শরীয়তপুরের ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিত কর্মকারের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা একটি চাঁদাবাজি মামলায় স্থানীয় এক সাংবাদিককে আসামি করাকে কেন্দ্র করে জেলায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্ত সাংবাদিকের দাবি, তিনি ঘটনার সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভিডিও ধারণ করছিলেন। তবে ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও পূর্বশত্রুতার জেরে তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
জানা গেছে, গত রোববার সকালে ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে প্রধান শিক্ষক সুজিত কর্মকারের ওপর একদল ব্যক্তি হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। হামলার সময় তাকে মারধর করা হয়। পরে আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ডামুড্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঘটনার পর সোমবার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত, ডামুড্যায় একটি মামলা দায়ের করেন প্রধান শিক্ষক সুজিত কর্মকার। মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও আট থেকে নয়জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। অভিযোগে হামলা ও চাঁদা দাবির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার চার নম্বর আসামি করা হয়েছে স্টার নিউজের শরীয়তপুর প্রতিনিধি মিরাজ সিকদারকে।
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন, আশিক বেপারী, সাহিন মাদবর, মিঠু শিকদার, শাহ আলম, ইপ্তি সরদার ও আলিফ সিকদারসহ আরও কয়েকজন।
তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি এবং ঘটনার ভিডিও ফুটেজের বিষয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, হামলার সময় সাংবাদিক মিরাজ সিকদার অন্যান্য গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে ঘটনাস্থলে অবস্থান করে ভিডিও ধারণ করছিলেন। তার বিরুদ্ধে হামলা বা চাঁদাবাজির ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো দৃশ্য ভিডিওতে দেখা যায়নি বলেও দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে সাংবাদিক মিরাজ সিকদার বলেন, একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিডিও ধারণ করেছি। এর বাইরে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না। এর আগে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিলাম। সেই ক্ষোভ থেকেই আমাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে আমি মনে করি। তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
একজন গণমাধ্যমকর্মীকে মামলার আসামি করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন রবিন বলেন, কোনো সাংবাদিক যদি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মামলার আসামি হয়ে যান, তাহলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে। আমরা চাই প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করুক এবং নিরপরাধ কাউকে হয়রানির শিকার হতে না হয়।
তবে মামলার বাদী প্রধান শিক্ষক সুজিত কর্মকার ভিন্ন দাবি করেছেন। তার অভিযোগ, সাংবাদিক মিরাজ সিকদার কেবল ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না, বরং পুরো ঘটনার নেপথ্যে তার ভূমিকা রয়েছে। তিনি মিরাজ সিকদারকে ঘটনার “মাস্টারমাইন্ড” বলেও দাবি করেন।
এ বিষয়ে ডামুড্যা থানার ওসি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মামলার কাগজপত্র এখনো থানায় এসে পৌঁছেনি। কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পর অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে একজন সাংবাদিককে আসামি করার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মামলায় সাংবাদিকের নাম অন্তর্ভুক্তির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। অন্যদিকে বাদীপক্ষের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন সচেতন মহল।
ঘটনাটি এখন শুধু একটি হামলা মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি সংবাদকর্মীদের পেশাগত নিরাপত্তা, দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে মামলায় জড়ানোর অভিযোগ—এসব বিষয়কে সামনে এনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
এমএইচ