বহুল আলোচিত পুলিশের সাবেক ডিআইজি মো. হামিদুল আলম (মিলন), তার তিন বোন আজিজা সুলতানা, আরেফা সালমা, শিরিন শবনম ও স্ত্রী শাহাজাদী আলম লিপিসহ দুর্নীতি দমন কমিশন মোট পাঁচজনের নামে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে। সোমবার (১২ জানুয়ারি) দুদক বগুড়া জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে উক্ত মামলা দায়ের করেন।
মামলায় জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৬১ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন এবং ৫৬ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোমবার কমিশনের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। লিপির নামে জুলাই অভ্যুত্থানের পর ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও হত্যার অভিযোগে একটি মামলাও রয়েছে। এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে শাহজাদী আলম মনোনয়নপত্র জমা দিলেও যাচাইবাছাইয়ে তা বাতিল হয়েছে।
প্রথম মামলায় সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. হামিদুল আলম ছাড়াও তার তিন বোন মোছা. আজিজা সুলতানা, মোছা. আরেফা সালমা ও মোছা. শিরিন শবনমকে আসামি এবং দ্বিতীয় মামলায় তার স্ত্রী মোছা. শাহাজাদী আলম লিপি এবং সহায়তাকারী হিসেবে মো. হামিদুল আলমকে আসামি করা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ, মিলন প্রায় ৮ কোটি ৯৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা দামের স্থাবর সম্পত্তি, মানি লন্ডারিং সম্পৃক্ত অপরাধ ‘দুর্নীতি ও ঘুষ’-এর মাধ্যমে অর্জিত অর্থ, তার মা ও বোনদের নামে জমি ক্রয় দেখিয়ে পরে সেগুলো হেবা সূত্রে নিজের নামে রূপান্তর করে অবৈধ উৎস গোপন করে। এ ঘটনায় তার মা সহযোগিতা করেন বলে জানা গেছে। তবে মিলনের মা মৃত্যুবরণ করায় তাকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এদিকে, অতিরিক্ত ডিআইজি হামিদুল আলম পদাধিকার ও ক্ষমতাবলে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৬১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, ২৭ কোটি ৬০ লাখ ৩ হাজার ৯০৫ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন, ৩৫ কোটি ১৭ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯৫ টাকার অবৈধ সম্পদ, তার ও তার তিন বোনের সাহায্যে ৮ কোটি ৯৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও স্থানান্তরের অভিযোগে নিজের নামে ও তার স্ত্রী আওয়ামী লীগ নেত্রী শাহাজাদী আলম লিপি এবং তিন বোনদের নামে অর্জন করে। এ অভিযোগে পাঁচ আসামির নামে দুদুক পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে।
কমিশনে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে মিলনের স্ত্রী শাহাজাদী আলম লিপির বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ২৬ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৯৭ টাকা ও অর্জিত ১৯ কোটি ৫৬ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৮ টাকার সম্পদের তথ্য ও উৎস গোপনের অভিযোগ আছে। স্বামীর ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি আরও প্রায় পৌনে ৪ কোটি টাকার সম্পদ হস্তান্তরে সহায়তা করেছেন বলে জানা গেছে। অবশ্য লিপি তার এসব তথ্য ভিত্তিহীন দাবি করে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন।
এই মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শাহাজাদী আলম কমিশনে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে অসৎ উদ্দেশ্যে ১৯ কোটি ৫৬ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৮ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য এবং উৎস গোপন করে মিথ্যা হিসাব ও ভিত্তিহীন ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা, স্বামীর ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ও অবৈধ সহায়তায় ২৬ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৯৭ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। এ ছাড়া শাহজাদী আলম আরও প্রায় পৌনে ৪ কোটি টাকার সম্পদ হস্তান্তর বা হস্তান্তরে সহায়তা করেছেন।
মোছা. শাহাজাদী আলম লিপির মোট নিট সম্পদের বিপরীতে গ্রহণযোগ্য আয় তুলনামূলকভাবে অপ্রতুল হওয়ায় তার নামে ২৪ কোটি ৫০ লাখ ১২ হাজার ৩৫৪ টাকা মূল্যের জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত সম্পদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এতে সহায়তার অভিযোগে তার স্বামী মো. হামিদুল আলমকেও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া অবৈধ আয়ের অর্থ দিয়ে শাশুড়ির নামে সম্পত্তি ক্রয় করে পরে হেবার মাধ্যমে নিজের নামে নেওয়ার মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা মূল্যের সম্পদের উৎস আড়াল করে।
দুদকের বগুড়া জেলা কার্যালয়ের উপ পরিচালক মাহফুজ ইকবাল জানান, দুদকের দায়ের করা এসব মামলার তদন্ত দুদক নিজেই করবে।
২০২৪ সালের ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পাতানো নির্বাচনে জেলার সারিয়াকান্দি আওয়ামী লীগ নেত্রী শাহাজাদী আলম লিপি (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) বগুড়া-১ আসনে নির্বাচন করতে চেয়েছিল। পরে অবশ্য দলীয় মনোনয়নপত্র না মেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে পাতানো নির্বাচনে ফ্যাসিস্ট সরকারের হাতকে শক্তিশালী করতে অংশ নেয়। প্রহসনের এই নির্বাচনে হামিদুল আলম সরকারি চাকুরিতে থাকাকালেই শৃঙ্খলা আইন না মেনে,এক মাসের সরকারি ছুটি নিয়ে স্ত্রীর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। এ কারণে গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর তাকে এই অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।