আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি

দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা চট্টগ্রামের হাজারো প্রবাসীর

ওচমান জাহাঙ্গীর, চট্টগ্রাম

দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা চট্টগ্রামের হাজারো প্রবাসীর

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে চট্টগ্রামের প্রবাসী পরিবারগুলোতে। তাদের মনে দুশ্চিন্তার ছাপ। বাহরাইনে সন্দ্বীপের এক প্রবাসীর মৃত্যুর পর তাদের মধ্যে উদ্বেগ আরো বেড়েছে। একের পর এক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ঈদুল ফিতরে দেশে ফেরা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি। আবার কেউ কেউ ছুটিতে দেশে এসে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না, অনেকে বিদেশে গিয়ে ফিরতে পারছেন না। ফলে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা, চাকরি হারানোর ঝুঁকি এবং বাড়তি আর্থিক চাপ নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন অনেকেই।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইরানে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হচ্ছে। বিমান চলাচল সীমিত হয়ে যাওয়ায় বিমানবন্দরগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। প্রতিদিনই অসংখ্য যাত্রী বিমানবন্দরে এসে শুনছেন, তাদের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে বা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। ফলে কেউ নতুন করে টিকিট পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন, কেউ আবার অপেক্ষা করছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার।

বিজ্ঞাপন

সাধারণত প্রতিবছর রমজান ও ঈদ কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী ছুটি নিয়ে দেশে আসেন, পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করেন। কিন্তু এবার ফ্লাইট বাতিল ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই টিকিট থাকা সত্ত্বেও দেশে ফিরতে পারছেন না।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত ফটিকছড়ির দাতমারা এলাকার প্রবাসী মো. রহিম মোবাইলফোনে জানান, ঈদের আগেই তিনি দেশে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন। আগে থেকেই টিকিট কেটে রেখেছিলেন এবং পরিবারের জন্য কেনাকাটাও শেষ করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধপরিস্থিতিতে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।

বাঁশখালীর প্রবাসী সাইদুল বলেন, ‘প্রতিবছর ঈদের সময় দেশে আসি। কিন্তু এবার সব প্রস্তুতি থাকার পরও ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেছে। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করা হবে কি না তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় আছি।’

প্রবাসীদের পরিবারগুলোও একইভাবে হতাশা ও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। অনেক পরিবারের সদস্যরা বলছেন, বছরের সবচেয়ে আনন্দের সময় ঈদে প্রিয়জনকে পাশে না পাওয়ার কষ্ট এবার আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।

দেশে এসে আটকা অনেক প্রবাসী

চট্টগ্রাম নগরীর প্রবাসী মঞ্জুর আলম ৬ মাসের ছুটিতে দেশে এসে পরিবারের সঙ্গে কিছুটা নিশ্চিন্ত সময় কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। দুবাইয়ে কর্মরত এই প্রবাসীর ফেরার তারিখ ছিল ২৫ মার্চ। টিকিট কাটা থেকে শুরু করে সব প্রস্তুতিও শেষ হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হতে থাকে। এখন তিনি দুবাই ফিরে কর্মস্থলে যোগদান দিতে পারছেন না। এ নিয়ে তিনি নানা আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন ।

তিনি বলেন, ‘কোম্পানিতে সময়মতো না ফিরতে পারলে সমস্যা হবে। বারবার ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।’

একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েছেন সাতকানিয়ার প্রবাসী মো. বাদশাও। ছয় মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন তিনিও। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি থাকলেও তিনি কর্মস্থলে ফিরতে চান। সহকর্মীদের কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে হামলা খুব একটা হচ্ছে না। মূলত সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটি লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বিমান চলাচল স্বাভাবিক হলেই আবার কর্মস্থলে ফিরে যাব। কিন্তু কখন ফ্লাইট চালু হবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।’

বিদেশে আটকা পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা

বিদেশে বেড়াতে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি পর্যটক এবং ব্যবসায়ীও বিপাকে পড়েছেন। অনেকের হোটেল বুকিং শেষ হয়ে আসছে, পকেটের টাকাও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শহরে আটকা পড়া কয়েকজন পর্যটক জানিয়েছেন, প্রতিদিন ফ্লাইট বাতিলের খবর আসছে। ফলে দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি পাচ্ছেন না তারা। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত খরচে হোটেলে থাকতে হচ্ছে। কেউ কেউ পরিচিতদের বাসায় আশ্রয় নিচ্ছেন। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

পাঁচদিনে বাতিল ২২৩ ফ্লাইট

যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে গত পাঁচদিনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর হয়ে মধ্যপ্রাচ্যগামী এবং আগত মোট ২২৩টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১৭৩টি এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৫০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। গত দুদিনেই চট্টগ্রাম থেকে ১৫টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।

সূত্র জানায়, দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ ও দোহা অঞ্চলের আকাশসীমা আংশিকভাবে বন্ধ থাকা এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে অনেক এয়ারলাইনস সাময়িকভাবে ফ্লাইট স্থগিত করেছে।

বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এয়ার আরাবিয়ার একাধিক ফ্লাইট।

তবে সীমিত আকারে কিছু ফ্লাইট চলাচল করছে। মাস্কাট থেকে সালাম এয়ারের একটি ফ্লাইট চট্টগ্রামে এসে যাত্রী নিয়ে ফিরে গেছে। মদিনা ও মাস্কাট থেকেও কয়েকটি ফ্লাইট ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবতরণ করেছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে কেবল সৌদি আরব ও ওমানের সঙ্গে সীমিত ফ্লাইট চলাচল চালু রয়েছে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পুরো অঞ্চলের আকাশপথ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ফলে ফ্লাইট চলাচল কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

রেমিট্যান্স আয়ে বাড়ছে চাপ

অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ২৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। এই অঞ্চলের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ ব্যাহত হলে শ্রমবাজারে নতুন কর্মীদের যাওয়া যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনি ছুটিতে থাকা কর্মীদেরও সময়মতো কাজে ফিরতে সমস্যা হয়।

এতে প্রবাসী শ্রমিকদের চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহেও সাময়িক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন