সীতাকুণ্ডের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (আইআইইউসি) ক্যাম্পাসে ইসলামী ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা ১৭ লাখ টাকা চুরির ঘটনা ঘটেছে। গত বুধবার এ ঘটনার পর পাওয়া যাচ্ছিল না বুথের নিরাপত্তা প্রহরীকে। পরে বুথে লাগানো সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, নকল চাবি দিয়ে বুথ খুলে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন নিরাপত্তা প্রহরী। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। টাকাসহ গতকাল রংপুর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসময় তার কাছ থেকে চুরি যাওয়া প্রায় ১৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
জানা গেছে, অভিযুক্ত আইয়ুব আলী প্রায় দেড় বছর ধরে আইআইইউসি ক্যাম্পাসে ইসলামী ব্যাংকের এটিএম ও কালেকশন বুথে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘদিন একই বুথে দায়িত্ব পালন করায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কর্মকর্তাদের দৈনন্দিন রুটিন, বুথ পরিচালনার ধারা এবং অর্থ সংরক্ষণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার ভালো ধারণা তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়ে তিনি পূর্বপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা একটি নকল চাবি ব্যবহার করে লকার খুলে এক হাজার টাকার ১৭টি বান্ডেল, অর্থাৎ মোট ১৭ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যান।
ঘটনার পর ইসলামী ব্যাংকের আইআইইউসি শাখার ইনচার্জ মইনুল ইসলাম বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় আপাতত একমাত্র আসামি করা হয়েছে নিরাপত্তাকর্মী আইয়ুব আলীকে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সীতাকুণ্ড মডেল থানার এসআই ফয়েজ আহমেদ আমার দেশকে বলেন, মামলা দায়েরের পরপরই প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত শুরু করা হয়। অভিযুক্তের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে গত ২৬ জুন রংপুরের কামারপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে আইয়ুব আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি জানান, গ্রেপ্তারের পর আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত এখনো চলমান। আত্মসাৎ হওয়া অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, ঘটনার পরিকল্পনার ধরন এবং এ ঘটনায় অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ব্যাংকিং বুথে একজন নিরাপত্তাকর্মীর পক্ষে নকল চাবি ব্যবহার করে লকারে প্রবেশ করতে পারা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। মূল চাবির নিরাপত্তা, লকার ব্যবস্থাপনা, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্ব পালনের তদারকি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এ ঘটনায় শুধু অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনাই যথেষ্ট নয়। কীভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরে এমন দুর্বলতা তৈরি হলো, দীর্ঘদিন একই ব্যক্তিকে একই দায়িত্বে রাখার ফলে কোনো ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছিল কি না এবং ভবিষ্যতে যাতে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিচালিত ব্যাংকিং বুথে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
তাদের মতে, এ মামলার তদন্তের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শুধু চুরি হওয়া অর্থের হিসাব উদ্ধার বা অভিযুক্তের শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর নয়, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি ছিল, কারও গাফিলতি বা যোগসাজশ ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, এসব প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর বেরিয়ে আসার ওপর। কারণ এ ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অনেক সময় বাইরে নয়, প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই তৈরি হতে পারে।