রাজশাহীর ছয় আসন
গ্রামের চা-স্টল, হাটবাজার কিংবা পাড়ার বৈঠকখানা থেকে শহরের মোড়ের আড্ডাÑসবখানেই এখন আলোচনা একটাই আসন্ন সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিভাগীয় শহর রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনে ফিরেছে নির্বাচনি প্রাণচাঞ্চল্য।
মাঠ পর্যায়ের প্রচার, দলীয় সাংগঠনিক তৎপরতা এবং ভোটারদের মনোভাব বিশ্লেষণে জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে জেলার আসনগুলোতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বড় দল দুটিকে ঘিরে। বিএনপিতে বিদ্রোহী প্রার্থী, কোথাও দলীয় কোন্দল, আবার কোথাও প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাÑএসব বিষয় এবার নির্বাচনের সমীকরণকে জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজশাহীর ছয়টি আসনে নির্বাচন এবার শুধু বিএনপি বনাম জামায়াত নয়। বিদ্রোহী প্রার্থী, স্থানীয় নেতৃত্ব, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, ভোটব্যাংক, ভোটার উপস্থিতি এবং সংগঠনের মাঠ পর্যায়ের শক্তিই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে।
রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী মরহুম ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ভাই মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিন। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। দুজনেই হেভিওয়েট প্রার্থী। এছাড়া এ আসনে এবি পার্টির ড. আব্দুর রহমান ও গণঅধিকার পরিষদের মীর মো. শাহজাহান রয়েছেন নির্বাচনি মাঠে। এলাকায় নারী ও তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গণসংযোগ এবং উঠান বৈঠক করছেন। মূল লড়াই এ দুই প্রার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে স্থানীয় ভোটাররা জানান। তবে জামায়াতের প্রার্থী এই আসনের সাবেক এমপি হওয়ায় ভোটের মাঠে কিছুটা এগিয়ে থাকবেন বলে অনেকের ধারণা।
রাজশাহী-২ (সদর) আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের (সাবেক) উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু, জামায়াতের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরসহ ছয় প্রার্থী মাঠে আছেন। নগর এলাকায় নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ বেশি হওয়ায় দুদলের প্রার্থীই নারী ভোটারদের কাছে টানতে বিশেষ প্রচার চালাচ্ছেন। এতে এই আসনেও বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই মূল লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে বিএনপির অ্যাড. শফিকুল হক মিলন, জামায়াতের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদসহ পাঁচ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবংw সরাসরি মতবিনিময় সভায় বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীরা বেশি সক্রিয় থাকায় মূল প্রতিযোগিতা তাদের মধ্যেই গড়ে উঠছে।
রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডিএম জিয়াউর রহমান জিয়া ও জামায়াতের ডা. আব্দুল বারী সরদারের পাশাপাশি আরো দুই প্রার্থী রয়েছেন। এলাকায় নারী ভোটারদের উপস্থিতি প্রায় পুরুষের সমান হওয়ায় এসব ভোটারই ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ব্যক্তি ইমেজে চিকিৎসক হিসেবে নারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য বেশি হওয়ায় ডা. বারী সরদার ভোটের মাঠে এগিয়ে থাকবেন বলে জানা গেছে।
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে বিএনপির অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল ও জামায়াতের মনজুর রহমানসহ ছয় প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এলাকায় তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিএনপি ও জামায়াত উভয় পক্ষই সভা-সমাবেশ ও মাইকিং জোরদার করেছে। এ আসনে বিএনপির একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় জামায়াত প্রার্থীর জয়ের পাল্লা ভারী বলে সংশ্লিষ্ট সূ্ত্রে জানা গেছে।
রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনে বিএনপির জেলা আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ ও জামায়াতের অধ্যক্ষ নাজমুল হকের পাশাপাশি আরো দুই প্রার্থী রয়েছেন। নারী ও তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে দুদলের প্রার্থীই জোরালো প্রচার চালাচ্ছেন, যা এই আসনেও বিএনপি-জামায়াতের দ্বিমুখী লড়াইকে আরো স্পষ্ট করছে।
সব মিলিয়ে রাজশাহীর ছয়টি আসনেই এখন দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ, মাঠ পর্যায়ের সংগঠনের শক্তি ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাÑএসব নিয়ে জেলাজুড়ে একটি ভোটযুদ্ধের আভাস দিচ্ছে বলে ভোটার ও বিশ্লেষকদের মত।
মোহনপুর উপজেলার কৃষক জিয়াউর রহমান বলেন, আগে একটা বাতাস বোঝা যেত, এবার কোনদিকে বাতাস বইছে বোঝা যাচ্ছে না। সবাই মাঠে আছে; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে।
গোদাগাড়ীর কলেজছাত্রী রুমানা আক্তার জানান, জামায়াত এবার খুব ভালোভাবে নির্বাচনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। আগে এতটা ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। তবে বিএনপির শক্ত ভোটব্যাংক এখনো আছে। প্রধান লড়াই মূলত এ দুদলের মধ্যেই হবে।
বাগমারার ব্যবসায়ী রাজ্জাকুল ইসলাম বলেন, জামায়াতে ইসলামী যে এভাবে এগিয়ে আসবেÑএটা ভাবা যায়নি। তবে ভোটটা খুব জমজমাট হবে। কে জিতবে— সে নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না।
পবা উপজেলার গৃহিণী মমতাজ বেগম বলেন, আমরা এবার নতুন নেতৃত্ব চাই। যিনি এলাকার উন্নয়ন করবেন, এবার আমরা তাকেই ভোট দেব।
রাজশাহী মহানগরীর তরুণ ভোটার শাকিল আহমেদ বলেন, যে দলই হোক, আমরা ভিন্নধর্মী রাজনীতি চাই। শুধু দলবদল নয়, উন্নয়নভিত্তিক প্রতিযোগিতাও দরকার।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ড. জাহাঙ্গীর করিম বলেন, এ অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি শক্তিশালী। কিন্তু মনোনয়নবঞ্চিতদের ক্ষোভে মনে হচ্ছে তাদের দলগত ঐক্য নড়বড়ে। এর ফলে জামায়াত এ বছর বাড়তি প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেনের মতে, এ জেলায় জামায়াত তাদের তৃণমূল সংগঠনকে অত্যন্ত গুছিয়ে মাঠে নামিয়েছে। দীর্ঘদিন পর তাদের মধ্যে নতুন উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকট যদি না থামে, তাহলে বেশ কয়েকটি আসনে কাঙ্ক্ষিত জয় পেতে তারা সমস্যায় পড়তে পারে।
এদিকে ভোটাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি এবার বিগত দিনের ধারাবাহিকতায় এই আসনগুলোতে বিজয় নিশ্চিত করতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে বসে নেই জামায়াতে ইসলামীও। এবার নারীদের ভোট তারা বেশি পাবে বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। তবে সব ক্ষেত্রে মানুষের মুখে একটি কথা উঠে এসেছে যে, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা জয়-পরাজয়ের ফ্যাক্টর হতে পারে।