চট্টগ্রাম নগরীতে, সন্ত্রাস দমন, মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জুয়া ও কিশোরগ্যাং কার্যক্রম দমনে বিশেষ অভিযান ‘এস ড্রাইভ’ শুরু করেছে পুলিশ । গত রোববার রাত ১২টার দিকে সিএমপি একযোগে এ অভিযান পরিচালনা করে। এর আগে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সংবাদ সম্মেলন ডেকে অভিযানের ঘোষণা দেয় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত এমন সমন্বিত অভিযান হয় হঠাৎ, চমক হিসেবে; যাতে অপরাধীদের পালানোর সুযোগ না থাকে। কিন্তু সিএমপি যখন আগেই ঘোষণা দিয়ে অভিযান চালায়, তখন তা অভিযানের গোপনীয়তা ও কার্যকারিতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। এ কারণে এ অভিযান নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে ।
অভিযানের পর সিএমপির সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, উদ্ধার হয়েছে কিছু দেশীয় অস্ত্র-একটি মরচেপড়া এলজি, কয়েকটি ছোরা, শটগানের কিছু কার্তুজ আর সাড়ে ৪০০ ইয়াবা। অথচ এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা ২০ রাউন্ড গুলি চালায়। তারা এসেছে ভারী অস্ত্র নিয়ে, পুলিশের পাহারা ডিঙিয়ে। অথচ সে সন্ত্রাসীদের কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। এছাড়া বড় অপরাধী বা সশস্ত্র গ্যাংয়ের একজন সদস্যও ধরা পড়েনি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, উদ্ধার করা অস্ত্রের তালিকা আর বাস্তব হামলার ভয়াবহতার তুলনা করলে সহজেই বোঝা যায়, এ অভিযান প্রকৃত অপরাধীদের ধরার বদলে ‘উপস্থিতি জানানোর’ এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
তারা বলছেন, অভিযান কোথায় হবে, কীভাবে হবে- এসবও ছিল অনেকটা খোলামেলা। শহরের বিভিন্ন থানা এলাকায় পুলিশের তৎপরতা আগেই টের পেয়েছে স্থানীয়রা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি যখন চরমে, তখন অপরাধ দমনে গোয়েন্দা নজরদারি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পুলিশি তৎপরতায় সেই গোয়েন্দা তথ্যের ছাপ কোথাও পাওয়া যায়নি।
তাদের মতে, যে গ্যাং ভারী অস্ত্র নিয়ে শহরের ব্যবসায়ীর বাসায় ২০ রাউন্ড গুলি চালাতে পারে, তাদের গতিবিধি বা নেটওয়ার্ক সম্পর্কে পুলিশের কোনো পূর্বাভাসই ছিল না- এটাই প্রমাণ করে গোয়েন্দা নজরদারির দুর্বলতা।
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী দাবি করেন, অপরাধীরা যাতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালাতে না পারে, সে কারণেই একযোগে অভিযান চালানো হয়। তার এ বক্তব্য উল্টো প্রশ্ন তোলে যদি গোয়েন্দা নজরদারি এত শক্তিশালী হতো, তাহলে হামলার আগেই কেন সন্ত্রাসীদের গতিবিধি পুলিশ টের পেল না? তিনি একদিকে ঘটনাটিকে ‘বিচ্ছিন্ন’ বলে উল্লেখ করেন, অন্যদিকে স্বীকার করেন, গুলিবর্ষণের পর নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, আরো বড় প্রশ্ন ওঠে তার সেই মন্তব্যে, যেখানে তিনি বলেন, অপরাধীরা ‘শহরের বাইরে পাহাড়ি এলাকায়’ অবস্থান করছে। শহরের ভেতর লুকানো অস্ত্রের বহু স্পট পুলিশ শনাক্ত করেছে। যদি সত্যিই অপরাধীদের অবস্থান, অস্ত্রের জায়গা এবং নেটওয়ার্ক সম্পর্কে এত বিস্তারিত তথ্য পুলিশের কাছে আগে থেকেই থাকে, তাহলে হামলার আগে কেন তাদের গ্রেপ্তার করা হলো না?
সিএমপি কর্মকর্তা দাবি করেন, সন্ত্রাসীরা শহরের ভেতরেই অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে, বাইরে থেকে আনেনি। কারণ চেকপোস্ট আছে। তাদের এ ব্যাখ্যাও প্রশ্নবিদ্ধ বলেছে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। কারণ চেকপোস্ট থাকার অর্থই হলো পুলিশের নজরদারি কঠোর, অথচ সন্ত্রাসীরা ভারী অস্ত্রসহ গুলি চালিয়ে চলে গেল, কারো চোখে পড়ল না। এটি স্পষ্ট করে, চেকপোস্ট থাকা সত্ত্বেও সন্ত্রাসীরা শহরে নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পেরেছে, যা চেকপোস্টের কার্যকারিতা ও গোয়েন্দা তথ্যের মান নিয়ে বড় প্রশ্ন।