যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে ও দুবাইয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচার করে লোকসান ও অর্থনৈতিক সংকট দেখিয়ে অবশেষে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বরিশালভিত্তিক অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেড।
ইসলামী ব্যাংকসহ চারটি ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ এবং কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে সব মূলধন উত্তোলন করে কোম্পানির চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) ও তিন ডিরেক্টর মিলে অবৈধভাবে দুবাই, আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যে পাচার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি ব্যাংক লোন ও প্রতিষ্ঠানের সাড়ে তিন শতাধিক শ্রমিকের বেতন এবং সার্ভিস বেনিফিট বাবদ সাড়ে ৯ কোটি টাকা পরিশোধ না করেই গোপনে কোম্পানিটি স্ক্যান সিমেন্টের কাছে বিক্রি করে দেশছাড়ার পাঁয়তারা করছে বলেও নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
তবে এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পরপরই বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ কোম্পানির কর্মকর্তাদের ডেকে দ্রুত শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। আগামী ১৯ জুনের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন ও সার্ভিস বেনিফিট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতির নিরসন না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানির ৯০টি ট্রাক এবং একটি লাইটার জাহাজ ক্রোকসহ পরিচালকরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, নগরের দক্ষিণপ্রান্ত রূপাতলীর কীর্তনখোলার তীরে অলিম্পিক সিমেন্ট কারখানাটি গড়ে ওঠে। সেখানে প্রায় সাড়ে তিনশ শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কর্মসংস্থান হয়। অলিম্পিক সিমেন্ট কোম্পানি বরিশালের অন্যতম ব্যবসায়ী পরিবার খান সন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। ‘অ্যাঙ্কর সিমেন্ট’ নামে এই কোম্পানির সিমেন্ট বাজারজাত করা হতো। এ প্রতিষ্ঠানের সাবেক এমডি মজিবুর রহমান খানের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হন তার স্ত্রী জুলিয়া রহমান। আর এমডির দায়িত্ব পালন করছেন বড় মেয়ে আনিকা রহমান। তারা দুজনই বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।
আনিকার স্বামী কোম্পানির ডিরেক্টর নুরুল আজিম রিফাত ঢাকায় অবস্থান করছেন। এছাড়া জুলিয়ার মেজ মেয়ে নিভিন রহমান ও ছোট মেয়ে নওশীন রহমান পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। তারা দুজনই আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।
কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানায়, সাবেক এমডি মজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর থেকেই কোম্পানির অর্থ বিদেশে পাচার এবং অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু করেন তারা। বিদেশে প্রতিষ্ঠিত একই নামের কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি ও এলসি লেনদেনে অতিমূল্যায়নের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে শুধু বিদেশে অর্থ পাচারই নয়, কোম্পানির বিরুদ্ধে ৪০ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি ও অতিরিক্ত রেয়াত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে কাগজপত্রসহ অলিম্পিক সিমেন্ট কর্তৃপক্ষকে তলব করেছে কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগ। ইতিমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং ভ্যাট অডিট, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর বিষয়টি আমলে নিয়ে অ্যাঙ্কর সিমেন্টের শুল্ক ফাঁকি, ভ্যাট জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের বিষয়ে নজরদারি ও তদন্ত শুরু করেছে।
অভিযোগ উঠেছে, এমডি আনিকা ও তার স্বামী রিফাত দুবাই, শারজাহ ও নিউইয়র্কে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। অলিম্পিক সিমেন্টের অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে স্থানান্তরে সহায়তা করেছেন প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। অর্থপাচারে সহায়তা করে এসব কর্মকর্তা হয়েছেন কোটিপতি। গড়েছেন নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ।
সূত্র জানায়, গত ৩-৪ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতনভাতা দেওয়া হয়নি। এরই মধ্যে একাধিকবার কর্মচারী ছাঁটাইও করা হয়। তবে গত ১১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানি বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ।
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দাবি করে বলেন, কোম্পানির সংকটের পেছনে শুধু ব্যবসায় লোকসান নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম এবং বিদেশে অর্থপাচার।
তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান জুলিয়া রহমান, এমডি আনিকা ও পরিচালক রিফাত দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন ব্যবসা, আবাসিক খাতে বিনিয়োগ করেছেন। ব্যাংকঋণ, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বকেয়া, ডিলার ও রিটেইলারদের থেকে অতিরিক্ত কমিশন দেওয়ার নামে অগ্রিম টাকা নিয়ে সিমেন্ট না দেওয়া, পাওনাদারদের পাওনা টাকা না দেওয়ার চাপ বাড়তে থাকার কারণেই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে।
এদিকে অলিম্পিক সিমেন্টে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও সার্ভিস বেনিফিট না দিয়েই কোম্পানি বন্ধ করা এবং বিক্রির চেষ্টা নিয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কাছে অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ নিয়ে রোববার বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে কোম্পানির কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে জরুরি বৈঠক হয়।
আর্থিক সংকটে কোম্পানিটি চালু রাখা সম্ভব নয় বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে বৈঠকে জানানো হয়। এ সময় বিভাগীয় কমিশনার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও সার্ভিস বেনিফিট দেওয়ার অনুরোধ করেন। দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়া হলে কোম্পানির ৯০টি ট্রাক ও একটি লাইটার জাহাজ ক্রোকসহ পরিচালকরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান। বিভাগীয় কমিশনারের এমন সিদ্ধান্তের এক ঘণ্টা পরই কোম্পানির এমডি ও পরিচালক আগামী ১৯ জুনের মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাড়ে ৯ কোটি টাকার চেক দেওয়ার আশ্বাস দেন।
এ বিষয়ে কোম্পানির সিইও মেজর (অব.) মো. শাহেদ উদ্দীন আমার দেশকে বলেন, এমডি আগামী ১৯ জুনের মধ্যে সাড়ে তিন শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাড়ে ৯ কোটি টাকার চেক দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এক মাসের মধ্যে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাওনাদি বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ আমার দেশকে বলেন, অলিম্পিক সিমেন্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও সার্ভিস বেনিফিট দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বেতন পরিশোধ না করে কোম্পানিটি যাতে হাতবদল করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানির ৯০টি ট্রাক ও একটি লাইটার জাহাজ ক্রোকসহ পরিচালকরা যাতে দেশ ত্যাগ করতে না পারেন, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।