চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ ও সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকাটি দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগের নাম জঙ্গল সলিমপুর; অন্য অংশ আলীনগর হলেও পুরো এলাকাটি সবার কাছে জঙ্গল সলিমপুর নামেই পরিচিত।
তিন হাজার ১০০ একর খাসজমিসহ এলাকাটির আয়তন প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর। পুরোটায় একসময় ছোট-বড় পাহাড় ও টিলায় পরিপূর্ণ ছিল। নব্বইয়ের দশক থেকে সরকারি খাসজমিতে বসবাস শুরু হয়।
চার দশকে চারপাশের বড় পাহাড় ছাড়া ভেতরে অর্ধশতাধিক পাহাড় কেটে সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। টোকেনের মাধ্যমে সরকারি জমি প্লট আকারে বিক্রি করে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। চারপাশের পাহাড়গুলো অক্ষত রাখা হয়েছে এলাকাটির দুর্গম চরিত্র ধরে রাখার জন্য। ভেতরে নিম্ন আয়ের মানুষের ঘনবসতির আড়ালে গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। একেক সময় একেক সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটিকে।
এতদিন এলাকাটি যেন ছিল দেশের ভেতর আরেক দেশ। কারণ, এ এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছিল সন্ত্রাসীদের হাতে। প্রশাসনের সদস্যরাও এখানে অভিযান চালাতে চাইলে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সমন্বয় করে আসতে হতো। এর ব্যত্যয় ঘটায় সম্প্রতি সন্ত্রাসীদের হামলায় এক র্যাব সদস্য নিহত পর্যন্ত হয়েছেন।
তবে হালে সেই অবস্থায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। গত ৯ মার্চ ভোরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় চার হাজার সদস্য একাট্টা হয়ে অভিযান চালায় জঙ্গল সলিমপুর এলাকায়। বিপুল অস্ত্রসহ ১৫ সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়। তবে সলিমপুরের অধিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিনসহ তার প্রধান সহযোগীরা অভিযান শুরুর আগেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। দিনভর সাঁড়াশি অভিযান শেষে প্রথমবারের মতো জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে আলাদা দুটি ক্যাম্প স্থাপন করেছে র্যাব ও পুলিশ।
অভিযানের পর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন জানান, সলিমপুরে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এলাকাটি আর কখনো সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে যাবে না। কিন্তু প্রশাসনের এই আশ্বাসে আস্থা নেই এখানকার সাধারণ নিম্ন আয়ের মানুষের। পাহাড় নিয়ে কাজ করা পরিবেশকর্মীরাও বলেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান চললেও সেখানকার দখলদাররা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। কারণ, সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে তোলা কয়েক হাজার স্থাপনা এখনো রয়েছে অক্ষত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে পুরো এলাকাটি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে না পারলে সন্ত্রাসীদের আস্তানা চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব হবে না। দখলদারদের স্থাপনা অক্ষত থাকলে পলাতক সন্ত্রাসীরা কয়েকদিন পর ফিরে এসে রাজত্বের নিয়ন্ত্রণ নেবে।
যেভাবে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য জঙ্গল সলিমপুর
গত চার দশক ধরে জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড় কেটে গড়ে তোলা অবৈধ বসতি ও প্লটবাণিজ্যের মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি খাসজমি দখল করে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা দুটি বড় আবাসিক এলাকায় হাজার হাজার প্লট বিক্রির মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। যার বড় অংশ ব্যয় হয়েছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, প্রভাব বিস্তার ও বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করতে।
স্থানীয়রা জানান, নব্বইয়ের দশকে আলী আক্কাস নামে এক ব্যক্তির হাত ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড় কাটা ও দখলদারিত্বের শুরু। পেশায় বনপ্রহরী আলী আক্কাসের বিরুদ্ধেও রয়েছে সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ। আর এ অভিযোগেই কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হন তিনি।
আলী আক্কাসই প্রথম পাহাড় দখল করে প্লট বিক্রি শুরু করেন। শুরুতে নামমাত্র টাকায় ২৫ ফুট দৈর্ঘ্য আর ৩৫ ফুট প্রস্থের প্লট বিক্রি করা হতো নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে। দরিদ্র মানুষরা কম টাকায় বসবাসের সুযোগ খুঁজতে দুর্গম এলাকাটিতে বসবাস শুরু করেন। ধীরে ধীরে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয় বিশাল দুটি আবাসিক এলাকা। ধারণা করা হয়, প্রায় ২৫ হাজার পরিবারের লক্ষাধিক সদস্য বসবাস করেন দুর্গম এই অবৈধ নগরীতে। বাসিন্দাদের কাছ থেকে তোলা টাকায় এখানে গড়ে উঠেছে রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, স্কুল, ব্যাংক, বীমা, মসজিদ, মন্দিরসহ সব ধরনের স্থাপনা। বিদ্যুৎ-পানির লাইনও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন নামে-বেনামে।
