হোম > সারা দেশ > বরিশাল

অস্তিত্বের সংকটে পটুয়াখালীর নদী-খাল

স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখল

গোলাম রহমান, পটুয়াখালী

পটুয়াখালী জেলার মহিষকাটা খাল এভাবেই ভরাট হয়ে গেছে। ছবি: আমার দেশ

উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালী একসময় স্রোতস্বিনী নদ-নদী আর খালের জন্য পরিচিত হলেও দিন দিন তা হুমকির মুখে পড়েছে। কাগজে-কলমে অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে এসব নদী ও খালের অধিকাংশই দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে হারিয়ে ফেলেছে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ। একসময় জেলার কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংস্কৃতি নির্ভর করত যে প্রবহমান নদ-নদীর ওপর, তা আজ প্রাকৃতিক ও মানুষের বেপরোয়া নীতির কারণে ভয়াবহ অস্তিত্বসংকটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অপরিকল্পিত বাঁধ ও স্লুইস গেট, সেতু নির্মাণ এবং স্রোতের গতিপথ বদলে যাওয়ার কারণে উজান থেকে পলি পড়ে পটুয়াখালীর নদী ও খালগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শুকিয়ে যাওয়া এসব খাল, নদীর জমি ও তীর দখলের মহোৎসব চলছে। দখল হয়ে যাওয়া এসব নদী-খালের তীরে অবৈধভাবে দোকান, আবাসিক ভবন ও বাজার নির্মাণ করেছে দখলবাজরা। নদী ও খালের এই দুরবস্থার কারণে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীতে মানুষসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে, উপকূলীয় জেলাটির প্রধান নদ-নদী পায়রা, লোহালিয়া, লাউকাঠি, আগুনমুখা, আন্দারমানিক, রামনাবাদ, তেতুলিয়া, পটুয়া, বুড়াগৌরাঙ্গ, গলাচিপা, ভাড়ানি, কালাইয়া, আলগি, ধুলিয়া, শ্রীমন্ত নদীসহ ৪০টি নদী এবং ৯৮৮টি খাল জেলাকে জালের মতো জড়িয়ে রেখেছে। জেলার আট উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৪৩ কিলোমিটার এবং খালের দৈর্ঘ্য এক হাজার ৭৫৪ দশমিক ৬৪ কিলোমিটার।

বাংলাদেশ নদীরক্ষা কমিশনের ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, জেলার নদীতীর ও জমি দখলদারের সংখ্যা ৯৯৯ জন। এর মধ্যে পটুয়াখালী সদরে ৩০১, গলাচিপা উপজেলায় ২৮৯, কলাপাড়ায় ১৮৬, রাঙ্গাবালীতে ৫৫, বাউফলে ১১২ ও মির্জাগঞ্জে ৭৮ জন দখলবাজের কবলে। দখলবাজরা স্থানীয় প্রভাবশালী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে ভূমি অফিসের সঙ্গে যোগসাজশে নামে-বেনামে নদী এবং খালের জায়গা বন্দোবস্ত নিয়ে দখল করছে।

পটুয়াখালীর অন্যতম প্রধান নদী গলাচিপা। নদীটির বিভিন্ন পয়েন্টে প্রশস্ততা ও গভীরতা কমে নেমে এসেছে এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশে। শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকটে নদীটি দিয়ে ভারী ও মাঝারি নৌযান চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শেখাটি ও কলাগাছিয়া পয়েন্টে পানিপ্রবাহ কমে এ সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করে। গলাচিপা পৌরসভা অভ্যন্তরে ও চিকনিকান্দি বাজার-সংলগ্ন এলাকায় নদীটি এখন সংকীর্ণ হয়ে খালের আকার ধারণ করেছে। সংকীর্ণ হয়ে পড়ায় এ এলাকায় ভারী ও মাঝারি নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে এক দশকের বেশি সময় ধরে। আবার নদীর গলাচিপা পৌর এলাকার মধ্যকার অংশটি এখন প্রায় পুরোপুরিই দখলদারদের পেটে।

জেলার গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি নদী লোহালিয়া। পটুয়াখালী শহরের পূর্বদিক দিয়ে বয়ে যাওয়া লোহালিয়া নদীর পটুয়াখালী নদীবন্দরের প্রবেশমুখে চর জেগে ওঠা এবং নাব্য সংকটের কারণে নৌযানগুলো ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। ভাটার সময় নৌযানগুলো চরে আটকে নির্ধারিত সময়ে না পৌঁছায় যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

