাংলাদেশে সাবমেরিন ক্যাবল খাতে সরকারি একচ্ছত্র আধিপত্য (মনোপলি) ভাঙতে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথমবার তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয় বিটিআরসি। লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড, সিডিনেট কমিউনিকেশনস ও মেটাকোর সাবকম লিমিটেড।
এদের মধ্যে সামিট ও সিডিনেট লাইসেন্স পায় ২০২২ সালের ১ সেপ্টেম্বর এবং মেটাকোর সাবকম লাইসেন্স পায় ১৪ সেপ্টেম্বর। এই তিন কোম্পানি মিলে পরবর্তী সময়ে ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্যাবল সিস্টেম’ নামক একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে এক হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা দেশের ক্রমবর্ধমান ইন্টারনেটের চাহিদা মেটাবে এবং ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করবে।
এ খাতের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে লাইসেন্সধারী এই কোম্পানিগুলো নির্ধারিত শর্ত মেনে চলছে কি না, তা নিশ্চিত হতে চায় সরকার। তদন্ত প্রতিবেদনে কোনো অনিয়ম বা শর্তভঙ্গ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
‘বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্যাবল সিস্টেম’ নামে গড়ে ওঠা এই কনসোর্টিয়ামের কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসির (বিএসসিপিএলসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসলাম হোসেন আমার দেশকে বলেন, বিটিআরসির নীতিমালায় বেসরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কনসোর্টিয়াম গঠন করতে পারবে এমন কোনো নির্দেশনা না থাকা সত্ত্বেও সামিট, মেটাকোর ও সিডিনেট মিলে ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট কেবল সিস্টেম’ নামে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করেছে। তাছাড়া লাইসেন্সিং নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানকে ন্যূনতম দুটি ফাইবার পেয়ার স্থাপন করতে হবে। নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু একটি করে ফাইবার পেয়ার স্থাপন করছে।
তিনি আরো বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো একটি বিদ্যমান সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে কক্সবাজার থেকে একটি ব্রাঞ্চ ক্যাবল নির্মাণের মাধ্যমে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছে। সিগমার ক্যাবলটি পাঁচ বছর পুরোনো একটি ক্যাবল, যা নির্মাণ করেছে চীনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘হুয়াওয়ে মেরিন নেটওয়ার্ক’ (এইচএমএন)। সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসসিপিএলসির তিনটি ক্যাবলের ব্রাঞ্চই বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থিত হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্রাঞ্চটির প্রায় ৯০ শতাংশ স্থাপিত হবে মিয়ানমারের ইকোনমিক জোনের অল্প গভীরতার জলসীমায়। অল্প গভীরতায় নির্মিত হলে ব্রাঞ্চটি ঝুঁকির মুখে থাকবে এবং যেকোনো মেরামতের জন্য মিয়ানমার সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান তিনটি লাইসেন্সের শর্তাবলি পূরণ না করেই অনিরাপদ সাবমেরিন ক্যাবলে সংযুক্ত হলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের আওতাধীন এবং পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসির (বিএসসিপিএলসি) বিনিয়োগ ও দেশের প্রযুক্তি খাত মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ অবস্থায় লাইসেন্সের সব শর্ত পরিপালন করে নিরাপদ ক্যাবলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান তিনটির লাইসেন্স বাতিল করা যেতে পারে।