রাজশাহীতে মধ্যরাতে চোর-পুলিশ খেলা
রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেককে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের অভিযানের খবর পেয়ে তিনি একটি ভবনের ছাদ থেকে ফেসবুক লাইভ করেন। পরে লাফিয়ে অন্য ভবনের ছাদে যেতে গিয়ে আহত হন।
এ সময় দলীয় নেতাকর্মীরা ভিড় জমালে সরে যায় পুলিশ। পরে তাকে উদ্ধার করে মোটরসাইকেল বহর নিয়ে চলে যায় তার অনুসারীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে নগরের বোয়ালিয়া থানার নিউ মার্কেট এলাকায় জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আসাসের বাসায় অবস্থান করছিলেন তারেক। এ সময় মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি দল ছয়তলা ভবনটি ঘিরে ফেলে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আসাসের বাসার ছাদ থেকে পাশের একটি ভবনের ছাদে লাফ দেন মীর তারেক। এতে তিনি আহত হন। তার সঙ্গে থাকা আরেকজনও আহত হন।
ঘটনার পরপরই নিজের ফেসবুক আইডিতে দুটি স্ট্যাটাস দিয়ে মীর তারেক লেখেন, ডিবি পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলেছে। তিনি নেতাকর্মীদের ঘটনাস্থলে আসার আহ্বান জানান। কিছু সময়ের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ভবনের সামনে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় ছাদে অবস্থান করেই মীর তারেক ফেসবুক লাইভ করেন। লাইভে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত ছাড়াই তাকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে।
রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ডিবি পুলিশের পাশাপাশি থানা পুলিশের সদস্যরাও সেখানে অবস্থান করছেন। ভবনের সামনে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা স্লোগান দিচ্ছেন। পরে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) ক্রাইসিস রেসপন্স টিমও (সিআরএটি) লাঠি হাতে সেখানে পৌঁছায়। কিছু সময়ের জন্য এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
তবে পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যেতে শুরু করে। রাত ১২টা ৫৫ মিনিটের দিকে পুলিশ ধীরে ধীরে ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। পুলিশ চলে যাওয়ার পর নেতাকর্মীদের একটি অংশও স্থান ত্যাগ করেন।
রাত ১টা ১২ মিনিটের দিকে প্রায় ১০০ মোটরসাইকেলের একটি বহর ঘটনাস্থলে আসে। এরপর আহত মীর তারেককে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। কিন্তু যে ভবনের ছাদে তিনি পড়ে ছিলেন, সেই ভবনের কলাপসিবল গেটের চাবি পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে হাতুড়ি ও শাবল দিয়ে তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয়।
এ সময় ভবনের নিচতলার সিসি ক্যামেরাগুলো আড়াল করার চেষ্টাও দেখা যায়। একটি ক্যামেরার সামনে কাপড় গুঁজে দেওয়া হয় এবং অন্যটির সামনে হেলমেট ধরে রাখা হয়। পরে একটি ক্যামেরার মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
উদ্ধার অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ হুমকি ও অশালীন আচরণও করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
এরপর রাত ১টা ৩৯ মিনিটের দিকে দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে হেলমেট পরা অবস্থায় প্রথমে একজন আহত ব্যক্তিকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে একইভাবে বের করা হয় তারেককে। তার সঙ্গে আহত হওয়া অপর ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত ২১ জুন শাহমখদুম থানার ছায়ানীড় আবাসিক এলাকায় মীর তারেকের ভাড়া বাসায় গুলিবিদ্ধ হন ফয়সাল বাঁধন (৩০) নামে এক যুবক। ওই ঘটনায় পুলিশ একটি অবৈধ পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, গুলির খোসা, ককটেল ও বিস্ফোরক উদ্ধারের দাবি করে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করে।
মীর তারেক শুধু সাম্প্রতিক অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনার সঙ্গেই আলোচনায় নন, তিনি একটি হত্যা মামলারও এজাহারভুক্ত আসামি।
আরএমপির মুখপাত্র অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, ‘পুলিশ মীর তারেককে গ্রেপ্তার করতে যায়নি। অন্য এক আসামিকে ধরতে সেখানে অভিযান চালানো হয়েছিল। ওই আসামিকে না পেয়ে এবং বিষয়টি ভুল বোঝাবুঝি বলে নিশ্চিত হয়ে পুলিশ ফিরে আসে।
হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও কেন মীর তারেককে গ্রেপ্তার করা হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে গাজিউর রহমান বলেন, মামলাটি পুরোনো। মামলার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা না করে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
রোববার দুপুরে মীর তারেকের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।