র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আলী আক্কাস নিহত হলে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় তার সহযোগীরা। কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার, গাজী সাদেক, লাল বাদশা, রোকন মেম্বারসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীরা গড়ে তোলে আলাদা গ্রুপ। চব্বিশের ৫ আগস্টের আগে সলিমপুর অংশের নিয়ন্ত্রণ করতেন কাজী মশিউর। আর আলীনগর এলাকার অধিপতি ছিলেন ইয়াছিন। সলিমপুর অংশের প্রাতিষ্ঠানিক নাম ছিল চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ। আর আলীনগর অংশ নিয়ন্ত্রিত হতো আলীনগর সমবায় সমিতির নামে। জুলাই বিপ্লবের পর মশিউর পালিয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেন ইয়াসিন। আধিপত্য নিয়ে রোকন মেম্বারের সঙ্গে ইয়াসিন বাহিনীর কয়েক দফা সংঘর্ষে গত দেড় বছরে অন্তত পাঁচজন নিহতও হয়েছেন। এছাড়া অভিযানে গিয়ে ইয়াসিন বাহিনীর হামলায় নিহত হন র্যাব সদস্য মোতালেব হোসেন ভুঁইয়া। ওই হামলায় আরো তিনজন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন।
ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ৩৩টি পাহাড় কেটে প্রায় ১৩ হাজার ৯০০ প্লট তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে আলীনগর এলাকায় ছোট-বড় অন্তত ২০টি পাহাড় কেটে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্লট তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি প্লট ৭-১২ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
ভূমি অফিসের জরিপ অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় অর্ধশতাধিক পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৩০টির এখন কোনো অস্তিত্বই নেই। পাহাড় কাটার জন্য সেখানে টোকেন পদ্ধতিও চালু ছিল। প্রতিদিন নির্দিষ্ট অর্থ দিয়ে টোকেন সংগ্রহ করলে পাহাড় কাটার অনুমতি দেওয়া হতো।
স্থানীয়রা জানান, কম দামে শহর-সংলগ্ন প্লটের মালিক হওয়ার দেখিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে এই বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে দলিল আকারে প্লট বিক্রির প্রথা চালু রয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, শুধু প্লট বিক্রিই নয়, কথিত প্লট মালিকদের পাহাড় কাটার অনুমতি, কাটা মাটি বিক্রি, নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ, শ্রমিক সরবরাহ এবং পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগের মতো নানা উপায়ে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা চাঁদা তোলা হতো বাসিন্দাদের জিম্মি করে। ঠিক কত টাকা এখান থেকে আদায় করা হয় কিংবা কত টাকার সম্পদ এখানে আছে, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই কারো কাছে। তবে ২০১৮ সালে সীতাকুণ্ড ভূমি অফিস একবার পরিসংখ্যান করে জানিয়েছিল, জঙ্গল সলিমপুরে ৬০০ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি সম্পত্তি ভূমিদস্যুরা দখল করে রেখেছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৪০ বছর ধরে শুধু সরকারি প্লট হাতবদল করেই কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে এই এলাকাটিকে কেন্দ্র করে। কারণ, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে টিকতে না পেরে অনেকে দখলস্বত্ব বিক্রি করে চলে গেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ইস্যুকে কেন্দ্র করে অনেক পরিবারকে উচ্ছেদ করে তাদের দখলে থাকা প্লট অন্যের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে সরকারি পাহাড় ধ্বংস করে কয়েক হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে।
প্রশাসনের উদ্যোগ
প্রথমবার ২০২২ সালে জঙ্গল সলিমপুরের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে জেলা প্রশাসন। এখানকার খাসজমিতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র, আর্মি স্টেডিয়াম, হাসপাতাল, স্পোর্টস ভিলেজ, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আইকনিক মসজিদ, ইকো পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা করার পরিকল্পনাও নেয় জেলা প্রশাসন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে একাধিকবার বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়। কিন্তু দুর্গম এলাকার বাসিন্দা ও সন্ত্রাসীদের বাধার মুখে তা সম্ভব হয়নি।
গত ৯ মার্চ যৌথবাহিনীর ব্যাপক অপারেশনের পর সলিমপুর নিয়ে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন জানান, একাধিকবার জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেহেতু ওখানে আমাদের কোনো কিছু বাস্তবায়ন করার মতো অবস্থা ছিল না, সেহেতু প্রকল্পগুলো নিয়ে আমরা অগ্রসর হতে পারিনি। তবে আমরা এখন মনে করছি, প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা হবে না। তাই আগের পরিকল্পনাগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।