চট্টগ্রামের আদালত চত্ত্বরে এডভোকেট সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় বিতর্কিত ধর্মীয় সংগঠন ইসকনের বহিস্কৃত নেতা ও সনাতনী জাগরন জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ওরফে চন্দন ধরসহ ৩৯ আসামীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠন হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু হলো।
সোমবার সকালে চট্টগ্রাম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাহিদুল হকের আদালত এই চার্জ গঠন করেন।
এর আগে কড়া নিরাপত্ত্বার মধ্য দিয়ে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ গ্রেফতার ২৩ আসামীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। চিন্ময়কে আদালতে হাজির করাকে কেন্দ্র করে ভোর রাত থেকে পুরো আদালত চত্ত্বর ঘিরে ফেলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বিচার প্রার্থী ও আইনজীবী ছাড়া সাধারণ মানুষকে আদালতে প্রবেশে করাকরি করে পুলিশ।
আদালতের কাজ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কড়া নিরাপত্ত্বার মধ্য দিয়ে চিন্ময়সহ গ্রেফতার আসামীদের হাজির করা হয় আদালতে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিচারক মোঃ জাহিদুল হক মামলার এজাহার, চার্জশিট, সিসিটিভি ফুটেজ, সাক্ষীদের জবানবন্দি, জব্দকৃত আলামত, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টসহ সকল প্রমাণ পর্যালোচনা করে চার্জ গঠনের আদেশ দেন।
এসময় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পক্ষে একজন আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। পলাতক ১৬ আসামির পক্ষে একজন আইনজীবী ছিলেন। কারাগারে থাকা ২২ আসামির পক্ষে লিগ্যাল এইড অফিস থেকে আগামী ধার্য তারিখে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হবে। ২ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী তারিখ ধার্য করা হয়েছে। শুনানী চলাকালে আত্মপক্ষ সমর্থন করে প্রায় ২৫ মিনিট বক্তব্য দেন চিন্ময়। নিজেকে নির্দোশ দাবি করে তিনি বলেন, আলিফ হত্যাকাণ্ডের একদিন আগে ঢাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আজ পর্যন্ত তিনি পুলিশ ও কারা হেফাজতে আছেন। রাষ্ট্রিয় হেফাজতে থাকা ব্যাক্তি কোন হত্যার ঘটনায় নেতৃত্ব দিতে পারেন না বলে দাবি করেন বিতর্কিত এই ধর্মীয় নেতা।
বিপরীতে বাদী পক্ষের আইনজীবী ও সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী জানান, ঘটনার দিন আদালত চত্ত্বরে চিন্ময়দাশকে বহনকরা প্রিজন ভ্যানটি তার অনুসারিরা মব তৈরী করে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রনে রাখে। প্রিজন ভ্যান থেকেই পুলিশের কাছ থেকে কেরে নেয়া হ্যান্ড মাইকে বক্তব্য রাখেন চিন্ময় এবং সমর্থকদের উত্তেজিত করে তোলেন। এরপরই রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আলিফের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে।
এই মামলার ১৬ জন আসামি এখনো পলাতক রয়েছে। চার্জশিটে আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- চন্দন দাশ মেথর, রিপন দাশ, রাজীব ভট্টাচার্য্য, শুভ কান্তি দাশ, আমান দাশ, বুঞ্জা, রনব, বিধান, বিকাশ, রমিত প্রকাশ দাস, রুমিত দাস, নয়ন দাশ, ওমকার দাশ, বিশাল, লালা দাশ, সামীর, সোহেল দাশ, শিব কুমার, বিগলাল, পরাশ, গণেশ, ওম দাস, পপি, অজয়, দেবী চরণ, দেব, জয়, লালা মেথর, দুর্লভ দাস, সুমিত দাশ, সনু দাস, সকু দাস, ভাজন, আশিক, শাহিত, শিবা দাস ও দ্বীপ দাস।
জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর নির্যাতন চলছে দাবি করে দেশব্যাপী আন্দলন শুরু করে ইসকনের বহিস্কৃত নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ। একই সঙ্গে ভারতীয় মিডিয়ায় মিথ্যা অপপ্রচার করে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমুর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে। একপর্যায়ে চট্টগ্রামের লালদিঘী মাঠে সমাবেশ থেকে জাতীয় পতাকাও ওপর গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে পতাকার অবমাননা করে চিন্ময়ের অনুসারিরা। এই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়।
ওই মামলায় গত ২৫ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে রাজধানী ঢাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন চট্টগ্রামের আদালতে হাজির করা হলে জামিন নামঞ্জুর করে আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত। কিন্তু আদালতের নির্দেশের বিরুদ্ধে তার অনুসারীরা আদালত চত্ত্বরে ব্যাপক বিক্ষোভ করতে থাকে। চিন্ময়কে বহন করা প্রিজনভ্যান ঘিরে ফেলে তারা। সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রিজনভ্যান আটকে বিক্ষোভ করে।
এসময় প্রিজন ভ্যানের ভেতর থেকেই হ্যান্ড মাইকে একাধিকবার বক্তব্য দেন চিন্ময়। এর পরপরই রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট সাইফুল ইসলাম আলিফের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসহ বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে তাকে নির্মমভাবে আঘাত করা হলে গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান।