হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

এবার পোশাকশিল্পে বেতন বৃদ্ধির চাপ

ইসমাঈল হোসাইন সোহেল

সীমিত আয় ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি জোরালো হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে স্কেল অনুমোদনের পর এবার বেসরকারি খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি উঠেছে। তবে উৎপাদন খরচের অনুপাতে পোশাকের দাম না বাড়ায় ব্যবসায়িক চাপে রয়েছেন পোশাকশিল্প মালিকরা। এমন পরিস্থিতিতেও সরকারের মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তে সম্মতি দিয়েছেন তারা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাকের অবদান প্রায় ৮১ শতাংশ। রপ্তানি আয়ে পোশাক খাতের অবদান প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার। আগামীতে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়কে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এছাড়া পোশাক খাতে রয়েছে বিপুল কর্মসংস্থান।

২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বড়, মাঝারি ও ছোট মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পোশাক কারখানায় কাজ করেন ৪০ লাখের মতো শ্রমিক। আবার নারীদের আত্মনির্ভরশীলতায় বড় অবদান রাখছে খাতটি। কারণ এই খাতের মোট শ্রমিকের প্রায় ৬২ শতাংশই নারী। তবে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে অন্যসব মানুষের মতোই হিমশিম খাচ্ছেন শ্রমিকরা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ। আগস্টে এটি ছিল ৮.২৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ৩১ আগস্ট সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে স্কেল অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। পে স্কেলের পর স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতেও বেতন-ভাতা বাড়ানোর চাপ বাড়ছে।

২০১৮ সালের পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো হয়। সে সময় ৮০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে মজুরি ৪৫০০ টাকা বা ৫৬.২৫% বাড়ানো হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বেতন বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবিতে টানা ছয়দিন রাজধানীর উত্তরায় আন্দোলন করে শ্রমিকদের একাংশ। আন্দোলন ঘিরে অস্থিরতায় অন্তত ছয়টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে সরকারের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগের মধ্যেই শিল্পকারখানাগুলোতে অস্থিরতা তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পোশাকশিল্পের মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।

জানা গেছে, শ্রমিক সংগঠনের দাবির মুখে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের নীতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চলতি মাসেই মজুরি বোর্ড গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, শ্রম সচিব মো. আবদুর রহমান তরফদার, তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠনের সম্মতিতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়।

বেতন বাড়ানোর উদ্যোগের মধ্যেই আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন

মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার পরও আন্দোলন অব্যাহত থাকায় প্রশ্ন তুলেছেন পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষের নেতারা। তারা জানান, ৭ অক্টোবর সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তৈরি পোশাক শ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরপর ১২ অক্টোবর আন্দোলন শুরু হয়। ১৭ অক্টোবর আন্দোলনের পঞ্চম দিনে পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয়। শ্রমিকদের দাবি আদায়ের কর্মসূচি ঘিরে সংঘর্ষ, যানজট ও কারখানার কার্যক্রমে বিঘ্ন শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।

গত ১৫ অক্টোবর নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সদস্য চেয়ে আহ্বান করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সেখানে মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধি রাখার কথা জানানো হয়। সরকারের এসব উদ্যোগের পরেও ১৬ ও ১৭ অক্টোবরের আন্দোলনের যৌক্তিকতা ও আন্দোলনকারীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পোশাকশিল্প মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান আমার দেশকে বলেন, সরকার আগেই ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। মালিকপক্ষও এ বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে। আইন অনুযায়ী মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার পরও আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ—দুই সংগঠনই মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। তারা সরকারকে মজুরি বোর্ড গঠন করে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় মজুরি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে বলেছে। মালিকপক্ষ যখন মজুরি বৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে আলোচনা করে বোর্ড গঠনের উদ্যোগে সম্মতি দিয়েছে, তখন আন্দোলন কেন হচ্ছে?

আন্দোলন যৌক্তিক হলেও সরকারের উদ্যোগের পরে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টাকে যড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে গার্মেন্টস ফেডারেশন ঐক্য পরিষদ (জি-ফপ)। সংগঠনটির আহ্বায়ক মির্জা আল শামীম আমার দেশকে বলেন, উত্তরার সাম্প্রতিক ঘটনাকে সাধারণ শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে দেখছি না। কারণ কিছু ব্যক্তি দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে আন্দোলনে ইন্ধন দিচ্ছেন। তার দাবি, আন্দোলনে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ সীমিত ছিল এবং কিছু শ্রমিককে কারখানা থেকে জোর করে নিয়ে এসে রাস্তায় যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

