চট্টগ্রামের টাইগারপাস সোমবার সন্ধ্যা নামার আগেই পরিণত হয় এক ধরনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মঞ্চে। যেখানে দেয়াল শুধু ইট-সিমেন্টের কাঠামো নয়, হয়ে ওঠে স্মৃতি, প্রতিবাদ আর প্রতীকী ইতিহাসের ক্যানভাস।
সন্ধ্যা ৭টা। সিটি করপোরেশনের প্রধান গেটের বিশাল দেয়াল ঘিরে জমে ওঠে মানুষের ভিড়। রং, তুলি আর স্প্রে ক্যানের শব্দে ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে সাদা-ফ্যাকাসে দেয়াল। “জুলাই গ্রাফিতি” নামে এই উদ্যোগে অংশ নেন তরুণ-তরুণী, শিল্পী এবং নানা বয়সের মানুষ। কেউ আঁকছেন প্রতিবাদের মুখ, কেউ লিখছেন স্লোগান, কেউ আবার রঙের ভেতরে খুঁজে নিচ্ছেন হারানো দিনগুলোর ছায়া। এটি ছিল নগর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে।
কিছুটা দূরেই, টাইগারপাস মোড়। সেখানেও সাড়ে ৭টার দিকে শুরু হয় আরেকটি গ্রাফিতি কর্মসূচি এনসিপির ব্যানারে। এর আগে গ্রাফিতি আঁকা শুরু করে গণঅধিকার পরিষদ। ৩টি আলাদা জায়গা, ৩টি আলাদা সময়, কিন্তু দেয়ালের ভাষা প্রায় একই: স্মরণ, প্রতিবাদ এবং রাজনৈতিক অভিব্যক্তি।
দিনের শুরুটা অবশ্য এতটা নির্বিঘ্ন ছিল না। দুপুরের দিকে এই টাইগারপাস মোড়েই ১৫-২০ জন শিক্ষার্থী রং-তুলি হাতে দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। সেই বাধার পর কিছুক্ষণের জন্য ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। তরুণদের কণ্ঠে শোনা যায় ক্ষোভ। তারা দাবি করেন, এটি শুধু শিল্প নয়, এটি ইতিহাসের পুনর্লিখন।
তাদের ভাষায়, জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলা মানে স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা। তাই তারা কোনো রাজনৈতিক ব্যানারের নির্দেশনায় নয়, “বিবেকের তাড়নায়” দেয়ালে ফিরতে চেয়েছেন।
এ ঘটনার পেছনে ছিল আরও দীর্ঘ টানাপোড়েন। রোববার বিকেল থেকেই শহরের দেয়াল ঘিরে উত্তেজনা জমতে শুরু করে। জুলাই আন্দোলন-সম্পর্কিত গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এনসিপি নেতাকর্মীদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। গভীর রাত পর্যন্ত শহরের রাজনৈতিক আবহ ছিল টানটান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন লালখান বাজার থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। সকাল থেকে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। রাজনৈতিক দলগুলো পরে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের কর্মসূচি স্থগিত করে।
তবুও দেয়াল থেমে থাকেনি। বিকেলের পর থেকেই ধীরে ধীরে ফিরে আসে রং। সন্ধ্যা ৭টায় সিটি করপোরেশনের দেয়ালে আনুষ্ঠানিক গ্রাফিতি শুরু হওয়ার পর শহরের এই অংশে তৈরি হয় এক ভিন্ন আবহ—যেখানে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক অবস্থান এবং তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি একসাথে ছিল সহাবস্থান।