দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় ২০২৫ সালে বিভিন্ন কারণে মোট ৩০ জনের অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। থানা সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
খানসামা থানার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অপমৃত্যুর ঘটনাগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ-স্পর্শে ২ জন, ফাঁস নিয়ে ৯ জন, পানিতে ডুবে ১১ জন, বিষপানে ৪ জন, আগুনে পুড়ে ১ জন, দেয়াল ধসে ১ জন, যান্ত্রিক মেশিন দুর্ঘটনায় ১ জন এবং একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি মারা গেছেন।
মৃত্যুর ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যার ঘটনায় অধিকাংশই বিবাহিত নারী।
স্থানীয়দের ধারণা, পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য অশান্তি, অভিমান ও মানসিক চাপের কারণে তারা চরম এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এসব ঘটনা সমাজে নারী নিরাপত্তা ও পারিবারিক সুস্থতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রাণ গেছে শিশুদের। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিভাবকদের অসচেতনতা ও পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবই এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পুকুর, খাল ও জলাশয়ের চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
বিষপানে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরীর সংখ্যাও উদ্বেগজনক। আবেগ, হতাশা ও মানসিক অস্থিরতার কারণে তারা এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, কৃষিতে ব্যবহৃত কীটনাশক সহজলভ্য হওয়ায় এই ধরনের মৃত্যুর ঘটনা তুলনামূলক-ভাবে বেশি ঘটছে। কীটনাশকের ব্যবহার ও সংরক্ষণে কঠোরতা না এলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে।
সমাজের সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, আত্মহত্যাসহ অপমৃত্যুর ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; বরং এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক সংকটের প্রতিফলন। পরিবারে পারস্পরিক যোগাযোগের ঘাটতি, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে অবহেলা, সামাজিক চাপ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এসব ঘটনার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের চিরাচরিত সামাজিক ঐক্য, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সংস্কৃতি ধরে রাখতে পারলে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, অপমৃত্যু কখনোই কাম্য নয়। এর পেছনে সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত নানা কারণ কাজ করে। বিষণ্নতা ও মানসিক চাপ থেকে অনেকেই ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এসব ক্ষেত্রে মানসিক সহায়তা ও সাইকোলজিক্যাল সাপোর্ট অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি পারিবারিক নির্যাতনের মতো বিষয়গুলো সামাজিকভাবে সমাধান করতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান সরকার আমার দেশকে জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর অপমৃত্যুর সংখ্যা কমেছে, যা আশাব্যঞ্জক। তবে একটি মৃত্যুও গ্রহণযোগ্য নয়। মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে কাউন্সেলিং, পারিবারিক সচেতনতা ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে এসব ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
খানসামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল বাছেত সরদার আমার দেশকে বলেন, আগের বছরের তুলনায় এবার অপমৃত্যুর ঘটনা অনেকটাই কমেছে। আশা করা হচ্ছে আগামী বছরে এই সংখ্যা আরও কমবে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্ববোধ বাড়াতে হবে। পুলিশ সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এসব ঘটনা প্রতিরোধে কাজ করছে।