হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

রাউজানে ২১ মাসে ২৩ খুন ১৯টিই রাজনৈতিক

সোহাগ কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম ও আরাফাত হোসেন, রাউজান

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় একদিনের ব্যবধানে গত রোববার রাতে নাছির উদ্দিন নামে এক যুবদলকর্মীকে গুলি করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। এর আগে শুক্রবার রাতে বিএনপিকর্মী প্রবাসফেরত কাউসারুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

শুধু এ দুটি হত্যাকাণ্ডই নয়, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে দুই মাসে চারটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ২১ মাসে মোট ২৩টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে শুধু এ উপজেলাতেই। এর মধ্যে ১৯টিই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে জানা গেছে। হত্যাকাণ্ডের শিকার বেশিরভাগই বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী।

স্থানীয়রা জানায়, গত দেড় বছর ধরে সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত হয়েছে রাউজান। প্রায় ঘরে ঘরে রয়েছে অবৈধ অস্ত্র। পুরোনো সন্ত্রাসীরা আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোতে চাইছে উঠতি সন্ত্রাসীরা। ফলে পান থেকে চুন খসলেই হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। এসব সন্ত্রাসীকে নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক উদ্যোগ নেই বললেই চলে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি সন্ত্রাসী গ্রুপের ওপর কোনো না কোনো রাজনৈতিক নেতার আশীর্বাদ থাকায় পুলিশও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। যদিও এ অভিযোগ কখনোই স্বীকার করেনি প্রশাসন।

সূত্র জানায়, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পাহাড় ও নদীর বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতেই সন্ত্রাসের রাজত্বে পরিণত হয়েছে এ এলাকা। বালু ও মাটি ব্যবসার মূল কেন্দ্র রাঙ্গুনিয়ায় হলেও মূলত রাউজানের সন্ত্রাসীরাই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে। আর এ কারণেই এ উপজেলায় খুনোখুনি বেশি হয়। জুলাই বিপ্লবের পর প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে এখানকার সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। শুক্রবার রাতে খুনের শিকার বিএনপিকর্মী কাউসারুজ্জামান দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন। সম্প্রতি এলাকায় ফিরে কৃষিকাজে মনোযোগ দেন। সপ্তাহখানেক আগে একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা মোবাইল ফোনে ভিডিও করা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে। শুধু নাছির উদ্দিন আর কাউসারুজ্জামান হত্যাই নয়, গত ২১ মাসে শুধু রাউজানেই ২৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খান বলেন, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার হত্যাকাণ্ডগুলো মূলত বালু আর মাটি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হচ্ছে। পাশাপাশি এলাকায় আধিপত্য নিয়েও কয়েকটি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। তবে পুলিশ প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করেছে। সবশেষ নাছির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যার শিকার বা এর সঙ্গে জড়িত অনেকের রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে, কিন্তু পুলিশ কারো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে ছাড় দিচ্ছে না। রাউজান ও রাঙ্গুনিয়াকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে পুলিশের অভিযান সামনে আরো গতিশীল হবে বলে জানান তিনি।

রাজনৈতিক বিরোধের সুযোগ নিচ্ছে সন্ত্রাসীরা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই আধিপত্য নিয়ে বিরোধ শুরু হয় রাউজানে। মূলত কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান (পদ স্থগিত) গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম আকবর খন্দকারের মধ্যে বিরোধের জেরের সুযোগ নেয় সন্ত্রাসীরা। নিজেদের আধিপত্য, চাঁদাবাজি আর দখলদারিত্বকে রাজনৈতিক রূপ দিতে শুরু করে তারা। একপর্যায়ে গোলাম আকবর খন্দকারের ওপরও হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনার জেরে গিয়াস কাদের চৌধুরীর পদ স্থগিত ও গোলাম আকবরের নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙে দেয় কেন্দ্রীয় বিএনপি। নির্বাচনের আগে মনোনয়ন দৌড়ে ছিটকে পড়েন গোলাম আকবর খন্দকার। মূলত এরপর থেকে রাউজানের রাজনীতি থেকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন। নির্বাচনের ১৫ দিন আগে থেকেই হত্যার ঘটনা বন্ধ হয়ে যায়। দুই মাস বিরতি দিয়ে ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে সন্ত্রাসীরা। পাড়ায় পাড়ায় অস্ত্রের মহড়াসহ দুদিনে দুই খুনের ঘটনায় ফের আতঙ্ক ছড়িয়েছে উপজেলাজুড়ে।

স্থানীয়রা বলছে, নির্বাচনের কারণে রাজনৈতিক বিরোধ কম ছিল আর এ কারণে সন্ত্রাসীরা কারো প্রশ্রয় পায়নি গত দুই মাস ধরে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ফের রাজনৈতিক নেতারা সক্রিয় হতে শুরু করেছে। আর এ সুযোগে নিজেদের সংগঠিত করছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। এর জেরেই দুদিনের ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

২১ মাসে ২৩ খুন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে প্রথম খুনের ঘটনা ঘটে ২৮ আগস্ট। ওইদিন বিকালে পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী মার্কেট এলাকায় পিটিয়ে হত্যা করা হয় রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া ইউনিয়নের শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নানকে। তিনদিন পর ১ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর বাগানবাড়ি থেকে ইউসুফ মিয়া নামে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ২৯ অক্টোবর নিখোঁজের চারদিন পর উরকিরচর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মইশকরম এলাকার একটি আবর্জনার ডোবা থেকে মুহাম্মদ আজম খানের লাশ উদ্ধার করা হয়। ১১ নভেম্বর তিনদিন আগে নিখোঁজ হওয়া মুহাম্মদ আবু তাহেরের লাশ চিকদাইর ইউনিয়নের কালাচান্দ চৌধুরীহাট এলাকার বড়পুল সর্তাখাল থেকে উদ্ধার করা হয়। ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আছাদ আলী মাতব্বরপাড়ায় শুঁটকি ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে নোয়াপাড়া থেকে যুবলীগকর্মী মোহাম্মদ হাসানকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা।

