৫’শ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা
লাল মাটির পাহাড়, শাল-গজারির বন আর উঁচু-নিচু ভূপ্রকৃতির জন্য পরিচিত টাঙ্গাইলের মধুপুর এখন দেশের অন্যতম আনারস উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে খ্যাত। “আনারসের রাজধানী” নামে পরিচিত এ অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটির বিশেষ গুণাগুণ আনারস চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় প্রতি বছর এখানে বিপুল পরিমাণ আনারস উৎপাদিত হচ্ছে।
তবে সম্ভাবনাময় এই খাতটি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। স্থানীয়দের দাবি, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের অভাবে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত আনারসের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, মধুপুরে আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠলে এখানকার আনারস থেকে জুস, জেলি, বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে।
ঘাটাইলের আনারস চাষি সুরজ্জামান বলেন, “মধুপুরে যদি একটি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে তাহলে আনারস আর নষ্ট হবে না। পরিবহন খরচ কমবে, কৃষকেরা সঠিক দাম পাবে এবং অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে।”
জানা যায়, মধুপুর অঞ্চলে আনারস চাষের সূচনা হয় ষাটের দশকের শেষ দিকে। আউশনারা ইউনিয়নের ইদিলপুর গ্রামের গারো নারী ভেরেনা সাংমা ভারত থেকে ‘জায়ান্ট কিউ’ জাতের কয়েকটি আনারসের চারা এনে চাষ শুরু করেন। তার হাত ধরেই গড়াঞ্চলে আনারস চাষের বিপ্লব ঘটে। বর্তমানে জায়ান্ট কিউয়ের পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের জনপ্রিয় ‘জলডুগি’ জাতের আনারসও ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, বাজার ব্যবস্থাপনায় সিন্ডিকেট এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাব তাদের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট ও আনারস চাষি মাসুদ রানা বলেন, “এলাকায় গ্যাস সংযোগ এবং সরকারি উদ্যোগে একটি কারখানা স্থাপন করা গেলে কৃষকেরা সিন্ডিকেটের হাত থেকে রক্ষা পেতেন। একই সঙ্গে এলাকার ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হতো।”
মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জুবায়ের হোসেন বলেন, “মধুপুরে আরও আগেই একটি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র হওয়া উচিত ছিল। এতে আনারস থেকে জুস, জেলি ও বিস্কুটসহ নানা পণ্য তৈরি করা সম্ভব হতো। এতে বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি কৃষকেরাও লাভবান হতেন।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রকিব আল-রানা জানান, চলতি মৌসুমে মধুপুরে ৬ হাজার ৪৭৯ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৩২৪ হেক্টরে জলডুগি এবং ৬ হাজার ১২৫ হেক্টরে ক্যালেন্ডার জাতের আনারসের আবাদ হয়েছে। এছাড়া পরীক্ষামূলকভাবে এমডি-টু জাতের আনারসও চাষ করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে মধুপুরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার আনারস বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই বিশাল সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা ও আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এডি/এইচআর