সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নূরনগর ইউনিয়নে সরকারি রাস্তা নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ঠিকাদারের হামলা ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন জাতীয় দৈনিক আমার দেশ-এর শ্যামনগর উপজেলা প্রতিনিধি জি এম মনিরুজ্জামান। এ ঘটনায় উপজেলা সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, সরকারি উন্নয়নকাজে অনিয়মের তথ্য প্রকাশে বাধা দিতেই এ হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে শনিবার (২৮ জুন) দুপুর প্রায় ১টার দিকে শ্যামনগর উপজেলার নূরনগর ইউনিয়নের নূরনগর বাজারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নূরনগর বাজারের অগ্রণী ব্যাংক সংলগ্ন মোড় থেকে কুলতলী বিজিবি ক্যাম্প অভিমুখে মীর আলী মোল্লার বাড়ি পর্যন্ত চলমান কার্পেটিং রাস্তা নির্মাণকাজে নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় কম বিটুমিন ব্যবহার করা হচ্ছে। সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং নির্মাণকাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতেই ঘটনাস্থলে যান আমার দেশ-এর প্রতিনিধি জি এম মনিরুজ্জামান, দৈনিক সাতক্ষীরা সংবাদ-এর প্রতিনিধি পলাশ দেবনাথ এবং দৈনিক দৃষ্টিপাত-এর বিশেষ প্রতিনিধি এস এম জাকির হোসেন।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহিন এন্টারপ্রাইজ-এর স্বত্বাধিকারী মুজিবুর রহমানের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। সাংবাদিকদের উদ্দেশে উচ্চস্বরে বলতে থাকেন, আপনারা কি ইঞ্জিনিয়ার? বিটুমিন সম্পর্কে কী জানেন? একপর্যায়ে নিজেকে প্রভাবশালী ব্যক্তি পরিচয় দিয়ে বলেন, যেখানে পারেন নিউজ করেন, বিটিভিতে টেলিকাস্ট করেন, আমার কিছুই হবে না।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, একপর্যায়ে তিনি জি এম মনিরুজ্জামানের দিকে তেড়ে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এ সময় উপস্থিত সাংবাদিক পলাশ দেবনাথ ও এস এম জাকির হোসেন প্রতিবাদ জানালে তিনি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে সাংবাদিকদের “হলুদ সাংবাদিক” বলে কটাক্ষ করেন এবং পুনরায় বলেন, যেখানে পারেন নিউজ করেন, আমার কিছুই হবে না। তার এমন আচরণে ঘটনাস্থলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
উপস্থিত সাংবাদিকরা বলেন, জনগণের অর্থে বাস্তবায়নাধীন উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তথ্য সংগ্রহ করা সংবাদকর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সাংবাদিকের ওপর হামলা শুধু ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও জনগণের জানার অধিকারের ওপরও আঘাত।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নূরনগর বাজার থেকে কুলতলী বিজিবি ক্যাম্প পর্যন্ত সড়কটির ইটের সলিং প্রায় চার বছর আগে তুলে ফেলা হয়েছিল। এরপর দ্রুত পিচঢালাইয়ের আশ্বাস দেওয়া হলেও বছরের পর বছর সড়কটি খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়। বর্ষাকালে কাদা আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালির কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে এলাকাবাসীকে। অবশেষে দীর্ঘ চার বছর পর কার্পেটিংয়ের কাজ শুরু হওয়ায় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু কাজের শুরুতেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় কম বিটুমিন ব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় সেই স্বস্তি আবারও উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, জনগণের অর্থে নির্মিত এই সড়কের কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।
ঘটনার বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জামান কনককে অবহিত করা হলে তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে, শ্যামনগর উপজেলা এলজিইডির কর্মকর্তা এম আব্দুস সামাদের কাছে ঘটনাটি জানানো হলে তিনি বিকেলে সাংবাদিকদের নিজ কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানান। সন্ধ্যায় বৈঠকে তিনি ঘটনাটিকে দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেন। তবে উপস্থিত সাংবাদিকদের অভিযোগ, একজন সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে তিনি বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে মীমাংসার চেষ্টা করেন। তিনি সাংবাদিকদের পরদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি দেখবেন এবং পরে এ বিষয়ে আলোচনা করবেন।
এ ঘটনায় উপজেলা সাংবাদিক সমাজ হামলার সুষ্ঠু তদন্ত, হামলাকারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, রাস্তা নির্মাণকাজের গুণগত মান নিরপেক্ষভাবে যাচাই এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।