গলাচিপা ও লোহালিয়া নদীর মতো বাকি নদীগুলোর অবস্থা অনেকটা একই। নদীগুলোর এমন পরিস্থিতির জন্য পানিপ্রবাহ হ্রাস ও পলিপ্রবাহ বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করছে বিআইডব্লিউটিএ। পানিপ্রবাহ হ্রাস ও পলি পড়ে নদীগুলোতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ডুবোচর। তাই কঠিন হয়ে পড়েছে নৌচলাচল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা শহরের কোল ঘেঁষে লাউকাঠি নদী থেকে উৎপত্তি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত লাউকাঠি-মউকরন খালটি আজ মৃতপ্রায়। একসময় এই খালে নৌকা চলাচল করত। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর খালটি খননের জন্য উদ্বোধন করেন। খালের উৎসমুখে অপরিকল্পিতভাবে স্লুইসগেট নির্মাণ করার ফলে বর্তমানে খালটি মৃতপ্রায়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্লুইসগেট দেওয়ার কারণে লাউকাঠি-মউকরন খালটি আজ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।

জেলার ৪০টি নদী থেকে উৎপত্তি হওয়া খাল একসময় সেচ, পানি নিষ্কাশন ও নৌযোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। পাশাপাশি গ্রামের সঙ্গে গ্রামের সরাসরি নৌযোগাযোগ ছিল এসব খালকে কেন্দ্র করেই। দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বাউফল উপজেলার কালাইয়া বাজার ও গলাচিপা উপজেলার উলানিয়া বাজারে নৌকা এবং ট্রলারের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনও করা হতো এসব খালপথে। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ খালে নেই স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, নেই নৌচলাচলও।

নদী ও খালতীরবর্তী স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করেন, জেলার ঐতিহ্যবাহী নদী ও খালের বেশিরভাগ অংশ দখল করা হয়েছে। জাল কাগজপত্র আদালতে দাখিল করে ডিক্রি নিয়ে নদী ও তীর দখল করেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। নদী ও খালের মাটি কেটে তীর ভরাট করে দোকানপাট, মসজিদ, মাদরাসা নির্মাণ করা হয়েছে। অনেক স্থানে অপরিকল্পিত বাঁধ ও কালভার্ট নির্মাণের ফলে খালে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে এসব খালের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতায় প্লাবিত হয়। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা পড়েন তীব্র সেচ সংকটে। এতে জেলার হাজার হাজার একর ফসলি জমি ধীরে ধীরে উর্বরতা হারাচ্ছে।

স্থানীয়দের মতে, দ্রুত এসব নদী ও খালের তালিকা প্রণয়ন, দখলমুক্ত করা এবং পুনঃখনন কার্যক্রম শুরু না করলে অদূর ভবিষ্যতে জেলার মানচিত্র থেকে ঐতিহ্যবাহী এসব নদী ও খাল হারিয়ে যাবে।

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, আমাদের উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীতে ৪০টি নদী ও অসংখ্য খাল রয়েছে। বর্ষায় উজান থেকে প্রচুর পরিমাণ পলি আসার কারণে নদী ও খালগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে খাল খনন প্রয়োজন। আমরা খালগুলো সার্ভে করে তালিকা প্রস্তুত করছি। যেগুলো বেশি দরকার, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খনন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। খালগুলো খনন করা সম্ভব হলে কৃষিকাজ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি সাধন হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক ড. শহীদ হোসেন চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে খননের জন্য জেলায় ৮১টি খাল চিহ্নিত করেছি। এসব খালের তীরে অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। খালগুলো খনন করা হলে পানিপ্রবাহ বাড়লে নদীর নাব্য বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া নদীর নাব্য বৃদ্ধিতে ড্রেজিংয়ের কাজ চলছে। নদীতীর ও জমিতে অবৈধ দখল উচ্ছেদে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি।

আ.লীগের সাবেক এমপি ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনের ইন্তেকাল

সরকারি দল জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে : মিয়া গোলাম পরওয়ার

বিএনপি কাঁটা গিলতেও পারে না ফেলতেও পারে না

মির্জাগঞ্জে বিরোধপূর্ণ জমিতে ঘর নির্মাণের অভিযোগ

বরিশালে ফরচুন সুজে চার মাস ধরে বেতন বন্ধ, মেলেনি ঈদ বোনাস

মাদকবিরোধী অভিযানে ডিবি পুলিশের উপর শ্রমিকদল নেতার হামলা, আটক ৪

বরগুনায় কোটি টাকার রেণু জব্দ, বিষখালীতে অবমুক্ত

নেছারাবাদে কাঠবোঝাই ট্রলার ডুবি, মাঝির লাশ উদ্ধার

কাউখালীর ‘জমিদার’-এর দাম ছয় লাখ টাকা

দেশসেবায় নবীন নাবিকদের আত্মনিয়োগের আহ্বান নৌপ্রধানের