২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ইফতার মাহফিল নিয়ে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের মারধর ও ছুরিকাঘাতে নিহত হন কমর উদ্দিন জিতু নামে এক যুবদলকর্মী। একই বছরের ২১ মার্চ পূর্বপুজরা ইউনিয়নের হোয়ারাপাড়ায় মো. রুবেল নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৪ এপ্রিল হলদিয়া ইউনিয়নের ইয়াছিননগরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে নূর আলম বকুলকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। ১৭ এপ্রিল পাহাড়তলী ইউনিয়নের মহামুনি দীঘি থেকে খানপাড়া গ্রামের মো. জাফরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৯ এপ্রিল রাতে খুন হন যুবদলকর্মী মানিক আবদুল্লাহ। ১৫ জন মুখোশধারী সন্ত্রাসী ভাত খাওয়া অবস্থায় তার মুখে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়। ২২ এপ্রিল দোকানে ডেকে এনে মাথায় গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় সদর ইউনিয়নের শমশেরনগর গাজীপাড়া এলাকার যুবদল নেতা মো. ইব্রাহিমকে। ৬ জুলাই কদলপুর ইউনিয়নের ইশানভট্টের হাটবাজারে অটোরিকশায় করে এসে বোরকাপরা একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মুহাম্মদ সেলিম নামে এক যুবদলকর্মীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে।

১০ জুলাই রাউজানের কদলপুর ইউনিয়নের যুবদলকর্মী দিদারুল আলমের লাশ রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার একটি ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয়। ৭ অক্টোবর রাউজানের যুবদল নেতা আবদুল হাকিমকে হাটহাজারীর মদুনাঘাট এলাকায় মুখোশ পরা একদল সন্ত্রাসী চলন্ত গাড়িতে ফিল্মি স্টাইলে গুলি করে হত্যা করে। ২৫ অক্টোবর রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম রাউজানের চারাবটতল এলাকার কায়কোবাদ জামে মসজিদের সামনে যুবদল নেতা মো. আলমগীর ও মো. রিয়াদকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

বাগোয়ান ইউনিয়নের খেলারঘাটে মানসিক প্রতিবন্ধী রূপন নাথকে হত্যার পর মাটিচাপা দেয় দুর্বৃত্তরা। যুবদল নেতা জানে আলম সিকদারকে বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে পূর্বগুজরা এলাকায় নিজের বাড়ির সামনে মোটরসাইকেলে আসা তিন দুর্বৃত্ত গুলি করে হত্যার পর পালিয়ে যায়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি অলিমিয়াহাট বাজারে বিএনপিকর্মী মুজিবকে ইফতারের আগে গুলি করে হত্যার পর অটোরিকশায় পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ১৩ ফেব্রুয়ারি হাটহাজারী থেকে গ্রাম্যমেলা দেখে ফেরার সময় উরকিরচর ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. সাব্বিরকে পিটিয়ে হালদা নদীতে ফেলে দেয় সন্ত্রাসীরা। তিনদিন পর ১৬ ফেব্রুয়ারি তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

গত ২৫ এপ্রিল রাত ৩টার দিকে বিএনপিকর্মী কাউসার উজ জামানকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। মামাবাড়ি যাওয়ার সময় ৮-১০ জনের একদল সন্ত্রাসী তাকে ঘিরে ধরে গুলি করে হত্যা করে। সবশেষ গত ২৬ এপ্রিল যুবদলকর্মী নাছের তালুকদারকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

সার্বিক বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষক আকতার কবির চৌধুরী বলেন, হত্যাকাণ্ডের দায় প্রধানত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে একটি এলাকা সন্ত্রাসমুক্ত করতে না পারার দায় তারা কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। কারণ পুলিশের সক্ষমতার অভাব নেই। আকার-ইঙ্গিতে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। পুলিশকে স্পষ্ট করতে হবে কী কারণে তারা হানাহানি থামাতে পারছেন না। সেখানে যদি কোনো রাজনৈতিক নেতার হস্তক্ষেপ থাকে, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে। এর আগ পর্যন্ত আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতাকেই দোষ দেব।

রামগঞ্জে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট, কাজে আসছে না গভীর নলকূপ

নবীনগরে মোমবাতির আলোয় পরীক্ষা দিচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার শিক্ষার্থী

বাঁশখালীতে এক ইটভাটাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা

আমেরিকায় ট্যাক্সি চালিয়ে দেশে গড়েছেন ৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

চকরিয়ায় ৩৪ হাজার পিস ইয়াবাসহ ২ কারবারি আটক

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় মাইক্রোবাস খাদে পড়ে নিহত ৩

মহাবিপন্ন বাঘাইড় উদ্ধার, রাতে মাটিচাপা বন বিভাগের

দুর্গম পাহাড়ে ঘরে ঘরে হামের প্রকোপ শিশুদের চিকিৎসা নিয়ে উৎকণ্ঠা

সীতাকুণ্ডে পুকুরে মৃত্যুর মিছিল, চার দিনে ঝরল ৫ শিশুর প্রাণ

সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারকালে ৬৯ রোহিঙ্গা উদ্ধার