সরেজমিন
২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিল। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্ত। ৯৩১ নম্বর পিলারের কাছে গরু চরাতে গিয়েছিল ১৪ বছরের কিশোর রাসেল মিয়া। বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ৫০০ গজ ভেতরে থাকলেও রেহাই মেলেনি তার। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ছোড়া রাবার বুলেটে সেদিন ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায় রাসেলের মুখমণ্ডল। ৪৮টি স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয় তার মাথা ও চোখে।
বিএসএফের সেই নির্মম আঘাতে চিরতরে অন্ধকার নেমে আসে রাসেলের ডান চোখে। এ ঘটনার পর আট বছর পার হয়েছে। এখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাসেল। কিন্তু শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই দুঃসহ স্মৃতি আর স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা। বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরে ক্লান্ত তার পরিবার। রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায়ের প্রতিশ্রুতিগুলো এখন তার কাছে কেবলই ধুলো জমা স্মৃতির পাতা।
সেদিনের ঘটনার ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে রাসেল মিয়া বলেন, ‘২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিলের ঘটনা। আমি তখন স্কুলের ছাত্র। ফুলবাড়ী সীমান্তে আমাদের নিজ জমিতে গরু চরাতে গিয়ে ঘাস কাটছিলাম। হঠাৎ বিএসএফ সদস্যরা সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে বাংলাদেশের ২০০-৫০০ গজ ভেতরে ঢুকে পড়ে। তাদের ধাওয়া খেয়ে আমি পার্শ্ববর্তী নদীতে ঝাঁপ দিই। নদী থেকে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে তারা আমাকে লক্ষ্য করে শটগান থেকে রাবার বুলেট ছোড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আমার মাথা, কান ও মুখমণ্ডল ঝাজরা হয়ে যায়। ৪৮টি স্প্লিন্টার আমার শরীরে গেঁথে গিয়েছিল। প্রাথমিক চিকিৎসার পর রংপুর এবং পরে ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে দীর্ঘ মাসব্যাপী চিকিৎসার পর ডা. দীপক কুমার নাগ জানান, আমার ডান চোখটি চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে।’
রাসেল আরো বলেন, ‘তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার শ্রী হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা স্বয়ং আমাদের সঙ্গে দেখা করে চিকিৎসার ব্যয়, ক্ষতিপূরণ ও সুষ্ঠু বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরে রাজেশ উইকে, সান্তানু দত্ত ও নবনীতা চক্রবর্তীর মতো কর্মকর্তারা আমাকে দিল্লির এইমসে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও চোখের অবস্থার উন্নতি হয়নি। তারা পুনরায় চিকিৎসার কথা দিয়েছিলেন, কিন্তু করোনার অজুহাত দিয়ে এরপর থেকে তারা আমার সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। আজ আমি অন্ধত্ব নিয়ে বাঁচছি, কিন্তু আমার কষ্টের কোনো প্রতিকার পাওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছি না।’
বড় ভাইয়ের জবানিতে সীমান্তের অস্থিরতা
রাসেলের বড় ভাই মো. কাইম হোসেন রুবেল গত ২০ জুন তাদের বাড়িতে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার, হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে রাসেলকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখতাম। বিএসএফের গুলিতে রাসেলের চোখ নষ্ট হওয়ার পর আমরা আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং মানবাধিকার কমিশনের সহায়তায় বিষয়টি গণমাধ্যমে তুলে আনি। তখন হাইকমিশনারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হয়েছিল। আমি তাদের কাছে অনুরোধ করেছিলাম, আমার ভাইয়ের ভবিষ্যতের দায়ভার ও চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। তারা ক্ষতিপূরণের কথা বললেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’
সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে রুবেল বলেন, ‘সীমান্তের পরিস্থিতি এখন আপাতদৃষ্টিতে শান্ত মনে হলেও বিএসএফের ঔদ্ধত্য কমেনি। দেড় বছর আগেও তারা দলবল নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। তারা স্থানীয় নারীদের হয়রানি ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করলে গ্রামের মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আমাদের প্রতিরোধের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। বর্ডারে এমন ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন—আমরা আর কতকাল এমন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হব? আমরা রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানাই, আমার ভাইয়ের শরীর থেকে অবশিষ্ট স্প্লিন্টার বের করা এবং তার উন্নত চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে এই বর্বরোচিত ঘটনার একটি বিচার নিশ্চিত করা হোক।’
গত ২০-২৫ জুন সীমান্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিএসএফের অতীতের নৃশংসতা ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন গ্রামবাসী। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএসএফ নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাজুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং সাধারণ মানুষের ওপর অকারণে বলপ্রয়োগ করে আসছে। রাসেলের মতো অসংখ্য কিশোর ও সাধারণ মানুষ বিএসএফের অমানবিক ধাওয়ার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন কিংবা স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঢুকে নিরীহ জনগণের ওপর আক্রমণ, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং নারীদের উত্ত্যক্ত করার মতো ঘটনা তাদের পেশাদারত্বের চরম অভাব এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনেরই বহিঃপ্রকাশ।
স্থানীয়রা জানান, বর্তমান সময়েও সীমান্তের পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ নয়। বিএসএফের টহল দল মাঝে মাঝেই নিয়ম ভেঙে কাঁটাতারের বাইরে এসে গ্রামবাসীর ওপর চড়াও হয়। স্থানীয়দের কথায় স্পষ্ট যে, বিএসএফ প্রায়ই তাদের কর্মকাণ্ডে ঔদ্ধত্য দেখায়, যার ফলে সীমান্তে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয়।
[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী প্রতিনিধি ইউনুছ আলী আনন্দ]