মির্জা আল শামীম বলেন, লাঠিসোটা নিয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হওয়া, মারধর করা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এগুলো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। তার দাবিÑডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফিরে আসা নিয়ে যে গুজব ছড়ানো হয়েছেÑ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসররা সেটাকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করছে। আমার মতে, এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে।

উত্তরায় সংগঠিত সর্বশেষ শ্রমিকের আন্দোলনে বামপন্থি সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন সংশ্লিষ্ট শিল্প মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) সভাপতি মন্টু ঘোষের মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অস্থিরতার মুখে ৬ কারখানা বন্ধ ঘোষণা

শ্রমিকদের আন্দোলন ও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার মধ্যে ছয়টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ওলিও অ্যাপারেলস, ভার্সেটাইল অ্যাপারেল, এমব্রেলা, ডেজলিং ড্রেসেস, নাইস অ্যাপারেল এবং ভার্সেটাইল ফ্যাশন। কারখানাগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কিছু উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে কারখানার অন্য শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে অবৈধভাবে কাজ বন্ধ করে দেয় এবং কারখানা থেকে দলবল নিয়ে বের হয়ে যায়। তাদের স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ সত্ত্বেও যোগদান না করে প্রতিদিনই কর্মস্থল ত্যাগ করে কারখানা থেকে বাইরে চলে যায়। শ্রমিকদের এ ধরনের আচরণকে বেআইনি ধর্মঘটের শামিল উল্লেখ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে বন্ধের দুদিন পরেই ফের পুরোদমে কারখানাগুলো চালু হয়েছে বলে বিজিএমইএর একাধিক সূত্র আমার দেশকে নিশ্চিত করেছে।

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার চাপ

বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা মূল বেতন নির্ধারণের দাবিতে ১২ অক্টোবর থেকে উত্তরায় তৈরি পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হয়। শফিকুল ইসলাম নামের এক শ্রমিক বলেন, বর্তমান মজুরিতে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। রিমন নামের আরেক শ্রমিক বলেন, বেতন না বাড়ানো পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

তবে হঠাৎ করে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি পেলে কারখানার সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় এক লাফে অনেক বেড়ে যাবে, যা বর্তমান সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা আশঙ্কা করছেন, বড় কোম্পানিগুলো আর্থিক চাপ সামলাতে পারলেও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো এই বাড়তি খরচের চাপে টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সে কারণে মালিক-শ্রমিক উভয়পক্ষের জন্য সহনীয় ও যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার কথা বলেছেন বিশ্লেষকরা।

মুখোমুখি সরকার-বিরোধী দল

পোশাক খাতে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় মুখোমুখি অবস্থানে সরকার ও দেশের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। এ ঘটনায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে, তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে। কাদের সাহায্যে করছে? এই যে কতটা দল আছে, যারা ভ্রান্তি ছড়ায় দেশের মধ্যে। তারা বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে। এই দুপক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।’

সরকারপ্রধানের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গণমাধ্যমে বলেন, ‘ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছে আপনার নেটওয়ার্ক। যে গোয়েন্দা বাহিনীর সেটআপ আওয়ামী লীগ রেখে গেছে, যারা নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে জঙ্গি বানিয়ে ক্রসফায়ারে দিয়েছে, রিমান্ডে, আয়নাঘরে নিয়েছে, সেই গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করে আপনি এখন বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপাবেন?’

তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন শ্রমিকদের অবস্থা ভালো নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের অসন্তোষ ও আন্দোলনের জন্য বিরোধী দলকে দায়ী করেন। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি আরো বেশি। মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিকদের দাবি পূরণ করা সরকারের কর্তব্য।

বিপর্যয় ঘটতে পারে ট্রাম্পের

অর্ধেক দামের সরকারি এলপিজি যায় কোথায়

সন্তানের হাতে স্মার্টফোন, বিপদ বাড়ছে অভিভাবকের অজান্তেই

আ.লীগ নিয়ে ঠেলাঠেলি

রহস্যঘেরা মাদক আড্ডায় গ্রেপ্তার ওরা কারা

এমপিদের খুশি করতে বরাদ্দ বাড়ছে ৪০০০ কোটি টাকা

ভুল নীতি দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে, উপেক্ষিত সুপারিশ

সচিবালয়ে ডিজিটাল হাজিরা, তদারকিতে প্রধানমন্ত্রী

অরক্ষিত সড়কে দস্যুদের রাজত্ব

পিএমওর নির্দেশনার পরও গোঁজামিলে ভরা জবাব বিটিআরসির