ধানের ন্যায্যমূল্য নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষক
কিশোরগঞ্জের দিগন্তজোড়া হাওরে এখন সোনালি ধানের সুবাস। চারদিকে ধান কাটা আর মাড়াইয়ের মহোৎসবে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক-কৃষানিরা। তবে হাওরবাসীর মনে স্বস্তি নেই। অতিবৃষ্টির জলাবদ্ধতা আর আকাশচুম্বী উৎপাদন খরচের বিপরীতে ধানের বাজারমূল্য তলানিতে নেমে আসায় চরম হতাশায় ভুগছেন হাজার হাজার কৃষক।
সরেজমিন অষ্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর সেচ, সার, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। কৃষকদের অভিযোগ, বর্তমানে এক মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি মেটানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
হাবেলীপাড়ার কৃষক মো. সাজু মিয়া (৫৫) আক্ষেপ করে বলেন, ‘এক মণ ধান ফলাতে খরচ হচ্ছে ১২০০ টাকার বেশি, অথচ বাজারে দর মিলছে মাত্র ৭০০-৮০০ টাকা। যেখানে শ্রমিকের মজুরিই ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা, সেখানে আমাদের এই হাড়ভাঙা খাটুনির দাম কে দেবে?"
একই ক্ষোভ প্রকাশ করেন মধ্য অষ্টগ্রামের কৃষক মো. রবু মিয়া (৬২)। তিনি জানান, সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে চালের দাম কমছে না, অথচ আড়তদার ও রাইস মিল মালিকেরা কৃষকের রক্ত পানি করা শ্রমের ধান কিনছেন নামমাত্র মূল্যে।
গত মঙ্গলবার খলায় গিয়ে দেখা যায়, কৃষক আব্দুল মালেক মিয়া (৬৫) বাধ্য হয়ে ৭৫০ টাকা দরে ভেজা ধান বিক্রি করছেন। তিনি জানান, শ্রমিক ও ট্রাক ভাড়া মেটানোর চাপে লোকসানেই ধান ছাড়তে হচ্ছে তাকে।
তরুণ কৃষক ইদু মিয়া (৩৩) হিসাব কষে দেখান, এক একর জমির ধান কাটতেই শ্রমিক খরচ লাগে ১০ হাজার টাকা এবং ট্রাক ভাড়া ৩ হাজার টাকা। বীজ ও সারের খরচ যোগ করলে লাভ দূরে থাক, ঋণের বোঝা আরো ভারী হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনসহ কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, যার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা সাদিকুর রহমান জানান, কিশোরগঞ্জ একটি খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা। দুর্যোগের ঝুঁকি এড়াতে ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেলেই তা দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
যদিও সরকার গত ২২ এপ্রিল প্রতি কেজি ধানের মূল্য ৩৬ টাকা (মণ প্রতি ১৪৪০ টাকা) নির্ধারণ করেছে, তবুও সাধারণ কৃষকদের সংশয় কাটছে না। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের ঘোষণা থাকলেও মধ্য-স্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা কতটা সুবিধা পাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হাওরবাসীর দাবি, বাজার থেকে সিন্ডিকেট নির্মূল করে সরাসরি প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে ধান কেনা নিশ্চিত করা হোক। তা না হলে বিপুল লোকসানে পড়ে প্রান্তিক কৃষকেরা পথে বসবেন।