কাঁচামাল সংকটে টানা ২৪ দিন বন্ধ থাকার পর ফের পুরোদমে চালু হয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি। গতকাল শুক্রবার সকালে প্রধান প্লান্টটি আনুষ্ঠানিকভাবে উৎপাদনে যায়। এর আগে ভোরে রিজার্ভার থেকে অপরিশোধিত তেল প্লান্টে সরবরাহ শুরু হয়। প্রথমদিকে দৈনিক চার হাজার টন জ্বালানি তেল পরিশোধন করা হবে। সক্ষমতা বাড়িয়ে আজ শনিবার বিকাল থেকে সাড়ে ৪ হাজার টন জ্বালানি তেল পরিশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানায়, গত ১৪ এপ্রিল কাঁচামাল সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায় রাষ্ট্রীয় এই পরিশোধনাগারের প্রধান তিনটি ইউনিট। ডেড স্টকে থাকা কাঁচামাল ব্যবহার করে ছোট একটি ইউনিট চালু রাখা হয়েছিল। ওই ইউনিট থেকে দৈনিক ১২০ টন ডিজেল ও ১০০ টন পেট্রোল জাতীয় তেল সরবরাহ করা হচ্ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের প্রচলিত উৎস। পরে বিকল্প নৌরুট ব্যবহার করে ক্রুড অয়েল আনার উদ্যোগ নেয় সরকার। গত বুধবার দুপুরে সৌদি আরব থেকে ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে কুতুবদিয়া চ্যানেলে নোঙ্গর করে মাদার ট্যাংকার এমটি নিনেমিয়া। কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ওই রাতেই লাইটারিংয়ের মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারির ডিপোতে ক্রুড অয়েল আনা শুরু হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুর থেকেই বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিটগুলো চালু করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত জানান, ১৪ এপ্রিল থেকে কাঁচামাল সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ ছিল। প্লান্ট বন্ধ থাকার সময়ে মেশিনারিজ মেইনটেনেন্স করা হয়েছে। তাই সময়টি অপচয় হয়নি। এখন ক্রুড আসার পর পুরোদমে উৎপাদন শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শুক্রবার সকালে প্রধান ইউনিটটি চালু করা হয়েছে। শনিবারের মধ্যে আরো দুটি ইউনিট পর্যায়ক্রমে চালু হবে। একটা ইউনিট অন্য ইউনিটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। নির্ধারিত সময় পর অটোমেটিক ওই দুটি ইউনিট চালু হবে। এখন দৈনিক চার থেকে সাড়ে চার হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল বিপিসির বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
বিপিসি সূত্র জানায়, সাধারণত প্রতি মাসে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল প্রয়োজন হয়। সবশেষ গত ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি পার্সেল আসে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর কোনো ক্রুডবাহী জাহাজ আসেনি। গত ২ মার্চ থেকে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকে আছে এক লাখ টন ক্রুড ভর্তি নর্ডিক পোলাক্স। আমেরিকার পতাকাবাহী জাহাজ হওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে হামলার ভয়ে নোঙর তোলেনি ট্যাংকারটি। গত ২২ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবল দানা বন্দর থেকে আরো এক লাখ টন ক্রুড নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা ছিল ওমেরা গ্যালাক্সি নামের আরো একটি ট্যাংকারের। কিন্তু মালিক পক্ষের অনীহার কারণে ওই জাহাজটিরও সিডিউল বাতিল করা হয়।
বাধ্য হয়ে বিকল্প পথের সন্ধান করে হরমুজ এড়িয়ে জ্বালানি আনতে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরকে বেছে নেওয়া হয়। ইয়ানবু বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার পর গত ২০ এপ্রিল ভাড়া করা ট্যাংকার এমটি নিনেমিয়াকে পাঠানো হয় সেখানে। এক লাখ টন ক্রুড লোড করার পর ২২ এপ্রিল সেখান থেকে নোঙর তোলে জাহাজটি। ১৩ দিনের সমুদ্র যাত্রা শেষে গত বুধবার সকালে জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে।
বিকল্প উৎস ও মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ বিশ্লেষকদের
ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক ও আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম জানান, এ রিফাইনারির প্লান্টগুলো শুধু মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিশোধন করতে পারে। এতদিনেও অন্য দেশের ক্রুড পরিশোধন করার সক্ষমতা অর্জন করতে না পারাটা দুঃখজনক। বিষয়টি এবার হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে সবাই। তাই যত দ্রুত সম্ভব রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশের ক্রুড পরিশোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক রিফাইনারি গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ মজুত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে ছয় লাখ টন জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা আছে বাংলাদেশের। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সক্ষমতা ১৬ লাখ টনে উন্নীত করতে হবে। এছাড়া মহেশখালীর এসপিএম প্রকল্পটি আর কালবিলম্ব না করে অপারেশনে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এটি চালু থাকলে হয়তো বুধবার থেকেই রিফাইনারি চালু করা সম্ভব হতো। বর্তমান সংকটের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকার আরো উদ্যোগী হবে— এমনটিই প্রত্যাশা করেন মনজারে খোরশেদ আলম।