কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আগামীকাল ২৩ জুন। এ নিয়ে রাজশাহীর রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা, উদ্বেগ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। দলটির কিছু নেতাকর্মী ও সমর্থক দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে সাংগঠনিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন এবং পুরোনো নেটওয়ার্ক সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতারা যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। সম্ভাব্য যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সম্প্রতি রাজশাহী মহানগর ও জেলার কয়েকটি এলাকায় আওয়ামী লীগের নামে বিক্ষোভ মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ভিডিওগুলোতে কয়েকজনকে মুখে মাস্ক পরে মিছিল করতে দেখা যায়। সেখানে দলীয় নেতাদের মুক্তির দাবি এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অঙ্গীকারও শোনা যায়।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী আবারও সাংগঠনিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন এলাকায় ছোট পরিসরে বৈঠক, পুরোনো নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ শামসুজ্জামান আওয়াল সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হওয়ার পর দলীয় যোগাযোগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগে দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় অভিযুক্ত কয়েকজন নেতাও বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
দলীয় সূত্রের দাবি, তারা জেলা ও মহানগর পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে দেশের বাইরে অবস্থানরত কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মহানগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন পলাতক বা দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা নেতা রাজশাহীতে ফিরে এসে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পুনরায় শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল আলম বেন্টু, মহানগরের উপদেষ্টা মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন প্রামাণিক ও কবি আরিফুল হক কুমার, মুক্তিযোদ্ধা লীগের সভাপতি আলী কামাল, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক হোসেন, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. চিন্ময়, কোষাধ্যক্ষ হাবিবুল্লাহ ডলার, প্রচার সম্পাদক দিলীপ ঘোষ, শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক ওমর শরীফ রাজীব, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক কামারুল্লাহ সরকার কামাল এবং স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক ডা. ফ ম আ. জাহিদ।
এছাড়া মহানগর যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নাহিদ আখতার নাহান, আওয়ামী লীগ নেতা মহিদুল ইসলাম, ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি লিটন, ৪ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি ইদ্রিস আলী এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আরেক নেতা রাইতুল ইসলাম তরুণসহ আরো কয়েকজন স্থানীয় নেতার নামও আলোচনায় রয়েছে।
কয়েকটি সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির বিভিন্ন কর্মসূচি ও বার্তা প্রচারে সক্রিয় রয়েছেন। একই সঙ্গে কয়েকজন নেতাকর্মী প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি।
মহানগর আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সম্প্রতি নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সীমিত পরিসরে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে পুরোনো নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন, সম্ভাব্য কর্মসূচি নির্ধারণ এবং সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ধীরে ধীরে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রমে ফেরার বিষয়েও সেখানে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রটি দাবি করেছে।
এছাড়া রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) কয়েকজন সাবেক কাউন্সিলর, যারা দীর্ঘদিন নগরীর বাইরে অবস্থান করার পর কয়েকজন ফিরে এলেও বাকিরা ফিরে আসার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সম্ভাব্য কর্মসূচির বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সব মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজিদের সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। সম্ভাব্য মিছিল, পতাকা উত্তোলন কিংবা প্রকাশ্য কর্মসূচি সম্পর্কে সতর্ক থাকার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কার বিষয়েও নজর রাখতে বলা হয়েছে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) এক কর্মকর্তা বলেন, যে কোনো ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত রয়েছি। কেউ আইন ভঙ্গের চেষ্টা করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আরএমপির মুখপাত্র গাজিউর রহমান বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো যাতে কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে না পারে, সে লক্ষ্যে গোয়েন্দা পুলিশসহ (ডিবি) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছেন।
এ বিষয়ে মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন বলেন, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন যদি নতুন করে রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে জনগণ তা মেনে নেবে না। তবে বিষয়টি নিয়ে আমরা দলীয়ভাবে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেব।
জামায়াতের মহানগরীর সাংগঠনিক সেক্রেটারি জসিম উদ্দিন সরকার বলেন, কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন যদি গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে মিছিল, সমাবেশ বা সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করে, তাহলে সরকারদল বা বিরোধীদল বলে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না; সবাই মিলে তা প্রতিহত করা হবে। তবে প্রশাসনের উচিত বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মহানগর আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলী বলেন, আমরা চাই না দেশে আবারও রাজনৈতিক সহিংসতা বা অস্থিরতার পরিবেশ সৃষ্টি হোক। কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন যদি গোপনে বা প্রকাশ্যে মিছিল-সমাবেশ কিংবা সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তা কঠোরভাবে দমন করতে হবে। যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ হয়, তাহলে জুলাই আন্দোলনের চেতনায় বিশ্বাসী শক্তিগুলো জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করবে, ইনশাআল্লাহ।
নগরীর সাহেববাজার এলাকার ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমরা রাজনৈতিক সংঘাত চাই না। ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক থাকুক, এটাই সবার প্রত্যাশা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেনের মতে, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও সংযম ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।