গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের ভিটিপাড়া গ্রামে জমে উঠেছে খেজুরের রস সংগ্রহ ও রস থেকে গুড় তৈরির কাজ। এটা এখন এখানকার মানুষের উৎসবে পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের ভিটিপাড়া গ্রামে প্রতিদিন কুয়াশা মোড়ানো ভোর, উনুনের ধোঁয়া আর খেজুরের রসের মিষ্টি সুবাসে প্রাণ ফিরে পায় এই জনপদ। এখানকার খেজুরগাছ থেকে সংগ্রহ করা রস আর প্রথাগত পদ্ধতিতে তৈরি খাঁটি গুড়ই হয়ে ওঠে বহু পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। ভিটিপাড়া ও আশপাশের এলাকায় রয়েছে দুই শতাধিক খেজুরগাছ। এসব গাছ থেকে প্রতিদিন ভোরে সংগ্রহ করা হয় প্রায় ৬০০ কেজি কাঁচা রস। চারজন দক্ষ গাছির একটি দল প্রতিদিন বিকেলে গাছে হাঁড়ি ঝুলিয়ে দেন। সারা রাত ধরে ফোঁটায় ফোঁটায় রস জমে হাঁড়িতে, আর সূর্য ওঠার আগেই তা নামিয়ে বড় কলসিতে ছেঁকে নেওয়া হয়। এর একটা অংশ ভোরেই টাটকা রস হিসেবে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়। বাকি রস ঢালা হয় বড় বড় কড়াইয়ে, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় সুস্বাদু খেজুরের গুড়।
পুকুরপাড়ের খোলা চত্বরে শুকনো কাঠে জ্বালানো উনুনে রস ফুটতে থাকে। একদিকে আগুনে কড়াই বসে, অন্যদিকে একজন ফেনা তুলে ফেলে দেন। ধীরে ধীরে স্বচ্ছ রস রং বদলে গাঢ় লাল হয়ে ওঠে আর দীর্ঘ সময়ের ধৈর্য ও অভিজ্ঞ হাতে রূপ নেয় সোনালি গুড়ে। প্রায় ৬০০ কেজি কাঁচা রস থেকে দিনে গড়ে ৫০ কেজি খাঁটি গুড় তৈরি হয়। এখানে নেই কোনো রাসায়নিক বা ভেজাল—পুরোটাই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় তৈরি।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার সোনাদা গ্রামের গাছি মাসুদ মিয়া জানান, বিকেলে গাছের ছাল ছাড়িয়ে বাঁশের ফালি বসিয়ে হাঁড়ি ঝুলিয়ে দেন তারা। সেই বাঁশ বেয়ে ওপর থেকে রস গড়িয়ে হাঁড়িতে পড়ে। পরদিন ভোরের আগেই হাঁড়ি নামিয়ে রস সংগ্রহ করা হয়। নাটোরের লালপুর উপজেলার দরদরিয়া গ্রামের গাছি শামসুল হক বলেন, ‘এই তিন মাসের আয়েই আমাদের পুরো বছরের সংসার চলে। মৌসুমে ভালো পরিশ্রম করলে সারা বছর আর্থিক টানাপড়েন থাকে না।’
ভিটিপাড়ায় খেজুরের গুড় তৈরির পুরো উদ্যোগের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাঝুবাঘা ইউনিয়নের চন্দ্রগাতি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘প্রতি মৌসুমে আমরা চারজন গাছি নিয়ে এখানে কাজ করি। একজনের বেতন দেড় লাখ টাকার কাছাকাছি। সব খরচ বাদ দিয়ে এই মৌসুমে আমার লাভ থাকে প্রায় ২ থেকে সোয়া ২ লাখ টাকা, যা দিয়ে পরিবার নিয়ে পরের শীত পর্যন্ত চলি।’
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রশীদ ফকির বলেন, গাছিরা খুব পরিষ্কারভাবে রস সংগ্রহ করেন। হাঁড়ি নেট দিয়ে ঢেকে রাখায় পোকামাকড় বা ময়লা পড়ে না। আরেক বাসিন্দা আবুল কাশেম জানান, ‘ওদের বানানো পাটালি গুড় খুবই সুস্বাদু। আমরা নিজেরাও খাই, আবার আত্মীয়দের জন্যও নিয়ে যাই।’
এসআই