ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে বিপুল সরকারি অর্থ আত্মসাৎ নিয়ে আমার দেশ-এ সংবাদ প্রকাশের পর জেলাসহ দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তবে সংবাদ প্রকাশের এক সপ্তাহ পরও ডিসির বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় থেকে কোনো তদন্ত কমিটি গঠনের খবর মেলেনি। এমনকি এখনো স্বপদে বহাল তিনি।
এদিকে ডিসির দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করে দেওয়া সন্দেহে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অর্ধডজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বরিশাল জেলা প্রশাসনের শীর্ষ ওই কর্মকর্তাকে ঘিরে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলো নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা নীরবে খোঁজ-খবর ও যাচাই-বাছাই শুরু করেছেন বলেও বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চলছে সুনসান নীরবতা। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী সংবাদকর্মীর সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন না। এদিকে জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে আমার দেশ-এর বরিশাল অফিসের স্টাফ রিপোর্টার নিকুঞ্জ বালা পলাশের বিষয়ে নানান অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে বলেও খবর মিলেছে।
গত বৃহস্পতিবার আমার দেশ-এ বরিশালের ডিসি সুমনের কোটি টাকার দুর্নীতির বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেটি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় ব্যাপক আলোড়ন।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, ডিসির দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশের পর একাধিক সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি সংগ্রহ করেছে। এছাড়া উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের বরিশালে অবস্থান এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে গোপনে কথা বলার বিষয়টিও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ আমার দেশকে বলেন, জেলা প্রশাসক সুমনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর বিভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। এমনকি তার কাছেও এ বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া হচ্ছে।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাই মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।
এদিকে সংবাদ প্রকাশের পর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা আমার দেশ-এর প্রতিবেদকের বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন বলেও খবর মিলছে। এমনকি একটি সংস্থা প্রতিবেদককে তাদের কার্যালয়ে যাওয়ার অনুরোধও করেছে।
অর্ধডজন কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলি
এদিকে ডিসি সুমনের দুর্নীতি ও কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য ফাঁসের অভিযোগে নিজ কার্যালয়ের প্রায় এক ডজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অন্যত্র এবং বিভিন্ন শাখায় বদলি করে দেওয়া হয়েছে। সবশেষ গতকাল বুধবার সকালে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ছয় কর্মচারীকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বদলি করা হয়। এর আগে তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার আশঙ্কায় শুরুতেই পাঁচ কর্মকর্তাকে বদলি করে দেন ডিসি। এ নিয়ে ডিসি কার্যালয়ে অস্থিরতা ও বদলি আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঈদের পাঁচ-ছয় কর্মদিবসের আগে এমন বদলিকে আক্রোশমূলক বদলি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, নির্বাচনকালীন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা রঞ্জন কুমার হালদারকে সাধারণ শাখা থেকে সরিয়ে জুডিশিয়াল মুন্সিখানা শাখায় বদলি করা হয়। এছাড়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) লুজি কান্ত হাজংকে মানবসম্পদ ও উন্নয়ন শাখায় বদলি করা হয়। পথের কাঁটা সরাতে সম্প্রতি তাকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে বদলি করতে ভূমিকা রাখেন ডিসি সুমন। এছাড়াও সহকারী কমিশনার হাসিবুল আজমকে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনে বদলি করা হয়েছে। এডিসি জেনারেল সুফল চন্দ্র গোলদারকে ওএসডি করে মানবসম্পদ শাখায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়। পরে তাকে রেল মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। এছাড়া এনডিসি আশরাফুল ইসলামকে সরিয়ে পাঁচ মাসের ট্রেনিংয়ে পাঠানো হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট সাকলাইনকে এনডিসি থেকে সরিয়ে অন্য শাখায় বদলি করা হয়েছে। এছাড়া সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেটকে কম গুরুত্বপূর্ণ শাখায় সরিয়ে জুনিয়র ম্যাজিস্ট্রেটদের গুরুত্বপূর্ণ শাখায় বদলি করা হয়েছে।
সবশেষ গতকাল অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মাহফুজুর রহমান খানকে বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে অফিস সহকারী হিসেবে, খাদিজা বেগমকে আইসিটি শাখায়, আনিছুর রহমানকে গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে, মহিউদ্দীন খানকে নেজারত শাখায়, সার্টিফিকেট সহকারী সুবেকা সাদেকীনকে বাবুগঞ্জে এবং হিসাব সহকারী শফিকুল ইসলামকে বাকেরগঞ্জে বদলি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ আমার দেশকে বলেন, বদলির বিষয়টি আমার জানা নেই।