১৭ বছর পেরিয়ে গেছে। তবুও ২০০৯ সালের ২৫ মের সেই বিভীষিকাময় দিনটির কথা ভুলতে পারেনি সাতক্ষীরার উপকূলের মানুষ। ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে। লোনাপানির ভয়াল জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছিল ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের আর হাজারো মানুষের স্বপ্ন।
সময় গড়িয়েছে। কিন্তু উপকূলজুড়ে এখনো রয়ে গেছে সেই ধ্বংসের ক্ষতচিহ্ন।
সুন্দরবনঘেঁষা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়ন ছিল আইলার সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার একটি। ওই সময় নারী-শিশুসহ অন্তত ৩৯ জনের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়। শুধু শ্যামনগর উপজেলাতেই গৃহহীন হয়ে পড়েন ২ লাখ ৪৩ হাজার ২৯৩ মানুষ। জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় বসতভিটা, কৃষিজমি ও মাছের ঘের। রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে পড়ে হাজারো পরিবার।
কিন্তু আইলার ক্ষত না শুকাতেই একের পর এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে উপকূলে। ২০২০ সালে আম্পান, পরে বুলবুল, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৭ মে ঘূর্ণিঝড় রিমাল আবারও উপকূলের বহু এলাকা তছনছ করে দেয়। গত পাঁচ বছরে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বড় সাতটি ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে পাঁচটিই আঘাত হেনেছে মে মাসে। ফলে মে এলেই এখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে উপকূলজুড়ে।
প্রতিবার দুর্যোগের খবর এলেই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েন সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার মানুষ। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ এখন তাদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। বিভিন্ন এলাকায় সংস্কার কাজ চললেও অনেক স্থানে বাঁধ এখনো ভাঙনের ঝুঁকিতে।
আইলার পর বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে আজও বেড়িবাঁধের কোলঘেঁষে সরকারি জায়গায় বসবাস করছেন। খাবার পানির সংকট, কর্মসংস্থানের অভাব আর বারবার দুর্যোগে অনেকে এলাকা ছেড়ে শহরমুখী হয়েছেন। কৃষক ও চিংড়িঘের মালিকদের অনেকে পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের তথ্যমতে, শুধু গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নেই ভিটেমাটি হারিয়ে সম্পূর্ণ বা আংশিক ভূমিহীন হয়েছেন ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ মানুষ। সংখ্যায় যা ১৫ থেকে ২০ হাজার পরিবার। স্থানীয় সামাজিক সংগঠন সাউদার্ন চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের জরিপ ও ইউপি চেয়ারম্যানের তথ্য অনুযায়ী, শুধু গাবুরাতেই ৫ শতাধিক পরিবার এখন নদীর চরে সরকারি জায়গায় বসবাস করছে।
গাবুরা ইউনিয়নের পল্লী চিকিৎসক আশরাফুল আলম বলেন, ‘আইলার সময় বেড়িবাঁধ ভেঙে পুরো এলাকা প্লাবিত হয়। আমার ওষুধের ঘর নদীতে বিলীন হয়ে যায়। পাশের বাড়ির সূর্য বিবি পানিতে ডুবে মারা যান।’
স্থানীয় বাসিন্দা কামাল শেখ বলেন, ‘জলোচ্ছ্বাসে আমার ছাগল ভেসে মারা যায়। ৯ নম্বর সোরা এলাকায় বাঁধ ভেঙে ছোট ছোট শিশুও পানিতে ভেসে মারা গিয়েছিল।’
পার্শ্বেমারী গ্রামের আতিয়ার মোড়ল এখনো পরিবার নিয়ে বাঁধের পাশে সরকারি জায়গায় বসবাস করেন। কণ্ঠে হতাশা নিয়ে তিনি বলেন,
‘আইলার পর সতেরোডা বছর পার হুয়েছে, আজও আমরা ঘুরে দাঁড়াতি পারিনি। ভাত-পানির থে শুরু করে কাজ-কর্ম, সবখানে অভাব। সর্বনাশা আইলা আমাগো পথে বসাই দিছে।’
একই ইউনিয়নের গাঙড়ামারী গ্রামের বিধবা কাঞ্চন বিবির জীবনও থমকে গেছে আইলার পর থেকেই। একসময় ঘরবাড়ি, গরু-ছাগল সবই ছিল তার। এখন ভিক্ষা করে জীবিকা চালাতে হয় তাকে। কাজের সন্ধানে একমাত্র ছেলেও এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, আইলার আগে উপকূলের প্রধান খাবার পানির উৎস ছিল পুকুর। কিন্তু ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক পুকুরের পানি এখনো লবণাক্ত। একসময় সবুজে ঘেরা জনপদ এখন অনেক স্থানে প্রায় বৃক্ষশূন্য। লোনাপানির প্রভাবে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপকূলের মানুষের জীবিকার লড়াইটাও কঠিন। কেউ নদীতে মাছ ধরেন, কেউ সুন্দরবনে কাঁকড়া, মাছ ও মধু সংগ্রহ করেন, কেউ গোলপাতা কাটেন। কিন্তু দুর্যোগ, নিষেধাজ্ঞা আর অনিশ্চয়তায় টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম বলেন, ‘সেই ভয়াল আইলার আঘাত আজও মানুষ ভুলতে পারেনি। পুরো ইউনিয়ন তখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছিল ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সেই সঙ্গে হাজারো মানুষের স্বপ্ন। প্রায় ৮০ কিলোমিটার রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যার অধিকাংশ এখনও পুরোপুরি সংস্কার হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক মানুষ এখনও নিরাপদ নয়। নদীতে জোয়ারের পানি একটু বাড়লেই বেড়িবাঁধে ভাঙনের আতঙ্কে রাত জেগে পাহারা দিতে হয়। এত বছর পরও গাবুরার মানুষ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।’
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনক জানান, দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরাকে মডেল ইউনিয়ন ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে নতুন প্রযুক্তিতে টেকসই বাঁধ নির্মাণে প্রায় ১ হাজার ২০ কোটি টাকার কাজ চলছে। পাশাপাশি বাঁধসংলগ্ন এলাকায় সরকারি-বেসরকারিভাবে বনায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু উপকূলবাসীর প্রশ্ন একটাই- আর কত দুর্যোগের পর নিরাপদ হবে তাদের জীবন?
আইলার ১৭ বছর পরও সাতক্ষীরার উপকূলে এখনো চলছে বাঁচার লড়াই। ভাঙা বাঁধ, লোনা পানি আর অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করেই টিকে আছেন হাজারো মানুষ।
এমএইচ