হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

বর্ষায় বিপর্যস্ত দেশ

ডেস্ক রিপোর্ট

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার চিতলপাড়ায় শুক্রবার বন্যায় প্লাবিত সড়কে হাঁটুপানি ভেঙে পথ চলছেন স্থানীয়রা। আমার দেশ

বর্ষায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশ। অতিবৃষ্টি ও ভারতীয় ঢলে বৃহত্তর চট্টগ্রামে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় নেমেছে বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায়। বাঁশখালীতে ঢলের পানিতে ভেসে গেছে তিনজন। পানিবন্দি দেড় লাখের বেশি মানুষ। দেশের অন্যান্য জেলায়ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। হবিগঞ্জের খোয়াই নদের বাঁধ ভেঙে ২৫ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। মৌলভীবাজারের পাঁচ জায়গায় বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। রাঙামাটিতে পানিবন্দি হয়ে আছেন ২০ হাজারের বেশি মানুষ, আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন সাড়ে চার হাজার। কক্সবাজারের অনেক এলাকা ডুবে আছে পানির নিচে। নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকা উল্টে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় দিনের মতো বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় বাঁকখালী ও মাতামুহুরীর পানি।

এদিকে, পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার চারদিন পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিক হয়নি বান্দরবানের জনজীবন। সারা দেশের সঙ্গে জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টায় রাঙামাটির সাজেকের পর্যটনকেন্দ্রে তিনদিন ধরে আটকে থাকা পর্যটকরা নিরাপদে ফিরেছেন।

জানা গেছে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের ১০ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত। এছাড়া রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, লোহাগাড়া, হাটহাজারী, পটিয়া, আনোয়ারা এবং সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বৃষ্টির তীব্রতা কমলেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কারণ, পাহাড়ি ঢল নামতে শুরু করেছে। জেলা প্রশাসনের হিসাবে ১২ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম মানবিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। সড়ক ডুবে যাওয়ায় অনেক এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি, মাছের ঘের, বসতবাড়ি ও দোকানপাট। বন্যার পানিতে ভেসে ও পাহাড়ধসে ছয় শিশুসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোয় আটকে পড়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। রাস্তার পাশের মানুষেরা ত্রাণ পেলেও দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষেরা পড়েছেন মহাবিপাকে। বিশেষ করে গবাদিপশু, শিশু ও নারীদের দুর্ভোগ সীমা ছাড়িয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের কর্মীরা উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রাখলেও পর্যাপ্ত নৌকা না থাকায় উদ্ধারকাজ ও দুর্গম এলাকাগুলোয় ত্রাণ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আটকে পড়া মানুষের মাঝে বিশুদ্ধ পানি ও শুকনা খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

জলবায়ু গবেষকরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও নিম্নচাপের কারণে অতিবৃষ্টির প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং মিয়ানমারের রাখাইন (আরাকান) পর্বতমালার বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায়। অতিভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে পাহাড়ি ঢল যুক্ত হয়ে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির দিনদিন অবনতি হচ্ছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিওসি) এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ছয় দিনে চট্টগ্রামে প্রায় এক হাজার ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। তিন পার্বত্য জেলা হিসাব করলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ তিন হাজার মিলিমিটার ছাড়িয়ে যাবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে বান্দরবানের লামায়। ছয় দিনে ৮৬০ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শঙ্খ নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। সাঙ্গু ও ডলুর পানি লোকালয়ে ঢুকে বাঁশাখালী, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ, আনোয়ারার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করেছে। রাউজান ও হাটহাজারী দিয়ে প্রবাহিত হালদার পানিও স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বেশি উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, বাঁশখালীর ১৫ ইউনিয়নের ২১২ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পুঁইছড়ি, শেখেরখীল, বৈলছড়ি, বাহারছড়া, কাথরিয়া, কালিপুরসহ অসংখ্য এলাকা পানির নিচে রয়েছে। এতে চার হাজার কাঁচাঘর ভেঙে গেছে এবং আট হাজার কাঁচা-পাকা বাড়িঘর অংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার ৮০ আশ্রয়কেন্দ্রে কয়েক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

অন্যদিকে, সাতকানিয়ার সাঙ্গু ও শঙ্খ নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের ওপর প্রবল স্রোত প্রবাহিত হওয়ায় যানচলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রামের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

উপজেলার ১৭ ইউনিয়নের কমবেশি সবকটিই প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে আটটি ইউনিয়নের সঙ্গে উপজেলা সদরের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সব মিলিয়ে তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

লোহাগাড়ার ছয়টি ইউনিয়নের অন্তত ৩০ হাজার মানুষ গত ছয়দিন ধরে পানিবন্দি হয়ে আছেন। দাবুয়া খালের বাঁধ ভাঙার পাশাপাশি মানিকছড়ি থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

রাঙ্গুনিয়ার নিচু এলাকাগুলো গত ছয়দিন ধরে পানিতে নিচে আছে। পাহাড়ি ঢলে সড়ক, সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় যানচলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ইছাখালী গুচ্ছগ্রামে পাহাড়ধসে এক নারীর মৃত্যু এবং দুজন আহত হয়েছেন।

হালদা নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে প্রবাহিত হওয়ায় ফটিকছড়ির পাইন্দং, সুয়াবিল, নানুপুর, ভূজপুর, দাঁতমারা, লেলাং, হারুয়ালছড়িসহ একাধিক ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক বাড়িঘর, ফসলি জমি ও মাছের ঘের পানির নিচে চলে গেছে।

চন্দনাইশের দোহাজারী পৌরসভার অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে আছে। শঙ্খ নদীর তীরবর্তী এলাকা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি ঢলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। হাটহাজারীর চিকনদণ্ডী, গড়দুয়ারা, উত্তর মাদার্শা, দক্ষিণ মাদার্শা, শিকারপুর, বুড়িশ্চর ও ছিপাত ইউনিয়নের অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সঙ্গে এসব এলাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। পৌরসভার মোহাম্মদপুর এলাকায় পানিতে ডুবে দুই বছর বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বাঁশখালীর আট ইউনিয়নের তিন শতাধিক মসজিদে তিনদিন ধরে নামাজ বন্ধ রয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজও হয়নি এলাকাগুলোয়। অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটছে ওই এলাকার মানুয়ের।

গতকাল বাঁশখালী, সাতকানিয়াসহ বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সাধারণ মানুষ ও গবাদিপশুর অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র। বাঁশখালীর ছনুয়া এলাকার আকমল হোসেনের পরিবারের নারী ও শিশুদের আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন গত বুধবার বিকালে। এরপর থেকে একটি গরু আর তিনটি ছাগল নিয়ে ঘরের ছাদে বসবাস করছেন তিনি। তিনদিন ধরে গবাদিপশুগুলো নিয়ে পানিতে ভিজছেন বলে জানান তিনি।

হঠাৎ বন্যায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয়ও সব সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বাঁশখালীর লাবুর দোকান আশ্রয়কেন্দ্রের দ্বিতীয় তলায় দেখা মেলে কালিপুর ইউনিয়নের ৬৫ বছর বয়সি আহমেদ হোসেনের, যিনি সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে ঘরের আসবাব, ধান-চাল, কাপড়ের অবস্থা না জেনেই আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি জানান, জীবনে অনেক বন্যা দেখলেও এমন অসহায়ত্ব আগে কখনো অনুভব করেননি।

হরদণ্ডী ইউনিয়নের ফারাছা বেগমের ঘরের চাল পর্যন্ত পানিতে ডুবে যাওয়ায় পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে এক কাপড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে হয়েছে। এই আশ্রয়কেন্দ্রের এক কোণে বসে থাকা সাদিয়া সুলতানার প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলেও চারদিকে পানি ও সড়ক তলিয়ে থাকায় হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। হঠাৎ প্রসববেদনা শুরু হলে কীভাবে হাসপাতালে নেওয়া হবে, সে উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে স্বজনদের।

আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা কিরণ বালা জলদাসের পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্যের বয়স মাত্র ২০ দিন, আরেকজনের বয়স পাঁচ বছর। আট সদস্যের এই পরিবারকে নবজাতকের প্রয়োজনীয় খাবার ও পরিষ্কার কাপড়ের সংকটে সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে।

ছয় মাস বয়সি সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বসে থাকা পম্পি দাশ বলেন, ঘরে থাকলে অন্তত নিজের মতো থাকা যেত, আশ্রয়কেন্দ্রে সবাই মিলে থাকায় শিশুটির কষ্ট বেশি হচ্ছে।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন জানান, হঠাৎ বন্যা হওয়ায় শুরুতে সবাই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। এখন পরিস্থিতি সামলে নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আমাদের অনেক এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু শুক্রবার সেনাবাহিনীর কাছ থেকে ১০টি স্পিডবোট পেয়েছি। ফলে দুর্গম এলাকাগুলোতেও শুকনো খাবার, পানি বিতরণ করতে অসুবিধা হচ্ছে না। স্পিডবোটে যদি কোথাও ত্রাণ দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে সেখানে সেনাবাহিনী তাদের লজিস্টিকস ব্যবহার করে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে।

তিনি জানান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সব কর্মকর্তার ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সবাই মিলে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নিজে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন। সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কোনো মানবিক সহায়তা যাতে আটকে না থাকে, সে ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।

কক্সবাজারে বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে

টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে। কোথাও কোথাও কোমর পরিমাণ পানি ঢুকে গেছে বাড়িঘরে। যদিও শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমে এসেছে। তবে বৃষ্টি কমলেও বিস্তীর্ণ এলাকার পাঁচ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। এদিকে বন্যার পানিতে ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় নৌকা ডুবে চকরিয়ায় হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা ও শাওরিন মনি নামে দুই বোনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও তাদের বাবা আব্দুল মালেক, তার স্ত্রী ও আরেক সন্তান প্রাণে বেঁচে গেছেন।

অপরদিকে টানা ছয়দিন ধরে পানির নিচে তলিয়ে থাকায় বন্যাকবলিত এলাকার সড়কের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

গত রোববার থেকে টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বহু বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গিয়ে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো সড়কে পানি উঠে পড়ায় যান চলাচলেও ব্যাঘাত ঘটছে।

টানা বৃষ্টিপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া ও পেকুয়ার রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকা।

প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ৩৫ ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

নৌকা উল্টে দুই বোনের মৃত্যু

বন্যার পানিতে ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল আবদুল মালেক পরিবারের। কিন্তু সেই পথই হয়ে উঠল মৃত্যুর ফাঁদ। ঝড়ো বাতাসে ডিঙি নৌকা উল্টে তার স্ত্রী ও দুই সন্তান প্রাণে বাঁচলেও নিখোঁজ হয় ১৩ বছরের মেয়ে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা ও ৭ বছর বয়সী শাওরিন মনি। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। দুপুর দেড়টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ঝর্ণার লাশ উদ্ধার করে। মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার হওয়া শাওরিন মনিকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

দুই নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে

বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি অতিবৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে দ্বিতীয় দিনের মতো বিপৎসীমার উপর দিয়ে অতিক্রম করেছে। তবে জেলার কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি ঢোকার ঘটনা ঘটেনি। শুধুমাত্র চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছিল।

জেলা প্রশাসনের সতর্কতা

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েকদিন ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।

রাঙামাটিতে পানিবন্দি ২০ হাজার

রাঙামাটিতে গত কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণ আর ভারত থেকে পাহাড়ি ঢল নামতে থাকায় বাঘাইছড়ির বন্যা পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। শুক্রবার থেকে বৃষ্টিপাত কম হলেও গ্রামগুলোর পানি কমেনি, পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। অপরদিকে লংগদু, বিলাইছড়ি, নানিয়ারচর, বরকল ও জুরাছড়ির পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। এসব এলাকায় অন্তত ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ৫ হাজার পরিবারের ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পাহাড়ধসে প্রায় তিন কিলোমিটার সড়ক ভেঙে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এতে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

বান্দরবানে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত

মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার চারদিন পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিক হয়নি বান্দরবানের জনজীবন। সারা দেশের সঙ্গে জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন রয়েছে। চট্টগ্রামের কেরানীহাট ও বাজালিয়া এলাকায় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে থাকায় দূরপাল্লার কোনো বাস বান্দরবান শহরে প্রবেশ কিংবা বের হতে পারছে না। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় লোকজন।

এদিকে টানা চারদিন পানির নিচে থাকা বহু পরিবার এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। বিভিন্ন প্লাবিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক পরিবার শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে রয়েছেন। জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, রেড ক্রিসেন্টসহ কয়েকটি সংস্থা কিছু এলাকায় শুকনো খাবার ও রান্না করা খিচুড়ি বিতরণ করেছে।

সাজেকে আটকে পড়া ৫০০ পর্যটক ফিরেছেন

সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টায় রাঙামাটির সাজেক ভ্যালির পর্যটনকেন্দ্রে তিনদিন ধরে আটকে থাকা পর্যটকরা নিরাপদে ফিরেছেন। টানা বৃষ্টিতে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সাজেকে আটকা পড়েন পাঁচ শতাধিক পর্যটক। গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুই দফায় তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হয়।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান জানান, সাজেকে আটকে থাকা সব পর্যটককে বাঘাইহাট সেনা জোনের সহায়তায় নিরাপদে গন্তব্যে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, আটকে পড়া প্রত্যেক পর্যটক সুস্থ ও নিরাপদ ছিলেন।

বাঁশখালীতে ঢলে দুই শিশুর মৃত্যু

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এরই মধ্যে পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে ভেসে মিরাজ ও আশিক নামে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বাহারচড়া ইউনিয়নের পৃথক এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত আশিক দক্ষিণ ইলশা গ্রামের মেহের আলী বাড়ির প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে। অপর নিহত শিশু মিরাজ বাহারচড়া ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার বাসিন্দা।

জানা যায়, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দুই শিশু নিজ নিজ বাড়ির উঠানে বের হলে পূর্ব দিক থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে তারা ভেসে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে পথেই তাদের মৃত্যু হয়।

এদিকে শুক্রবার সকালে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বন্যাকবলিত বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন এবং নগদ অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।

হবিগঞ্জে ২৫ গ্রাম প্লাবিত

হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে অন্তত ২৫ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যার্ত মানুষ নদীর বাঁধ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে সদর উপজেলার ১০ নম্বর লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ গ্রামের পাশের নদীর বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। এতে দক্ষিণ চরহামুয়া, উত্তর চরহামুয়া, কালীগঞ্জ, সুঘর, আদ্যপাশা, নোয়াবাদ, সুলতানশী, হাতিরথান, কটিয়াদি, বনগাঁও, দক্ষিণ বনগাঁওসহ ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়।

মৌলভীবাজারে পানিবন্দি ২০ হাজার

ভারতীয় ঢল ও অতিবৃষ্টিতে মৌলভীবাজারে দুটি উপজেলায় নদী ভাঙনের ফলে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেকে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিলেও পাচ্ছেন না সরকারি ত্রাণ। বেড়িবাঁধ ও বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন। নষ্ট হয়েছে হাজার হাজার একর ফসসি জমির ফসল। মনু নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অনেক লোক। অনেকেই বিভিন্ন বেড়িবাঁধে, উচ্চস্থানে বা অন্য জায়গায় আত্মীয়ের বাসায় স্থান নিয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় সরকারি কোনো সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন স্থানীয় প্রতিনিধিরা]

বিএসএফের বুলেটে চোখ হারিয়ে অনিশ্চিত জীবন

গণহত্যার কুশীলব ৮০ পুলিশ কর্মকর্তার বিদায় চূড়ান্ত

ফিরল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট

কাজের খোঁজে ঢাকা অভিমুখে জনস্রোত

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না জামায়াত এমপিদের

বৃষ্টির ত্রুটিপূর্ণ প্রতিবেদন দিচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড

পলাতক ৩ জেনারেল এখন কলকাতার সেনা এলাকায়

কেউই খোঁজ নেয় না দুই শিশুর হত্যাকারী ইয়াসমিনের

সরানো হচ্ছে ৫ আগস্টের আগের ১৬৯ পুলিশ সদস্যকে

সার আমদানিতে আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচ, সংকটের আশঙ্কা