সাধারণ নাগরিক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ কিংবা বিভিন্ন কমিউনিটির প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতেই গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে।
পৌর প্রশাসকের সভাপতিত্বে আয়োজিত বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে মূলত পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী ছাড়া অন্য কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল না। এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বাজেট প্রণয়ন ও ঘোষণার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে পৌরসভা কার্যালয়ের তৃতীয় তলার সভাকক্ষে বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠান শুরু হয়ে শেষ হয় দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে। মাত্র ৩০ মিনিটের এ অনুষ্ঠানে শ্রীপুর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাহিদ ভূঞা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯২ কোটি ৯৭ লাখ ৫৯ হাজার ১৭৩ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেন।
একই সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ৪৪ কোটি ৯৯ লাখ ৯৮ হাজার ৯১৭ টাকা ৪৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। তবে নতুন কোনো কর আরোপ করা হয়নি বলে জানানো হয়।
বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে স্থানীয় সচেতন নাগরিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, পেশাজীবী সংগঠন, সামাজিক সংগঠন কিংবা সাধারণ পৌরবাসীর অংশগ্রহণ ছিল না। উপস্থিত ছিলেন কেবল পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ১৩ জন সাংবাদিক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী বাজেট প্রণয়নের আগে নাগরিক মতামত গ্রহণ ও উন্মুক্ত আলোচনার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। ফলে বাজেট প্রণয়ন ও ঘোষণার পুরো প্রক্রিয়া থেকে পৌরবাসী কার্যত বিচ্ছিন্ন থেকেছেন।
শ্রীপুর পৌর সচেতন নাগরিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম বলেন, “বাজেট ঘোষণার বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। কী বাজেট হয়েছে তাও জানি না। কমিউনিটির প্রতিনিধিদের না জানিয়ে বাজেট ঘোষণা করায় এটি স্বচ্ছ হয়নি বলে আমি মনে করি।”
পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সহকারী অধ্যাপক এমদাদুল হক বলেন, “আজ বাজেট ঘোষণা হয়েছে সেটাই আমি জানতাম না। একজন পৌর নাগরিক হিসেবে এটি আমার অধিকার হরণের শামিল।”
শ্রীপুর পৌর বিএনপির সদস্য সচিব ও সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী বিল্লাল হোসেন বেপারী বলেন, “বাজেট ঘোষণা হয়েছে, আমি জানতাম না। কেউ আমাকে দাওয়াতও দেয়নি। সাংবাদিকদের মাধ্যমে শুনলাম। তবে আমি আশা করি, পৌর কর্তৃপক্ষ উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অগ্রাধিকার দেবে।”
গাজীপুর জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক ও সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী এস এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, “কোনো কমিউনিটির প্রতিনিধিকে না জানিয়ে বাজেট ঘোষণা করা মোটেও ভালো হয়নি। উৎসবমুখর পরিবেশে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বাজেট ঘোষণা করলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বাড়ত।”
পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী ডা. সফিকুল ইসলাম বলেন, “যেখানে জাতীয় সংসদে উন্মুক্তভাবে বাজেট উপস্থাপন করা হয়, সেখানে পৌরসভার বাজেট প্রায় গোপনীয়ভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। পৌরবাসীর করের টাকায় পৌরসভা পরিচালিত হয়। তাই বাজেট সম্পর্কে জানার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে।”
জামায়াতে ইসলামী মনোনীত মেয়র প্রার্থী ড. মুহাম্মদ হারুনুর রশীদ বলেন, “আজ বাজেট ঘোষণা হয়েছে সেটাই আমি জানতাম না। কাউকে না জানিয়ে বাজেট ঘোষণা করা সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয়। উন্নয়ন নিয়ে যারা ভাবছেন, তাদের মতামত উপস্থাপনের সুযোগ থাকা উচিত ছিল।”
এদিকে বাজেট অনুষ্ঠানে বিভিন্ন কমিউনিটির প্রতিনিধি অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পৌর প্রশাসক ও ইউএনও মো. নাহিদ ভূঞা বলেন, “আমাদের কোনো জনপ্রতিনিধি নেই।” বাজেট ঘোষণাকে ‘লুকোচুরি’ আখ্যা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “যদি লুকোচুরি করতাম, তাহলে আপনাদের (সাংবাদিকদের) দাওয়াত দিতাম না।”
অনুষ্ঠানে বিগত অর্থবছরের আনুষঙ্গিক খাতে প্রায় ১২ লাখ টাকা ব্যয়ের বিষয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ বিষয়ে দৈনিক আমার দেশ-এর স্থানীয় প্রতিনিধি ও শ্রীপুর উপজেলা সাংবাদিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম জহিরুল ইসলাম জানতে চাইলে পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুস হাওলাদার বলেন, “বিভিন্ন সময় কেনাকাটাসহ নানা কাজে এই খরচ হয়েছে।”
তবে তার উত্তরে সন্তুষ্ট না হয়ে পৌর প্রশাসক নাহিদ ভূঞা নির্দেশ দেন, ভবিষ্যতে প্রতিটি ব্যয়ের খাত বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করতে হবে।
স্থানীয়দের মতে, উন্মুক্ত পরিবেশে বাজেট ঘোষণা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পৌরবাসীর প্রত্যাশা ও প্রয়োজনীয়তা আরও কার্যকরভাবে বাজেটে প্রতিফলিত হতো। একই সঙ্গে পৌর প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনআস্থা আরও সুদৃঢ় হতো।
পৌরবাসীর প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে বাজেট প্রণয়ন ও ঘোষণার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।